Showing posts with label অনার্স ২য় বর্ষ. Show all posts
Showing posts with label অনার্স ২য় বর্ষ. Show all posts

Wednesday, July 9, 2025

বাংলাদেশ উন্নত, অনুন্নত না উন্নয়নশীল দেশ ?

বাংলাদেশ একটি উন্নত, অনুন্নত না উন্নয়নশীল দেশ তা র কাঠামোগত বৈশিষ্ট্যগুলোর প্রেক্ষিতে বিচার করা প্রয়োজন। তাই নিয়ে র প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ আলোচনা করা হলো।

১। কৃষিখাতের প্রাধান্যঃ বাংলাদেশ কৃষি নির্ভর দেশ। বাংলাদেশের মোট শ্রম শক্তির প্রায় ৪৭.৫% কৃষি শ্রমিক । ২০১২-১৩ অর্থবছরের জিডিপি'তে কৃষিখাতের অবদান ছিল ১৬.৭৮ শতাংশ, ২০১৩- ১৪ অর্থবছরে এ খাতের অবদান দাড়িয়েছে ১৬.৩৩ শতাংশ। সুতরাং কৃষির উপর অত্যাধিক নির্ভরশীল ।

২। অনুন্নত কৃষি ব্যবস্থাঃ বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ হওয়া সত্ত্বেও কৃষকদের নিরক্ষরতা, প্রাচীন পদ্ধতিতে চাষাবাদ, কৃষি উপকরণের অভাব প্রভৃতি কারণে কৃষিখাতে প্রবৃদ্ধির হার খুব কম । 

৩। অনুন্নত শিল্পঃ মূলধনের অপর্যাপ্ততা, দক্ষ উদ্যোক্তা ও দক্ষ শ্রমিকের অভাব ইত্যাদি কারণেবাংলাদেশের শিল্পখাত খুবই অনুন্নত ফলে জাতীয় আয়ে শিল্প খাতের অবদান খুবই কম। তবে ধীর গতিতে এ অবদান বাড়ছে । 

৪। অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবকাঠামোঃ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবকাঠামো তেমন উন্নত নয় । অনুন্নত পরিবহণ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা, অপর্যাপ্ত জ্বালানী ও বিদ্যুৎ শক্তি, শিক্ষার হার নিম্ন, স্বাস্থ্য সুবিধা অপ্রতুল, এ সমস্ত কারণেঅর্থনৈতিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। যেমন- স্বাধীনতা উত্তরকালে যেখানে মাত্র ৪ হাজার কিলোমিটার সড়ক নেটওয়ার্ক ছিল সেখানে ফেব্রুয়ারি ২০১২ পর্যন্ত সওজ অধিদপ্তরের ব্যবস্থাপনায় ২১,২৭২ কিলোমিটার সড়ক নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। ২০১০-১১ অর্থবছরে মোট ৩১,৩৫৫ মিলিয়ন কিলোওয়াট আওয়ার নীট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে যা বিগত অর্থবছরের তুলনায় ৭.২১% বেশি ।

৫। কারিগরি জ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবঃ কারিগরি জ্ঞান ও প্রযুক্তির দিক থেকে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে রয়েছে যা উৎপাদন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে একটি বিরাট প্রতিবন্ধক ।

৬। স্বল্প মাথাপিছু আয় ও নিম্ন জীবনযাত্রার মানঃ বাংলাদেশের একটি গুরুতপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে মাথাপিছু আয় কম এবং জীবনযাত্রার মান নিম্ন। উন্নত দেশের তুলনায় তা খুবই কম। তবে মাথাপিছু আয় ধীর গতিতে হলেও ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। সেই সাথে জীবনযাত্রার মানও উন্নত হচ্ছে। 

৭। মূলধনের স্বল্পতাঃ বাংলাদেশের জনগণের মাথাপিছু আয় কম বলে সঞ্চয় ক্ষমতা কম । ফলে মূলধন গঠনের হারও বেশ কম। তবে তা ধীরে ধীরে বাড়ছে। তালিকায় বিভিন্ন বছরে দেশের GDP এর মধ্যে সঞ্চয়ের অনুপাত দেখানো হলো ।

৮। শিক্ষার হার কমঃ বাংলাদেশে শিক্ষার হার অত্যন্ত কম। এখনও দেশে অনেক লোক অশিক্ষিত, অজ্ঞ ও নিরক্ষর রয়েছে। ২০০২ সালের হিসাব অনুযায়ী বয়স্ক শিক্ষার হার (১৫+) হলো শতকরা ৬২.৬৬ ভাগ মাত্র । উন্নত দেশে এ হার প্রায় ১০০ শত ভাগ ।

৯। দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধিঃ বাংলাদেশের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এ দেশে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার অব্যাহত চাপ বিদ্যমান। ২০০৫ সালে মোট জনসংখ্যা ছিল ১৩.৭০ কোটি যা ২০১১-১২ (সাময়িক প্রাক্কলন) এ হয় ১৫.১৬ কোটি। ২০০১১ সালের হিসাব অনুযায়ী এ দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১.৩৪% এবং জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রতি বর্গ কিলোমিটারে ৯৬৪ জন ।

১০। বৈদেশিক সাহায্যের উপর নির্ভরশীলতাঃ বাংলাদেশের উন্নয়নমূলক কার্যাবলী মূলত বৈদেশিক সাহায্যের উপর নির্ভরশীল। উন্নয়ন বাজেটের ৫০% বৈদেশিক সাহায্য নির্ভর। তবে বর্তমানে এ নির্ভরশীলতা হ্রাস পাচ্ছে ।

১১। খাদ্য সমস্যাঃ বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ হওয়া সত্ত্বেও কৃষি ব্যবস্থার অনুন্নতি এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে এদেশে প্রতি বছর খাদ্য ঘাটতি দেখা দেয়। ফলে বিদেশ থেকে প্রতি বছর খাদ্য আমদানি করতে হয় । তবে খাদ্য শস্য উৎপাদন ব্যবস্থায় বিগত কয়েক বছর ধরে একটি ঊর্ধ্বমুখী ধারা অব্যাহত রয়েছে । নিমের তালিকায় বিভিন্ন বৎসরের খাদ্যশস্য উৎপাদন ও আমদানির পরিমাণ দেখানো হলো ।  

১২। বেকার সমস্যাঃ বাংলাদেশে বেকার সমস্যা অত্যন্ত প্রকট । এদেশে মোট শ্রমশক্তির ৩০% বেকার এবং ২৫% প্রচ্ছন্ন বেকার। সরকারি হিসাব অনুযায়ী শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ১ কোটির উর্ধ্বে ।

১৩। মুদ্রাস্ফীতিঃ বাংলাদেশে বর্তমানে মুদ্রাস্ফীতি একটি বড় সমস্যা। বিশ্বব্যাপী জ্বালানী তেলের মূল্য বৃদ্ধি, খাদ্যশস্যের উৎপাদন হ্রাস, বিশ্বব্যাপী রাজনৈতিক অস্থিরতা ও মন্দা ইত্যাদি কারণে বাংলাদেশেও বর্তমানে মূল্যস্তর বাড়ছে এবং মুদ্রাস্ফীতি একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশে বর্তমানে মুদ্রাস্ফীতির হার ১০- ১১% ।

১৪। প্রতিকূল বৈদেশিক বাণিজ্যঃ এ দেশে কাঁচামাল রপ্তানী, শিল্পজাত পণ্য আমদানি, উদ্যোক্তার অভাব, নিম্নমানের পণ্য উৎপাদন, আমদানি বিকল্প শিল্প গড়ে না উঠা প্রভৃতি কারণে বাণিজ্য ঘাটতি লেগেই রয়েছে ।

উপরের আলোচনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, কে কোনভাবেই উন্নত অর্থনীতি বলা যায় না। অপরদিকে অনুন্নত দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোর প্রায় সব বৈশিষ্ট্যই বিদ্যমান। এজন্য সাধারণভাবে বাংলাদেশকে অনুন্নত দেশ বলে মনে হয়। তবে অনুন্নত দেশ এবং উন্নয়নশীল দেশের প্রধান পার্থক্য “অর্থনৈতিক স্থবিরতা” তা বাংলাদেশে অবর্তমান। বরং উন্নয়নশীল দেশের প্রধান লক্ষন অর্থনৈতিক ও সামাজিক গতিশীলতা বাংলাদেশে লক্ষ্যণীয়। এ গতিশীলতা সৃষ্টির প্রধান কারণ হচ্ছে বিভিন্ন উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহন ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হারের বৃদ্ধি। যেমন ১ম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৪% যা পঞ্চম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫.২১%। ফলে এ দেশে একটি উন্নয়নের ধাপ সৃষ্টি হয়েছে। মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পেয়ে ৫৮০ ডলারে উন্নীত হয়েছে। দারিদ্র সীমার নিচে বসবাসকারী জনসংখ্যার পরিমাণ হ্রাস পেয়ে বর্তমানে ৪.২১% এ নেমে এসেছে। বয়স্ক শিক্ষার হার ৫০% থেকে বেড়ে ৬৮% এ উন্নীত হয়েছে। কৃষিখাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। মোট জিডিপিতে শিল্পসহ অন্যান্য অ-কৃষিখাতের অবদানও বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থাৎ এক কথায় বলা যায় দেশের অর্থনীতিতে কাঠামোগত পরিবর্তন এসেছে এবং অর্থনৈতিতে গতিশীলতা সৃষ্টি হয়েছে। সুতরাং বাংলাদেশকে নিঃসন্দেহে একটি উন্নয়নশীল দেশ বলাই যুক্তি সংগত।

Thursday, July 3, 2025

কৌটিল্য এর ‘অর্থশাস্ত্র’-এ রাষ্ট্রনীতি -- মোঃ হেলাল উদ্দিন


ভূমিকা

প্রাচীন ভারতের রাষ্ট্রনীতি সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বহু মূল্যবান গ্রন্থ হল কৌটিল্যের ‘অর্থশাস্ত্র’। ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে ড. শ্যাম শাস্ত্রী সংস্কৃত ভাষায় লেখা এই গ্রন্থটি আবিষ্কার করেন। এই গ্রন্থটির রচয়িতা সম্পর্কে বিতর্ক থাকলেও অধিকাংশ পণ্ডিত মৌর্য সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের প্রধানমন্ত্রী কৌটিল্য বা চাণক্যকেই অর্থশাস্ত্রের রচয়িতা বলে স্বীকার করেছেন। তবে পণ্ডিতদের অনুমান বিভিন্ন যুগে গ্রন্থটি নানাভাবে পরিমার্জিত হয়েছে। অর্থশাস্ত্রের মূল বিষয়বস্তু রাষ্ট্রনীতি হলেও এই গ্রন্থটিতে মৌর্য যুগ তথা প্রাচীন ভারতের সমাজ, অর্থনীতি প্রভৃতি অন্যান্য বিষয়ও আলোচিত হয়েছে।

অর্থশাস্ত্রে রাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে ধারণা

অর্থশাস্ত্রে উল্লেখিত রাষ্ট্রনীতির বিভিন্ন দিকগুলি হল-দীপাশা

(1) শক্তিশালী ও বংশানুক্রমিক রাজতন্ত্র: অর্থশাস্ত্রে স্পষ্টভাবে উল্লেখ না-থাকলেও কৌটিল্য মূলত শক্তিশালী ও বংশানুক্রমিক রাজতন্ত্রকেই সমর্থন করেছেন। তাঁর মতে, রাজা উচ্চবংশজাত হওয়াই ব্যঞ্ছনীয়। কেন-না বংশকৌলীন্যের কারণে সহজেই তিনি প্রজাসাধারণের আনুগত্য ও ভক্তিশ্রদ্ধা অর্জন করতে সক্ষম হবেন।

(2) রাষ্ট্রের সপ্তাঙ্গ তত্ত্ব: কৌটিল্যের ‘অর্থশাস্ত্র‘-এ বলা হয়েছে যে, মানবদেহের ন্যায় রাষ্ট্রেরও বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আছে। কৌটিল্যের মতে, রাষ্ট্র মূলত সাতটি অঙ্গ দ্বারা গঠিত। এগুলি হল- (i) স্বামী (রাজা), (ii) অমাত্য (আমলা গোষ্ঠী), (iii) জনপদ (রাষ্ট্র), (iv) দুর্গ (পুর-নগর), (v) কোশ (অর্থভাণ্ডার), (vi) দণ্ড (শাস্তিবিধান), এবং (vii) মিত্র (বন্ধু রাজা বা রাষ্ট্র)। এই সাতটি অঙ্গ রাষ্ট্রের ‘সপ্তাঙ্গতত্ত্ব’ নামে পরিচিত।

(3) রাজার ক্ষমতা: কৌটিল্যের মতে, রাজা হলেন রাষ্ট্রের সর্বেসর্বা। অর্থাৎ তিনিই রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বা চূড়ান্ত ক্ষমতার অধিকারী। তাঁর কর্তৃত্ব ও আদেশকে উপেক্ষা বা অমান্য করার ক্ষমতা কারও নেই। তিনি রাষ্ট্রের সামরিক ও বেসামরিক শাসন এবং বিচারব্যবস্থার প্রধান। তবে অর্থশাস্ত্রে তাঁর অবাধ ও স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতাকে অবশ্য স্বীকার করা হয়নি। অর্থশাস্ত্রে, তাঁর সীমাহীন ক্ষমতার ওপর কিছু নিয়ন্ত্রণ আরোপের কথাও বলা হয়েছে। কৌটিল্যের মতে, রাজাই রাষ্ট্র নয়, তিনি এর অংশমাত্র।

(4) রাজার কার্যাবলি : কৌটিল্য অর্থশাস্ত্রে রাজার গুরুত্বপূর্ণ কার্যাবলি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। যথা- (ⅰ) কৌটিল্যের মতে, রাজার প্রধান কর্তব্য হল প্রজাদের জীবন ও সম্পত্তি রক্ষা করা। (ii) বহিঃশত্রুর আক্রমণ, নানা প্রাকৃতিক বিপর্যয়, রোগ-ব্যাধি, দস্যু-দুষ্কৃতীদের হাত থেকে প্রজাদের নিরাপত্তা বিধান করা। (iii) রাজার অন্যতম কাজ হল একটি সৎ ও দক্ষ প্রশাসন গড়ে তোলা। (iv) শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধে রাজাকেই নেতৃত্ব দিতে হবে। (v) বৈদেশিক আক্রমণ ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার স্বার্থে দুর্গ ও নগর নির্মাণ করা।

(5) রাজার গুণাবলি: কৌটিল্যের মতে, রাজাকে হতে হবে কূটনীতিপরায়ণ। সব ধরনের কাজের ক্ষেত্রেই রাজার মধ্যে থাকতে হবে উৎসাহ, উদ্দীপনা ও কর্মপ্রেরণা। রাজাকে হতে হবে সাহসী, ন্যায়পরায়ণ, ধর্মপরায়ণ, দৃঢ়চেতা, বিচক্ষণ ও সংযমী।

(6) সুদক্ষ আমলাতন্ত্র গঠন: কৌটিল্যের মতে, রাজার একার পক্ষে রাষ্ট্রশাসন পরিচালনা করা সম্ভব নয়। এজন্য তিনি বিভিন্ন মন্ত্রী, অমাত্য ও অন্যান্য রাজকর্মচারীদের নিয়োগ করবেন এবং আমলাতন্ত্রের সাহায্যে রাজা শাসন পরিচালনা করবেন।

(7) প্রজাকল্যাণকর রাষ্ট্র: কৌটিল্য তাঁর ‘অর্থশাস্ত্র’-এ প্রজাকল্যাণকর রাষ্ট্রব্যবস্থাকেই সমর্থন করেছেন। তাঁর মতে, রাজাকে হতে হবে প্রজাদরদি। প্রজাসাধারণের মঙ্গলসাধন করাই তাঁর অন্যতম প্রধান কর্তব্য। নিজের সুখের থেকেও প্রজার সুখ রাজার কাছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেছেন, “প্রজার সুখেই রাজার সুখ, প্রজার হিতে (মঙ্গল) রাজার হিত” (প্রজাসুখে সুখং রাজ্ঞঃ প্রজানাং চ হিতে হিতম্)।

(8) বিচার ও আইনব্যবস্থা: রাজাই হলেন রাষ্ট্রে বিচার বিভাগের সর্বেসর্বা। রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং অপরাধীকে দণ্ড বা শাস্তিদান করা রাজার অন্যতম কর্তব্য বলে কৌটিল্য অর্থশাস্ত্রে উল্লেখ করেছেন। রাষ্ট্রের প্রয়োজনে কঠোর আইন প্রণয়ন ও দণ্ডদানের পক্ষেই তিনি মত দিয়েছেন।

(9) রাজস্বব্যবস্থা : কৌটিল্য অর্থশাস্ত্রে বলেছেন যে, সুষ্ঠুভাবে শাসন পরিচালনার জন্য রাজকোশ সমৃদ্ধ হওয়া দরকার। কেন-না, দুর্বল বা শূন্য রাজকোশ রাজা ও প্রজার উভয়েরই দুর্গতির অন্যতম মূল কারণ। তাই রাজস্ব নির্ধারণ, রাজস্ব সংগ্রহ ও বৃদ্ধির ব্যাপারে রাজাকে সর্বদাই নজর রাখতে হবে। রাষ্ট্রের রাজস্ব বৃদ্ধির জন্য রাজাকে কৃষি, শিল্প ও ব্যাবসাবাণিজ্যের উন্নতির ব্যাপারে উদ্যোগী হতে হবে। অর্থশাস্ত্রে তিনি সীতা, ভাগ ও বলি নামে তিনপ্রকার করের কথা উল্লেখ করেছেন।

(10) গুপ্তচর ব্যবস্থা: মৌর্য শাসনব্যবস্থা আলোচনা প্রসঙ্গে কৌটিল্য গুপ্তচর ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করেছেন। কৌটিল্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে ও বাইরে নানা খবরাখবর সংগ্রহের জন্য রাজাকে গুপ্তচর নিয়োগের পরামর্শ দিয়েছেন।

(11) ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থা: কৌটিল্য রাষ্ট্রের আধ্যাত্মিক বা ধর্মীয় বিষয়ে পুরোহিতের কর্তৃত্বকে কৌটিল্য মেনে নিলেও রাজার ক্ষমতাকে প্রভাবিত বা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা পুরোহিতের নেই। এমনকি পুরোহিত অপরাধ করলে তিনি তাঁদের চরম শাস্তির বিধান দিয়েছেন। বিচারক ও রাজকর্মচারীদের নিয়োগের আগে তাদের ধর্মনিরপেক্ষতাকে যাচাই-এর পরামর্শ দিয়েছেন।

উপসংহার

সবশেষে বলা যায় যে, মৌর্য যুগ তথা প্রাচীন ভারতের রাষ্ট্রনীতি চর্চার সর্বাপেক্ষা নির্ভরযোগ্য এবং অন্যতম শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ হল কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র। এই গ্রন্থে প্রাচীন ভারতের রাষ্ট্রনীতি সংক্রান্ত নানা বিধিব্যবস্থা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে। ঐতিহাসিক আলতেকর বলেছেন যে, কৌটিল্য রাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে একটি নতুন ধারার প্রবর্তন করেছিলেন। আবার অনেকে মনে করেন, আধুনিক রাষ্ট্রনীতি চর্চায় ম্যাকিয়াভেলির যে স্থান, প্রাচীন যুগের রাষ্ট্রনীতি চর্চায় কৌটিল্যের স্থানও অনুরূপ। তাই কৌটিল্যকে অনেকেই ‘ভারতের ম্যাকিয়াভেলি’ বলে অভিহিত করেন। 

আল ফারাবীর রাষ্ট্রের উৎপত্তি মতবাদ -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

আল-ফারাবীর রাষ্ট্রের উৎপত্তি বিষয়ক মতবাদ, যা প্লেটো ও এরিস্টটলের দর্শনের দ্বারা প্রভাবিত, তাতে রাষ্ট্রকে একটি সমবায় ব্যবস্থা হিসেবে দেখা হয়। তিনি মনে করতেন, রাষ্ট্র হলো সকল সমবায়ের সেরা সংগঠন। রাষ্ট্রের উৎপত্তি প্রাকৃতিক এবং এটি মানুষের সামাজিক প্রকৃতির ফল। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষ স্বভাবতই রাজনৈতিক জীব এবং সমাজে বসবাসের জন্য রাষ্ট্রের প্রয়োজন। আল-ফারাবী রাষ্ট্রের কার্যাবলী এবং একটি আদর্শ রাষ্ট্রের ধারণা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। 

আল-ফারাবীর রাষ্ট্রের উৎপত্তি বিষয়ক মতবাদের মূল বিষয়গুলো হলো:

স্বাভাবিক উৎপত্তি:

আল-ফারাবী মনে করতেন, রাষ্ট্র একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া এবং মানুষের সামাজিক প্রকৃতির কারণে এর উদ্ভব হয়েছে। তিনি রাষ্ট্রকে মানুষের একটি প্রয়োজনীয় সামাজিক সংগঠন হিসেবে দেখেন। 

সমবায় ধারণা:

তিনি রাষ্ট্রকে একটি সমবায় ব্যবস্থা হিসেবে বর্ণনা করেন এবং এরিস্টটলের মতের সাথে একমত হয়ে বলেন যে, রাষ্ট্র হলো সকল সমবায়ের শ্রেষ্ঠ সংগঠন। 

আদর্শ রাষ্ট্র: 

আল-ফারাবী একটি আদর্শ রাষ্ট্রের ধারণা দেন, যেখানে ন্যায়বিচার, সহযোগিতা ও পারস্পরিক সহানুভূতির ভিত্তিতে মানুষ বসবাস করবে। তিনি প্লেটোর "রিপাবলিক" দ্বারা প্রভাবিত হয়ে একটি আদর্শ রাষ্ট্রের কল্পনা করেন। 

দার্শনিক রাজার ধারণা: 

আল-ফারাবী বিশ্বাস করতেন, একটি আদর্শ রাষ্ট্র পরিচালনাকারী রাজা হবেন একজন জ্ঞানী ও ন্যায়পরায়ণ দার্শনিক, যিনি জনগণের মঙ্গলের জন্য কাজ করবেন। 

রাষ্ট্রের কার্যাবলী:

রাষ্ট্রের কার্যাবলী সম্পর্কে আল-ফারাবী বলেন, রাষ্ট্রের প্রধান কাজ হলো জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করা এবং তাদের প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা। 

ইনসাফ বা ন্যায়বিচার: 

আল-ফারাবী রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে ইনসাফ বা ন্যায়বিচারকে চিহ্নিত করেন। তার মতে, রাষ্ট্রের প্রতিটি কাজে ন্যায়বিচার থাকা উচিত।

আল-ফারাবীর এই মতবাদ সে সময়কার রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ ছিল এবং আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার ক্ষেত্রেও এটি প্রাসঙ্গিক। 

 

 

আল ফারাবীর রাষ্ট্রের উৎপত্তি মতবাদ -- মোঃ হেলাল উদ্দিন 

Tuesday, June 17, 2025

আল-ফারাবীর আদর্শ রাষ্ট্রের শাসকের গুণাবলি -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

আল-ফারাবী ছিলেন একজন প্রসিদ্ধ ইসলামী দার্শনিক যিনি রাজনীতি, নৈতিকতা এবং রাষ্ট্রচিন্তার ওপর ব্যাপকভাবে লিখেছেন। তাঁর রচিত "আল-মাদীনাতুল ফাদিলা" (আদর্শ রাষ্ট্র) গ্রন্থে তিনি আদর্শ রাষ্ট্র ও তার শাসকের বৈশিষ্ট্য নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন। তাঁর মতে, একটি আদর্শ রাষ্ট্রের নেতৃত্বে এমন একজন শাসক থাকা উচিত যিনি শুধু রাজনৈতিক দক্ষতাসম্পন্ন নন, বরং জ্ঞান, ন্যায়বিচার এবং নৈতিক গুণে সমৃদ্ধ।


আল-ফারাবীর আদর্শ রাষ্ট্রের শাসকের গুণাবলি:

১. জ্ঞানী ও দার্শনিক:

শাসককে অবশ্যই জ্ঞানী হতে হবে। আল-ফারাবীর মতে, একজন আদর্শ শাসক হতে হলে দার্শনিক হতে হবে, যিনি সত্য, ন্যায় ও বাস্তবতা সম্পর্কে গভীর উপলব্ধি রাখেন। তিনি প্লেটোর "ফিলোসফার কিং"-এর ধারণা থেকে প্রভাবিত।


২. নৈতিক গুণসম্পন্ন:

শাসকের মধ্যে উচ্চ নৈতিক গুণ থাকতে হবে, যেমন সত্যবাদিতা, ন্যায়পরায়ণতা, আত্মসংযম, ধৈর্য এবং সদিচ্ছা।


৩. দূরদর্শী ও প্রজ্ঞাবান:

তিনি ভবিষ্যতের কল্যাণ বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হবেন এবং সমাজের সামগ্রিক উন্নতির জন্য কাজ করবেন।


৪. সাহসী ও দৃঢ়চেতা:

আদর্শ শাসকের সাহস থাকতে হবে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে। তিনি ভয় বা প্রলোভনে পা দেবেন না।


৫. শ্রেষ্ঠ চরিত্রের অধিকারী:

শাসকের ব্যক্তিত্ব হতে হবে অনুকরণীয়। তিনি প্রজাদের মধ্যে নৈতিকতা ও আদর্শ ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হবেন।


৬. শ্রবণযোগ্য ও বুদ্ধিমান:

জনগণের কথা শুনতে এবং তাদের সমস্যা উপলব্ধি করতে সক্ষম হবেন। পাশাপাশি সিদ্ধান্ত গ্রহণে যুক্তিবাদী হবেন।


৭. শিক্ষা ও দীক্ষায় পরিপূর্ণ:

শাসককে বৈজ্ঞানিক, ধর্মীয় এবং দার্শনিক জ্ঞানসম্পন্ন হতে হবে, যাতে তিনি জ্ঞানের আলোকে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে পারেন।


৮. মানবকল্যাণে উৎসর্গিত:

তিনি নিজের স্বার্থ নয়, জনগণের স্বার্থকে প্রাধান্য দেবেন এবং ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনে নিবেদিত থাকবেন।


উপসংহার:

আল-ফারাবীর আদর্শ রাষ্ট্রের শাসক কেবলমাত্র রাজনীতিক নয়, তিনি একজন পূর্ণাঙ্গ মানব, যিনি নৈতিকতা, প্রজ্ঞা, জ্ঞান ও মানবিকতাকে একত্রিত করে সমাজকে একটি ন্যায়ের ভিত্তিতে পরিচালনা করেন। তাঁর এই আদর্শ শাসকচিন্তা পরবর্তীকালে ইসলামী ও পাশ্চাত্য রাজনীতিবিদ্যায় গভীর প্রভাব ফেলেছে।

Friday, June 28, 2024

বাংলাদেশের সংবিধানে নারীর অধিকার -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

 

বাংলাদেশের সমস্ত কর্মক্ষেত্রে পুরুষের পাশাপাশি নারীর সরব অংশগ্রহণ দৃশ্যমান। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান সবক্ষেত্রে নারীর পদচারণা যেমন বেড়েছে, তেমনি সমাজে নারীকে শক্তিশালী করতে তৈরি করা হয়েছে আইনি সুরক্ষা বলয়, যার ওপর দাঁড়িয়ে এখন নারী সংকটে সংগ্রাম করতে শিখেছে ও শিখছে।

জাতিসংঘের সার্বজনীন মানবাধিকারের ঘোষণায় নারী–পুরুষ নির্বিশেষে সমান মানবিক মর্যাদা, আইনের আশ্রয়লাভ, কর্ম বেছে নেয়া ও সামাজিক নিরাপত্তার অধিকারের স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। বিবাহ, দাম্পত্য জীবন এবং বিবাহ বিচ্ছেদের ক্ষেত্রে নারী পুরুষ দুজনের সমান অধিকার এবং সাধারণ স্বাস্থ্য কল্যাণের পাশাপাশি মাতৃত্বকালীন স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের উপর জোর দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানে মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্রের এসব অঙ্গীকারের প্রতিফলন রয়েছে। পৃথিবীর অন্যান্য রাষ্ট্রের মতো আমাদের সংবিধানেও নারীর অধিকার নিয়ে স্পষ্ট বলা আছে। সংবিধানের বেশ কয়েকটি অনুচ্ছেদে অত্যন্ত সুনিপুণ ও সুন্দরভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে নারীর অধিকারগুলো। কিন্তু আমাদের দেশের অধিকাংশ নারীই তার সাংবিধানিক অধিকার সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নয়। তারা জানে না, একজন মানুষ কিংবা রাষ্ট্রের একজন নাগরিক হিসেবে কী তার অধিকার। ফলে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে নিজের অধিকার আদায়ের জন্য সোচ্চার হতে পারে না।

বাংলাদেশে নারীদের সাংবিধানিক অধিকার: গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সংবিধানের আলোকে প্রত্যেক নাগরিকের জন্য সম–অধিকার নিশ্চিত করার কথা বর্ণিত হয়েছে। এক্ষেত্রে নারী–পুরুষ ধমর্–বর্ণ নির্বিশেষে সকলের মানবাধিকার নিশ্চিতসহ সম–অধিকার, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক সকল সুযোগ সুবিধা, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত করাই সংবিধানের মূল মন্ত্র।

বাংলাদেশের সংবিধানের আলোকে নারীদের নিম্নবর্ণিত অধিকারের কথা নিশ্চিত করা হয়েছে:

অনুচ্ছেদ ০৮। রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি

জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা

এই নীতিসমূহ এবং তৎসহ এই নীতিসমূহ হইতে উদ্ভূত এই ভাগে বর্ণিত অন্য সকল নীতি রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি বলিয়া পরিগণিত হইবে।

অনুচ্ছেদ ১০। সমাজতন্ত্র ও শোষণ মুক্তি –

মানুষের উপর মানুষের শোষণ হইতে মুক্ত ন্যায়ানুগ ও সাম্যবাদী সমাজলাভ নিশ্চিত করিবার উদ্দেশ্যে সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হইবে।

অনুচ্ছেদ ১১। গণতন্ত্র ও মানবাধিকার

প্রজাতন্ত্র হইবে একটি গণতন্ত্র, যেখানে মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা থাকিবে, মানবসত্তার মর্যাদা ও মূল্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নিশ্চিত হইবে [এবং প্রশাসনের সকল পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত হইবে।]

অনুচ্ছেদ ১৯। সুযোগের সমতা –

(১) সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা নিশ্চিত করিতে রাষ্ট্র সচেষ্ট হইবেন।

(২) জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে মহিলাদের অংশগ্রহণ ও সুযোগের সমতা রাষ্ট্র নিশ্চিত করিবেন।

অনুচ্ছেদ ২৭। আইনের দৃষ্টিতে সমতা সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।

অনুচ্ছেদ ২৮। ধর্ম প্রভৃতি কারণে বৈষম্য

(১) কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারীপুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোন নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করিবেন না।

(২) রাষ্ট্র ও গণ জীবনের সর্বস্তরে নারী পুরুষের সমান অধিকার লাভ করিবেন।

(৩) কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারীপুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে জনসাধারণের কোন বিনোদন বা বিশ্রামের স্থানে প্রবেশের কিংবা কোন শিক্ষা– প্রতিষ্ঠানে ভর্তির বিষয়ে কোন নাগরিককে কোনরূপ অক্ষমতা, বাধ্যবাধকতা, বাধা বা শর্তের অধীন করা যাইবে না।

(৪) নারী বা শিশুদের অনুকূলে কিংবা নাগরিকদের যে কোন অনগ্রসর অংশের অনগ্রগতির জন্য বিশেষ বিধান–প্রণয়ন হইতে এই অনুচ্ছেদের কোন কিছুই রাষ্ট্রকে নিবৃত্ত করিবে না।

অনুচ্ছেদ ৩৮। সংগঠনের স্বাধীনতা জনশৃংখলা ও নৈতিকতার স্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধা–নিষেধ সাপেক্ষ সমিতি বা সংঘ গঠন করিবার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের থাকিবে –

তবে শর্ত থাকে যে, কোন ব্যক্তির উত্তমরূপ সমিতি বা সংঘ গঠন করিবার কিংবা উহার সদস্য হইবার অধিকার থাকিবে না, যদি:

(ক) উহা নাগরিকদের মধ্যে ধর্মীয়, সামাজিক এবং সামপ্রদায়িক সমপ্রীতি বিনষ্ট করিবার উদ্দেশ্যে গঠিত হয়;

(খ) উহা ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী–পুরুষ, জন্মস্থান বা ভাষার ক্ষেত্রে নাগরিকের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি করিবার উদ্দেশ্যে গঠিত হয়;

(গ) উহা রাষ্ট্র বা নাগরিকের বিরুদ্ধে কিংবা অন্য কোন দেশের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী বা জঙ্গী কার্য পরিচালনার উদ্দেশ্যে গঠিত হয়; বা

(ঘ) উহার গঠন ও উদ্দেশ্যে এই সংবিধানের পরিপন্থী হয়।]

অনুচ্ছেদ ৬৫ । সংসদ প্রতিষ্ঠা

সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৬৫ (৩) এ জাতীয় সংসদের পঞ্চাশটি আসন কেবল মহিলা সদস্যদের জন্য সংরক্ষিত রাখা হয়েছে যারা জাতীয় সংসদের মাননীয় সংসদ সদস্যদের মাধ্যমে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতির ভিত্তিতে একক হস্তান্তর যোগ্য ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত হবেন।

নারীর উন্নয়ন ও অগ্রগতির ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ কুসংস্কার অনেক পুরনো। পশ্চাৎপদ দৃষ্টিভঙ্গি, সামাজিক ও ধর্মীয় রক্ষণশীলতা, রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহারের সঙ্গে ইদানীং যুক্ত হয়েছে উগ্র সামপ্রদায়িক রাজনীতি। এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করেই নারীদের অগ্রসর হতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত। পুরুষের লড়াই সমাজে ও রাষ্ট্রে মানুষ হিসেবে। কিন্তু নারীর লড়াই মানুষ হিসেবে তো আছেই সে সাথে নারীর হিসেবেও তাকে আলাদা লড়াইয়ে সামিল হতে হয়।

নারীকে অধস্তন হিসেবে দেখার পারিবারিক ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি যতদিন বদল না হবে, নারীকে মানুষ হিসেবে দেখার মানসিকতা যতদিন গড়ে না উঠবে ততদিন নারীকে অসম্মান এবং বৈষম্যের শিকার হতে হবে বলেই মনে করা হয়। তবে নারীর লড়াইয়ে একটা বড় হাতিয়ার তার সাংবিধানিক অধিকার। অধিকার সম্পর্কে সচেতন হলে বন্ধুর পথ চলা সহজ হবে। 

 

 বাংলাদেশের সংবিধানে নারীর অধিকার -- রিমঝিম আহমেদ

Wednesday, May 31, 2023

বাংলাদেশের গ্রামীণ সংস্কৃতি ও শহরের সংস্কৃতির মধ্যে পার্থক্য

বাংলাদেশ গ্রামপ্রধান দেশ। এদেশের অধিকাংশ লোক গ্রামে বসবাস করে। কৃষিকে কেন্দ্র করে। কৃষকরা যেখানে বসবাস করে তাই গ্রামীণ সমাজ। গ্রামীণ সমাজ যে সংস্কৃতি লালন-পালন করে তাই গ্রামীণ সংস্কৃতি। 

আর শহরের লোকজনের আচার-আচরণ, রীতিনীতি, পোশাক-পরিচ্ছদ, কথাবার্তা মিলেই শহরের সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। নিয়ে বাংলাদেশের গ্রামীণ সংস্কৃতি ও শহরের সংস্কৃতির মধ্যে পার্থক্য তুলে ধরা হলো :


সংস্কৃতির মধ্যে পার্থক্য : 

কোন জাতির পরিচয় বহন করে সংস্কৃতি। মানুষের সৃষ্ট সব বস্তুগত ও অবস্তুগত উপাদানই সংস্কৃতি। সংস্কৃতি হলো একটি জীবনপ্রণালি। নিম্নে বাংলাদেশের গ্রামীণ সংস্কৃতি ও শহরের সংস্কৃতির মধ্যে পার্থক্য উল্লেখ করা হলো :

 

১. সংজ্ঞাগত পার্থক্য : 

গ্রাম এলাকায় বসবাসরত লোকের আচার-আচরণ, ধর্মীয় বিশ্বাস, জীবনপ্রণালি, রীতিনীতি নিয়ে যে সংস্কৃতি গড়ে ওঠে তাই গ্রামীণ সংস্কৃতি। অন্যদিকে, শহরের লোকজনের কথাবার্তা, আচার-আচরণ, রীতিনীতি ইত্যাদির সমন্বয়ে যে সংস্কৃতি গড়ে ওঠে তাই শহরের সংস্কৃতি। 

 

২. পরিবার কাঠামো :

গ্রামীণ এলাকার জনগণ যৌথ পরিবারে বসবাস করে। যৌথ পরিবার কৃষিকাজকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে। যৌথ পরিবারে পারস্পরিক বন্ধনে সদস্যরা বসবাস করে। অন্যদিকে শহরের একক পরিবার বেশি দেখা যায়। চাকরির বা অন্য কোন কারণে শহরের একক পরিবারে সংখ্যা বেশি হয়ে থাকে।

 

৩. পেশাগত পার্থক্য : 

গ্রামীণ সংস্কৃতির অন্যতম উপাদান কৃষি গ্রামীণ এলাকার অধিকাংশ লোক কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে। গ্রামীণ এলাকায় কৃষকেরা বিভিন্ন ফসল উৎপাদন করে। তা বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। শহরের বিভিন্ন পেশাজীবী লোক বাস করে। চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, শ্রমিক ইত্যাদি লোক বসবাস করে থাকে।

 

৪. শিক্ষাগত সুযোগ সুবিধা : 

গ্রামীণ ও শহরের মধ্যে শিক্ষাগত সুযোগ সুবিধার পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। গ্রামে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কম ও অনুন্নত ধরনের। গ্রামে শিক্ষা সচেতনতা কম। অন্যদিকে শহরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা অনেক। শহরে মানসম্মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনেক। শহরে অল্প খরচে শিক্ষা লাভ করা যায়।

 

৫. পারস্পরিক সম্পর্ক : 

গ্রামীণ সমাজে জনসংখ্যার মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নত। সবাই পরস্পরের প্রতি সহনশীল। বিপদে-আপদে একজন অন্যজনকে সাহায্য-সহযোগিতা করে। শহরের লোকদের মধ্যে সম্প্রীতির ঘাটতি লক্ষ্য করা যায়। শহরের লোকজন একক সমাজে বসবাস করে, তাই তাদের পরিবারের সদস্যরা গ্রামে বসবাস করে।

 

৬. বিনোদনের ক্ষেত্রে :

বিনোদনের ক্ষেত্রেও গ্রামীণ ও শহরের সংস্কৃতির মধ্যে পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। গ্রামীণ লোকজন বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি অনুযায়ী পালন করে থাকে। শহরের লোকজন টিভি, সিনেমা, থিয়েটার, কনসার্ট ইত্যাদি অনুষ্ঠানে যোগদান করে থাকে।

 

৭. ধর্মাচারে পার্থক্য : 

গ্রামীণ মানুষ ধর্মভীরু। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান শ্রদ্ধার সাথে পালন করে থাকে। অন্যদিকে, শহরের মানুষ ধর্মের প্রতি খুব আগ্রহী নয়। তারা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান অনুষ্ঠানভিত্তিক পালন করে থাকে। উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে, সংস্কৃতি একটি জীবনপ্রণালি। 

মানুষ যা কিছু করে তাই তার সংস্কৃতি। দেশ- কাল-পাত্রভেদে সংস্কৃতির তারতম্য লক্ষ্য করা যায়। গ্রামীণ সংস্কৃতির সাথে শহরের সংস্কৃতির পার্থক্য রয়েছে। গ্রাম এলাকার জনগণ সহজ সরলভাবে জীবনযাপন করেন। তাদের আচার-আচরণ, জীবনব্যবস্থা, শহরের থেকে ভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে।

 

উপসংহার : 

পরিশেষে বলা যায় যে, সংস্কৃতি একটি জীবনপ্রণালি। মানুষ যা কিছু করে তাই তার সংস্কৃতি। দেশ- কাল-পাত্রভেদে সংস্কৃতির তারতম্য লক্ষ্য করা যায়। গ্রামীণ সংস্কৃতির সাথে শহরের সংস্কৃতির পার্থক্য রয়েছে। 

গ্রাম এলাকার জনগণ সহজ সরলভাবে জীবনযাপন করেন। তাদের আচার-আচরণ, জীবনব্যবস্থা, শহরের থেকে ভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে।

Saturday, April 17, 2021

THE ROLE OF NGOs FOR RURAL DEVELOPMENT OF BANGLADESH


Bangladesh has been perhaps the most important hearth on the globe for NGOs (non-government organization). Some estimates place the number of NGOs in Bangladesh in excess of 20,000. there are many types of NGOs in the country, but most focus on development or poverty alleviation. Bangladesh is the birth place of the micro credit NGO, namely Grameen Bank, Asa, Brac etc work in world wide. Grameen Bank with Dr. Muhammad Yunus jointly awarded the Nobel Peace prize in 2007.

 

HISTORY OF NGOs

International Red Cross and Red Crescent Movement is the world largest group of humanitarian NGOs. Though voluntary associations of citizens have existed through history, NGOs along the lines seen today. One of the first such organizations, the International Committee of the Red Cross, was founded in 1863. The phrase ‘Non-Government Organization’ came into use with the establishment of the United Nations in 1945 with provisions in article 71 of the United Nations charter. In Bangladesh NGOs activities began in the seventies following the aftermath of 1970 tidal cyclone and 1971 independence war. Globalization during the 20th century gave rise to the importance of NGOs.

 

TYPES OF NGOs

NGOs are an heterogeneous group. A long list of acronyms has development around the term NGO. These include:

  • INGO- stands for international NGO, such as CARE, Helvetas, ADFA-India.
  • BINGO- is short for Business-Oriented International NGO.
  • RINGO- is an abbreviation of Religious International NGO such as Catholic Relief.
  • ENGO- short for Environmental NGO, such as Global 2000.
  • GONGOs- are Government Operated NGOs, which may have been set up by government to look like NGOs in order to qualify for outside aid or promote the interests of the government is question.

 

PURPOSES OF NGOs

NGOs exist for a variety of purpose, usually to further the political or social goals of their members. Examples include improving the state of the natural environment, encouraging the observance of human rights, improving the welfare of the disadvantaged or representing a corporate agenda. However, there are a huge number of such organizations and their goals cover a broad range of political and philosophical positions.

 

THE ROLE OF NGOs FOR RURAL DEVELOPMENT

NGOs play an important role for rural development of Bangladesh it is doubtless to say that NGOs with their constructive efforts have been promoting development strategies by creating unique changes in the field of economic progress in Bangladesh since her independence.

 

Poverty Alleviation:

Poverty alleviation is the supreme target of the NGO among various activities. There are different NGOs acting in our country patronized locally and internationally. NGO plays an important role in promoting the capabilities of the people having in the poverty.

 

Education Programme:

Though primary education is compulsory programme of the government. Students of the rural areas are not regular and careful about that. NGO has taken long planning to provide primary education suitable for the children living in the villages. In the field of education NGO primary schools with around two million students account for approximately 10 percent of currently enrolled students. Of these BRAC alone accounts for over 1.5 million students in 31,000 schools, 66 percent of whom are girls from poor families.

 

Standard of Living:

For the standards of the living of the people the NGOs have taken lots of programmes. The officer of the NGOs go to the rural and remot ares of the country and by their physical visit and communication they make the people understand the benefits of building sound health. The villagers don’t have minimum idea of regarding the nutrition of food and first aid. So, NGOs provide them a little bit of idea of medical science by which they can learn how to give the first aid.

 

Development of Agriculture:

NGOs play an important role in the development of agriculture in our country. In order to development of agriculture they provide different kinds of tools, material, fertilizer, seed and loan on simple interest. Sometimes they give interest free loan. In  this way NGOs play an important role in the development of agriculture.

 

Health Care:

NGO community based health care has made heath care more accessible, effected malnutrition and child survival. It also lead to higher use of family planning.

 

Gender Equity:

Bangladesh is the only country in South Asia to have achieved gender equity in primary enrollment, in large part due to the role played by NGOs.

 

Supply Information and data:

Effective plan and programming of our national instruction require reliable data and information which collection then through their personal observation and friendship. Most of the NGOs in Bangladesh have practical experience of organizing people to achieve their predetermined objectives.


Raising Fund:

NGO plays an important role in raising fund of the country from different sources including small donation from the potential individuals. They also know where to allocate the funds for the purpose.

 

Social Economic Development:

NGOs touch the fundamental elements of socio-economic development of the country. If human resources are not properly used it will be gradually inactive and useless for the country bringing no utility. So NGOs with their pragmatic and practical programmers are always acting to bring fruitful after math of the said resources.

 

Uplifting programme:

NGOs are active in our grass-root levels with their relief, poverty alleviation, social uplift, environmental and overall development programmes. The rural poor have now direct access to the aid, credit and support to the NGOs. They are participating actively in the activities to improve their lat. In many cases the NGOs are working as the awareness builders.

 

Communication Facilities:

NGOs not only their own sake but also for the local and national interest they build many roads, bridges and highways to provide communication facilities. Considering to uplift the standard of the lives of the people the NGOs have taken lots of developing programmes. They go to the rural and remotest area of the country. They try to make the people understand the benefit of building sound health.

 

NGO plays a very important role in the developing country like Bangladesh specially rural development. In all spheres of development NGOs are reported to have created a land mark in the history of Bangladesh.


33rd BCS (General Education) Cadre Officer.

 

 

Monday, April 5, 2021

বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে নারী ও রাজনীতি অধ্যয়নের গুরুত্ব

বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে নারী ও রাজনীতি অধ্যয়নের গুরুত্ব অপরিসীম। বাংলাদেশ নামক দেশটি ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে মাধ্যমে স্বাধীন হয়েছে। স্বাধীনতা যুদ্ধে নারীর অবদান কোন অংশেই কম নয়। নারী ও পুরুষের গভীর আত্মত্যাগই আমাদের স্বাধীনতার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপায়িত করেছে। নারীরাও এ স্বাধীন দেশের নাগরিক, অথচ আমাদের সমাজে নারীরা এখেেনা পুরুষ কর্তৃক অবদমিত ও অবহেলিত। তাই নারীর প্রতি এই নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি দূর করে একটি সুষম সমাজ গড়ে তুলে স্বাধীনতার স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে একটি আলাদা বিষয় হিসেবে নারীও রাজনীতি অধ্যয়ন করা প্রয়োজন। নিম্নে এ সম্পর্কে আলোচনা করা হলো :

১. দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন : দীর্ঘকাল ঔপনিবেশিক শাসন, পাকিস্তান আমলে ধর্মীয় গোঁড়ামি বাংলাদেশের সমাজে যে রক্ষণশীলতার জন্ম দিয়েছে নারী তা দ্বারা প্রত্যক্ষভাবে ক্ষতির শিকার হচ্ছে। ফলে পুরুষ আধিপত্য বেড়েই চলছে। এর মূল কারণ নারীর প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ। নারী ও রাজনীতি অধ্যয়নের ফলে সমাজের এ দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে সম্ভব। এ জন্যই বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে নারী বিষয় বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা খুবই জরুরি।
২. নারী সচেতনতা বৃদ্ধি : বাংলাদেশ আয়থন ও জনসংখ্যার তুলনায় ছোট এবং দরিদ্র দেশ। দারিদ্র্য, সামাজিক কুসংস্কার পরস্পর সহাবস্থান করে। ফলে নারীর উন্নয়ণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। নারীরা তাদের অধিকার ও কর্তব্য সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন নয়। তাই নারী অধ্যয়নের মাধ্যমে নারীদের অনগ্রসরতার কারণগুলো চিহ্নিত করে নারী উন্নয়ণ ত্বরান্বিত করা সম্ভব। এ কারণেই নারী অধ্যয়ন খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
৩. নারী ক্ষমতায়ন : বাংলাাদেশের নারী সমাজ পুরুষের তুলনায় এখনো অনগ্রসর। কেবল পার্লামেন্টের সংরক্ষিত নারী আসনই নারী ক্ষমতায়নের দৃষ্টান্ত হতে পারে না। পুরোপুরি নারী ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে হলে পরিবার; সমাজ ও রাষ্ট্রে নারীর ভূমিকা আরো বাড়াতে হবে। নারী ক্ষমতায়নের এ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা এবং নারীর ক্ষমতায়নের পথে প্রতিবন্ধকতাসমূহ দূর করার লক্ষ্যে বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে নারী অধ্যয়ন খুবই জরুরি।
৪. নির্যাতন প্রতিরোধ : নারীনির্যাতন বাংলাদেশের নারী সমাজের জন্য একটি অভিশাপ। আমাদের সমাজে প্রতিনিয়তই নারীনির্যাতন হচ্ছে। শারীরিক, মানসিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ইত্যাদি ধরনের নারীনির্যাতন লক্ষ্য করা যায়। তবে অধিকাংশ নারীনির্যাতন হয়ে থাকে যৌতুক সংক্রান্ত কারণে। এছাড়া এসিড নিক্ষেপ, রাস্তাঘাটে নারীরা ইভটিজিং এর শিকার হয়ে থাকে, ধর্ষিত হয়ে থাকে। নারী নির্যাতনের কারণসমূহ চিহ্নিতকরণ ও সমাধানের উপায় জানার জন্য নারী রাজনীতি অধ্যয়ন আবশ্যক। আর এজন্য চবাংলাদেশের প্রেক্ষিতে নারী অধ্যয়ন খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
৫. জেন্ডার বৈষম্য দূর করা : নারীদের অনগ্রসরতার আর একটি অন্যতম কারণ হলো জেন্ডার বৈষম্য। বাংলাদেশের সংবিধানে স্পষ্ট করে বলা আছে যে, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গভেদে নাগরিকদের মাঝে কোন প্রকার বৈষম্য করা যাবে না, কিন্তু নারী সম্পর্কে সমাজে বিদ্যমান নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি যেমন- নারী দুর্বল, হীন, পুরুষের অধস্তন, মেধাহীন ইত্যাদি নারী-পুরুষের বৈষম্য বাড়িয়ে দেয়। নারী অধ্যয়নের মাধ্যমে একাডেমিকভাবে জেন্ডার বৈষম্যের কারণ, ক্ষতিকর প্রভাবসমূহ জানা যায়। বাংলাদেশে নারী ও রাজনীতি অধ্যয়ন অত্যন্ত জরুরি।
৬. ইতিবাচক সামাজিকীকরণ : আজকে নারীর যে অধস্তনত লক্ষ্য করছি তা হাজার বছরের সামাজিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ফল। দীর্ঘদিন যাবৎ অধস্তন থাকার ফলে আমরা লক্ষ্য করছি যে নারী উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে শুধু পুরুষই নয় বরং অনেক নারীও নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করে। এর মূল কারণ নেতিবাচক সমাজিকীকরণ। নারী ও রাজনীতি অধ্যয়নের ফলে এই নেতিবাচক সামাজিকীরকণের প্রভাব দূর করে ইতিবাচক সামাজিকীকরণ করা সম্ভব। তাই বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে নারীর ইতিবাচক সামাজিকীকরণের লক্ষ্যেই নারী ও রাজনীতি অধ্যয়ন জরুরি।
৭. সামাজিক নিরাপত্তা : সামাজিক নিরাপত্তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সামাজিক নিরাপত্তার সাথে অন্যান্য নিরাপত্তা জড়িত। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতৈ নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে হলে সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে ধর্ষণ, রাহাজানি, শ্লীলতাহানী< অবাধে রাস্তাঘাটে চলাচল ইত্যাদি বন্ধ না হলে নারী গৃহের বাইরে যেতে পারের না। তাই নারী অধ্যয়নের মাধ্যমে এ বিষয় বিস্তারিত জানা যাবে না নারীর জন্য সামাজিক নিরাপত্তার বেষ্টনী তৈরিতে সহায়তা করবে।
৮. মাতৃস্বাস্থ্য সুরক্ষা : সুস্থ মা দিতে পারে সুস্থ সন্তানের নিশ্চয়তা আমাদের দেশে অধিকাংশ নারী বাচ্চা প্রসবকালীন সময় বা মাতৃত্বজনিত জটিলতায় মারা যান। আবার কোন কোন মা মাতৃজনিত মাারাত্মক রোগ বহন করে চলছেন সারাজীবন। এর ফলে নবজাতক শিশুর বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। শুধু তাই নয়< এর প্রভাব পড়ছে পুরো পরিবারের উপর। তাই এ অবস্থা থেকে নারীকে সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনের নিশ্চয়তা দিতে পারে বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে নারী ও রাজনীতি অধ্যয়ন খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
৯. নারী শিক্ষা নিশ্চিত করা : নারী উন্নয়নের পূর্বশর্ত হলো নারী শিক্ষা। নারীকে যথাযথ ভাবে শিক্ষিত করা না গেলে নারীদের মধ্যে সচেতনতা জাগ্রত করা যাবে না। বাংলাদেশে নারী শিক্ষার পথে ব্যাপক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। যেমন- পারিবারিক নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি, ধর্মীয় গোড়ামি, মৌলবাদ, দারিদ্র্য ইত্যাদি। নারী অধ্যয়নের মাধ্যমে নরী শিক্ষার পথে এসব প্রতিবন্ধকতাসমূহ চিহ্নিত করা যায় এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে নারী শিক্ষা নিশ্চিত করা যেতে পারে।
১০. নারী উন্নয়ন ও দাতা সংস্থার ভূমিকা : নারী ক্ষমতায়ন দাতাগোষ্ঠী ও বিভিন্ন এনজিও’র অন্যতম লক্ষ্য। অধিকাংশ দাতাগোষ্ঠী নারীকে টার্গেট গ্র“প হিসেবে বিবেচনা করে। বাংলাদেশে নারী উন্নয়নের লক্ষ্যে দাতাগোষ্ঠী ও এনজিও কর্তৃক গৃহীথ বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে এবং বর্তমানে বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। এসব প্রকল্পে নারী উন্নয়ন ও ক্ষমতায়ন হচ্ছে বলে দাবি করা হয়। নারী অধ্যায়নের মাধ্যমে এসব দাবির সত্যতা যাচাই করা যেতে পারে।
 
পরিশেষে বলা যেতে পারে যে, বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ। এ দেশটির উন্নয়নের সকল ক্ষেত্রে নারীকে সম্পৃক্ত করতে পারলে সত্যিকার অর্থেই এখানে সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করা যাবে। নারীকে সম্পৃক্ত করে বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়ণ গতিশীল করতে নারী ও রাজনীতি অধ্যয়ন অতীব গুরুত্বপূর্ণ।

 

 ৩৩ তম বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা)

Sunday, April 4, 2021

নারীর উপর বিশ্বায়নের প্রভাব

বিশ্বায় পুজিতন্ত্রায়নেরই একটি নতুন রূপ। এটি বর্তমান বিশ্বব্যবস্তার একটি অন্যতম প্রক্রিয়াও বটে। বস্তুত, আমরা যে সমাজে বাস করছি, সে সমাজে সকল সামাজিক প্রক্রিয়া বিশ্বায়ন দ্বারা প্রভাবিত ও পরিচালিত। মূলত আজকের বিশ্বে পুর্জি প্রযুক্তি ও শ্রমের অবাধ প্রবাহ বিশ্বায়ন নামে পরিচিত। আমাদের জীবনের সকল স্তরেই বিশ্বায়নের প্রভাব রয়েছে। নারীর উপর বিশ্বায়নের নানা প্রভাব বিদ্যমান।
বিশ্বায়ণঃ
সাধারণভাবে বিশ্বায়ন বোঝাতে ৩টি ধারণা ব্যাখ্যা করা হয়। এগুলো হলো :
i. Cros border relations.
ii. Open border relations.
iii. Trans border relations.
প্রামাণ্য সংজ্ঞাঃ বিভিন্ন চিন্তাবিদ বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে বিশ্বায়নে সংজ্ঞা প্রদান করেছেন। নিম্নে তাদের প্রদত্ত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংজ্ঞা উল্লেখ করা হলোঃ
অনিতা রডিস এর মতে, “অর্থনৈতিক উদারনীতিকরণ, যেমন-নিয়ন্ত্রণমূক্তকরণ, বেসরকারিককরণ এবং অধিকতর মুক্ত বাণিজ্য ও বিনিয়োগের মাধ্যমে বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্তার সাথে সংহতিকরণকে বিশ্বায়ণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।”
অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আইয়ুব রহমান ভুইয়া বলেছেন, “বিশ্বায়ণ বলতে বাণিজ্য উদারীকরণ, যেমন নিয়ন্ত্রণমুক্ত করণ, বেসরকারিকরণ ও বিশ্ব অর্থনীতিতে মুক্ত ও অবাধ বাণিজ্য বুঝায়।”
জার্মান অর্থনীতিবিদ জর্জ শেল বলেছেন, “Globalization is the benchmarking for economic activities in which the standards in profit making is the deciding factor.” অর্থাৎ বিশ্বায়ন হলো মুনাফা সর্বোচ্চকরণের জন্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যা দেশের সীমানার অভ্যন্তরে বা বাইরে যে কোন স্থানে পরিচালিত হতে পারে।
নারীর উপর বিশ্বায়নের ইতিবাচক প্রভাবঃ
নিম্নে নারীর উপর বিশ্বায়নের ইতিবাচক প্রভাব আলোচনা করা হলোঃ
১. নারীমুক্তি আন্দোলনের অভ্যুদয় ও বিকাশঃ নারী মুক্তি আন্দোলনের অভ্যুদয় ও বিকাশ বিশ্বায়ন গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা। পালন করেছে। পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ নারীর প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বিশ্বায়ন গুরুত্বপূর্ণূ ভূমিকা পালন করেছে। বিশ্বায়নের প্রভাবেই নারীবাদী আন্দোলন ক্রমশ বৈশ্বিক রূপ লাভ করে এবং পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে।
২. নারীর অধিকার ও মর্যাদার স্বীকৃতিঃ সারা বিশ্বে নারীর অধিকার ও মর্যাদা আদায়ের জন্য যে বিভিন্ন রকম সংগ্রাম ও আন্দোলন হয়েছে তাকে যৌক্তিক করে তুলেছে বিশ্বায়ণ। বিশ্বায়নের ফলেই জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে নারী অধিকার স্বীকৃত হয়েছে।
৩. আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলনঃ বিশ্বায়নের ফলে নারীমুক্তি আন্দোলন আজ আন্তর্জাতিক রূপ লাভ করেছে। ফলে আন্তর্জাতিকভাবে নারী উন্নয়নের বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। এক্ষেত্রে আন্তর্ঝাতিক সংগঠন, বিশ্বব্যাংক, বিশেষ করে জাতিসংঘ সবচেয়ে বেশি ভূমিকা পালন করছে।
৪. নতুন নতুন তত্ত্ব ও ধারণার উদ্ভবঃ বিশ্বায়নের ফলে নানা নতুন তত্ত্বের পাশাপাশি নারীবাদী বিভিন্ন তত্ত্বের উদ্ভব ঘটেছে। যেমন উদার নারী বাদী, মৌলিক নারীবাদী, সমাজতান্ত্রিক নারীবাদী< সাংস্কৃতিক নারীবাদী, পরিবেশ নারীবাদী প্রভৃতি। এসব তত্ত্ব বিশ্বব্যাপী প্রচার হওয়ার ফলে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তণ ঘটছে এবং নারীর উন্নয়ন সাধন হচ্ছে।
৫. নারীর ক্ষমতায়ন ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধিঃ বিশ্বায়নের প্রভাব সারা বিশ্বে নারীর ক্ষমতায়ন বৃদ্ধি পেয়েছে এবং নারীরা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করছে। তারা স্থানীয় ও রজাতীয় নির্বাচনেও অংশ নিচ্ছে।
৬. নারী শিক্ষার হার বৃদ্ধি পাচ্ছেঃ বিশ্বায়নের ইতিবাচক প্রভাবের ফলেই সারা বিশ্বে নারী শিক্ষার হার বৃদ্ধি পেয়েছে। নারী শিক্ষাকে উৎসাহিত করার জন্য উপবৃত্তি, বিনা বেতনে পড়ার সুযোগ ইত্যাদি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এটি নারী শিক্ষাকে ত্বরান্বিত করতে সাহায্য করছে।
নারীর উপর বিশ্বায়নের নেতিবাচক প্রভাবঃ
নারীর উপর বিশ্বায়নের নেতিবাচক প্রভাব বেশ মারাত্মক। এর ফলে নারীর ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবন মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নিম্নে এর নেতিবাচক প্রভাব আলোচনা করা হলোঃ
১. সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও বিভ্রাস্ত নারীঃ বিশ্বায়নের নেতিবাচক প্রভাবের ফলে বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতি আমাদের দেশের সংস্কৃতির উপর নেতিবাচক প্রভাব র্ফেলছে। সংস্কৃতি ও নারীর সাথে নিবিড় সম্পর্ক থাকে। বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতির অনুপ্রবেশের কারণে সন্তানের লালন-পালনের ক্ষেত্রৈ দ্বান্দ্বিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় এবং নারী বিভ্রান্তিতে পড়ে। ফলে তার মধ্যে এক ধরনের সংকট তৈরি হয়, যা তার জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে।
২. পুরষতন্ত্রের ভিত্তিকে দৃঢ় করেঃ বিশ্বায়ন হলো পুজিবাদের উপজাত। আর পুজিবাদ এর সাথে পুরূষতন্ত্রের সম্পর্ক নিবিড়। পুজিবাদ পুরুষতন্ত্র উবয় শোষণের মাধ্যমে নিজের অবস্তান অব্যাহত রাখতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। পুরষতন্ত্রের ভিত্তি সুদৃঢ় হবার ফলে নারীরা গৃহে আবদ্ধ হয়ে পড়ে।
৩. পরিবেশ বিপর্যয় ও নারীঃ বিশ্বায়নের ফলে যততত্র নগরায়ন হচ্ছে এবং শিল্পায়ন ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে নানা কলকারখানা গড়ে উঠছে এবং পরিবেশ বিপর্যয় দেখা দিচ্ছে। বিভিন্ন প্রতিকূল পরিবেশে নারীরা নিজের জীবন রক্ষা করতে পারছে না। শিল্পায়নে নেতিবাচক প্রভাবে শিল্প ও প্রযুক্তির ব্যাপক বিকাশ হচ্ছে র্ফলে ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পের বাজার দখল করে নিয়েছে শিল্পায়িত বিভিন্ন সামগ্রী। এর ফলে তার জীবনযাপন দুঃসাধ্য হয়ে উঠেছে।
৪. হস্ত ও কুটিরশিল্পায়নঃ বিশ্বায়নের নেতিবাচক প্রভাবে শিল্প ও প্রযুক্তির ব্যাপক বিকাশ হচ্ছে। ফলে ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পের বাজার দখল করে নিয়েছে শিল্পায়িত সামগ্রী। এতে নারী তার কর্মসংস্থান হারাচ্ছে এবং পরিবারে তার আয়ের যোগান দেয়া সম্ভব হচ্ছে না।
৫. কৃষিতে নারীর ভূমিকা হ্রাসঃ বিশ্বায়নের ফলে কৃষিকাজেও নারীর ভূমিকা হ্রাস পেয়েছে। বীজ সংগ্রহ চারা উৎপাদন ফসল মাড়াই প্রভৃতি ক্ষেত্রে বিভিন্ন যন্ত্রপাতির আবিষ্কার হওয়ার ফলে কৃষিক্ষেত্রে নারীকে আর তেমন প্রয়োজন হয় না। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নারীকে এসব কার্মকাণ্ড থেকে অব্যাহতি দিয়েছে।
৬. যুদ্ধ, জাতিগত সংঘর্ষ ও নারীঃ বিশ্বায়নের নেতিবাচক প্রভাবের কারণে বিশ্বব্যাপী একক সংস্কৃতি পরিমণ্ডল তৈরি করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু এ প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয় যখন ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলো টিকে থাকার জন্য সংগ্রাম করে। এর ফলে পুরুষেরা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে এবং নারীরা অরক্ষিত থেকে যায়। ফিলিস্তিন ও কাশ্মীরে বিধবা নারীর সংখ্যা প্রতিনিয়তই বাড়ছে।
৭. গণমাধ্যম ও নারীঃ বিশ্বায়নের নেতিবাচক প্রভাবের ফলে বিভিন্ন পণ্যের গুণগত মান তুলে ধরার জন্য নারীকে অপ্রাসঙ্গিক ও অশালীনভাবে তুলে ধরা হচ্ছে। ফলে এর নেতিবাচক প্রভাব নারীর উপর পড়ছে।
 
পরিশেষে বলা যায়, বিশ্বায়নের নানা ইতিবাচক প্রভাব নারীর উপর রয়েছে। বিশ্বায়নের ফলেই নারী মুক্তি আন্দোলন সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে এবং নারী উন্নয়ণ সম্পর্কিত বিভিন্ন তত্ত্বের উদ্ভব হয়েছে। বিশ্বায়নের ইতিবাচক প্রভাবের সাথে সাথে এর কিছু নেতিবাচক প্রভাব নারীর উপর বিদ্যমান। বিশ্বায়নের নেতিবাচক প্রভাব কখনই আমাদের জীবনে সুফল বয়ে আনতে পারে না। তাই এর নেতিবাচক দিকগুলোকে আমাদের পরিহার করতে হবে।
 


৩৩ তম বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা)

Friday, April 2, 2021

বঙ্গভঙ্গ, বঙ্গভঙ্গের কারণ ও ফলাফল

বঙ্গভঙ্গ

বঙ্গভঙ্গ পূর্বে 'বাংলা প্রেসিডেন্সী' নামে যে বৃহৎ আয়তনবিশিষ্ট বঙ্গ প্রদেশ ছিল তার পূর্বাঞ্চলের ৩টি বিভাগ_ঢাকা, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম ছিল পশ্চিমাঞ্চলের পশ্চাদভূমি। পূর্ববাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম সমাজ বহুদিন ধরে এর বিভক্তি কামনা করে আসছিল। লর্ড কার্জনের নিকট নবাব স্যার সলিমুলস্নাহ ভারতের মুসলিম নেতাদের নিয়ে এর বিভক্তি দাবি করেন। তদানীনত্মন রাজনৈতিক প্রেৰাপটে সুচতুর ইংরেজ সরকার এ দাবি বাসত্মবায়নে মনোযোগ দেয়। ইংরেজ সরকার কয়েকটি কারণের ওপর ভিত্তি করে ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর ঢাকা, রাজশাহী এবং চট্টগ্রামের সাথে আসামকে যুক্ত করে 'পূর্ববঙ্গ ও আসাম' নামে একটি নতুন প্রদেশ গঠন করে ঢাকাকে এর রাজধানী ঘোষণা করে। এটাই বঙ্গভঙ্গ।

বঙ্গভঙ্গের কারণ

 বিরাট এলাকা ও বিপুল জনসংখ্যা অধু্যষিত বাংলাকে দুটি প্রদেশে সংগঠিত করার পেছনে নিচের কারণগুলো বিশেষভাবে উলেস্নখযোগ্য :
১। প্রশাসনিক কারণঃ প্রশাসনিক সুবিধা ও দৰতা বৃদ্ধি করা বঙ্গভঙ্গের মূল ও প্রাথমিক কারণ। ব্রি্িটশ সরকারের প্রশাসনিক সুবিধার জন্য বাংলা প্রদেশকে ভাগ করে দুটি আলাদা প্রদেশ করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। ১৮৫৪ সালে বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা, ছোট নাগপুর ও আসাম নিয়ে গঠিত হয়েছিল বাংলা প্রেসিডেন্সি। একজন গবর্নরের পৰে এত বড় প্রদেশ শাসন করা সত্যিই দুরূহ ব্যাপার ছিল। তাই লর্ড কার্জন ১৯০৫ সালে উত্তর ও পূর্ব বাংলাকে আসামের সাথে যুক্ত করে 'পূর্ববঙ্গ ও আসাম' নামে এক নতুন প্রদেশ গঠন করেন। নতুন প্রদেশের রাজধানী হলো ঢাকা। নতুন প্রদেশের প্রথম ছোট লাট হলেন র্যামফিল্ড ফুলার। অপরপৰে পশ্চিমবঙ্গ, বিহার ও উড়িষ্যা নিয়ে 'পশ্চিম বঙ্গ' প্রদেশ গঠিত হয়।
২। রাজনৈতিক কারণঃ পাশ্চাত্যে শিৰার প্রসারের ফলে জনগণের রাজনৈতিক চেতনা বৃদ্ধি পায় এবং জাতীয়তাবাদী আন্দোলন গড়ে উঠতে থাকে। এসব আন্দোলনের কেন্দ্রস্থল ছিল কলকাতা। ঢাকাকে রাজধানী করে সরকার আন্দোলনকে সত্মিমিত করতে সচেষ্ট হয়। এছাড়া ব্রিটিশদের বঙ্গভঙ্গের পেছনে নিম্নোক্ত তিনটি উদ্দেশ্য নিহিত ছিল_
ক) জাতীয়তাবাদী আন্দোলন নস্যাৎ করাঃ ১৮৮৫ সালে 'ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস' নামক একটি রাজনৈতিক দলের জন্ম হয়। কংগ্রেসের নেতৃত্বে সমগ্র ভারতে বিশেষ করে 'বাংলা প্রেসিডেন্সিতে' জাতীয়তাবাদী আন্দোলন শুরম্ন হয়। এ আন্দোলনের কেন্দ্রস্থল ছিল কলকাতা শহর। সুচতুর ইংরেজ সরকার এ জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে নস্যাৎ এবং আন্দোলনকারীদের মেরম্নদ- ভেঙ্গে দেয়ার জন্য বঙ্গভঙ্গ করতে উদ্যোগী হয়। ব্রিটিশ সরকার 'ভাগ কর ও শাসন কর' নীতি অবলম্বন করে।
খ) মুসলমানদের দাবিঃ স্যার সলিমুলস্নাহ বঙ্গভঙ্গের পৰে আন্দোলন শুরম্ন করেন। তিনি জনগণকে বোঝাতে চেষ্টা করেন যে, নতুন প্রদেশ সৃষ্টি হলে পূর্ববাংলার মুসলমানরা নিজেদের ভাগ্যোন্নয়নের সুযোগ পাবে। হিন্দু সম্প্রদায় প্রভাবিত কলকাতার উপর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ৰেত্রে নিভর্রশীলতা হ্রাস পাবে। মুসলমান জনগণ চাকরি ও ব্যবসায়-বাণিজ্যে উন্নতি লাভ করতে পারবে।
গ) আধা-সামনত্মতন্ত্র প্রতিষ্ঠাঃ পূর্ব বাংলায় আধা-সামনত্মতান্ত্রিক রাজনৈতিক কাঠামো প্রতিষ্ঠা প্রয়াসী একটি এলিট শ্রেণী গড়ে ওঠে; তারা বঙ্গভঙ্গের প্রতি সমর্থন জানায়।
৩। অর্থনৈতিক কারণঃ ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের পূর্বে শিল্প, ব্যবসায়-বাণিজ্যি, অফিস-আদালত, কলকারখানা, স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদি প্রায় সব কিছুই কলকাতার কেন্দ্রিভূত ছিল। ফলে পূর্ববঙ্গের মুসলমানরা সর্বৰেত্রেই পিছিয়ে পড়েছিল। অধিকাংশ মুসলমান জনগণ তখন ভাবতে শুরম্ন করে যে, বঙ্গভঙ্গ হলে তারা অর্থনৈতিক উন্নতি অর্জনের সুযোগ পাবে। এ জন্য পূর্ববঙ্গের মুসলমান জনগণ বঙ্গভঙ্গের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন জানায়।
৪। সামাজিক কারণঃ ব্রিটিশ শাসনামলে মুসলমান সম্প্রদায় নির্মমভাবে শোষিত ও বঞ্চিত হতে থাকে। ব্রিটিশ সরকার হিন্দুদের প্রতি উদারনীতি এবং মুসলমানদের প্রতি বৈরী নীতি অনুসরণ করতে থাকে। মুসলমানরা সামাজিক প্রভাব-প্রতিপত্তিহীন একটি দরিদ্র, রিক্ত ও নিঃস্ব সম্প্রদায়ে পরিণত হয়। সুতরাং লর্ড কার্জন কর্তৃক বঙ্গবঙ্গের চিনত্মা-ভাবনা শুরম্ন হলে পূর্ববাংলার মুসলমান সম্প্রদায় স্বভাবতই এর প্রতি সমর্থন জানায়। বঙ্গবঙ্গের মাধ্যমে পূর্ববঙ্গের মুসলমানগণ তাদের হারানো প্রভাব-প্রতিপত্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখতে থাকে।
৫। ধর্মীয় কারণঃ অবিভক্ত বাংলার পূর্ব অংশে মুসলমানগণ ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং পশ্চিম অংশে হিন্দুরা ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ। ফলে এ দৃষ্টিকোণ থেকেও দুই সম্প্রদায়ের জন্য দুটি পৃথক রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়।

বঙ্গভঙ্গের ফলাফল

বঙ্গভঙ্গের ফলাফল সাময়িক হলেও বিশেষ করে পূর্ববঙ্গের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান সম্প্রদায় বেশী লাভবান হয়েছিল।
১) মুসলমান সমাজের প্রতিক্রিয়াঃ বঙ্গভঙ্গের ফলে নতুন প্রদেশ তথা পূর্ববঙ্গ ও আসামের রাজধানী হয় ঢাকা। রাজধানী ঢাকাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। ফলে মুসলমানগণ নানাবিধ সুযোগ-সুবিধা লাভে সৰম হয়। অফিস-আদালত, শিৰাপ্রতিষ্ঠানসহ বড় বড় সুরম্য অট্টালিকা গড়ে ওঠায় ঢাকার শ্রীবৃদ্ধি ঘটে। বঙ্গভঙ্গকে মুসলমানগণ তাদের হৃত গৌরব ও মর্যাদা ফিরে পাবার আনন্দে মেতে ওঠে। নবাব স্যার সলিমুলস্নাহ পরিকল্পনাটি কার্যকর করার দিন ঢাকার এক জনসভায় বলেন, "বঙ্গভঙ্গ আমাদেরকে নিষ্ক্রিয়তার হাত থেকে মুক্তি দিয়েছে। এটা আমাদের উদ্দীপ্ত করেছে কর্ম সাধনায় এবং সংগ্রামে।" অর্থাৎ বঙ্গভঙ্গের ফলে পূর্ব বাংলার গণমানুষের ভাগ্যোন্নয়নের দ্বার উন্মোচিত হয়।
২) হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়াঃ বঙ্গভঙ্গের বিরম্নদ্ধে হিন্দুদের অবস্থান ছিল খুবই কঠিন। বাংলার উচ্চ ও মধ্যবিত্ত হিন্দুরাই এর বিরম্নদ্ধে প্রচ- ঝড় তুলেছিল। তারা প্রচার করেন যে, বঙ্গভঙ্গ 'বঙ্গমাতার অঙ্গচ্ছেদের সমতুল্য।' জাতীয়তাবাদী চিনত্মা-চেতনায় বিকশিত হিন্দু জনসমাজ মনে করেন যে, ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত বাঙালি মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে ধ্বংস করে দেয়ার জন্য বঙ্গভঙ্গ করা হয়েছে। হিন্দু লেখক, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক নেতাগণ বঙ্গভঙ্গকে বাঙালি জাতির বিকাশমান ধারাকে নস্যাৎ করার ষড়যন্ত্র বলে প্রচার করেন। ব্রিটিশ সরকারের এই বিভেদ ও শাসন নীতির বিরম্নদ্ধে তারা প্রচ- গণআন্দোলন গড়ে তোলেন। ফলে ব্রিটিশ পণ্য বর্জনের জন্য স্বদেশী আন্দোলন ও সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেতে থাকে।
৩) ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদী চেতনার বিকাশঃ হিন্দুদের বঙ্গভঙ্গ রদ আন্দোলন মোকাবেলা করার জন্য মুসলিম বুদ্ধিজীবি ও নেতৃবৃন্দ ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ নামক একটি রাজনৈতিক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করে। এভাবে হিন্দু -মুসলিম সম্পর্কে তিক্ততার সৃষ্টি হয়। এবং তা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেতে থাকে। তাই হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদী চেতনার সৃষ্টি হয়।
৪) সন্ত্রাসবাদ ও উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদের উত্থানঃ ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের ফলে ভারতীয় রাজনীতিতে বিশেষ করে বাংলা, পাঞ্জাব ও মহারাষ্ট্রে সন্ত্রাসবাদী ও নাশকতামূলক কার্যকলাপ বৃদ্ধি পায়। সমগ্র ভারতে উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদী চিনত্মা-চেতনা বিসত্মৃত হয়।
৫) ব্রিটিশদের 'ভাগ কর ও শাসন কর' নীতির বিজয়ঃ বঙ্গভঙ্গের রাজনৈতিক প্রভাবে ব্রিটিশ শাসকদের অনুসৃত 'ভাগ কর ও শাসন কর' নীতি জয়যুক্ত হয়। ফলে হিন্দু ও মুসলমান জনগণের মধ্যে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ সৃষ্টি হয়। ভারতের বৃহত্তম দুটি সম্প্রদায় এর ফলে চিনত্মা-চেতনার দিক থেকে বিভক্ত হয়ে পড়ে।
৬) ভারতীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলন নস্যাৎঃ বঙ্গভঙ্গের মাধ্যমে ব্রিটিশ শাসকগণ কৌশলে কলকাতা কেন্দ্রিক সর্বভারতীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলন নস্যাৎ করার সুযোগ লাভ করে। বঙ্গভঙ্গের ফলে সকল পেশাগত শ্রেণী আর্থিকভাবে ৰতিগ্রসত্ম হয়।
 

    (মোঃ হেলাল উদ্দিন, ৩৩ তম বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা)

Thursday, April 1, 2021

প্রাচ্যের রাষ্ট্রচিন্তার অর্থ, প্রকৃতি, পরিধি ও বৈশিষ্ট্য

 প্রাচ্যের রাষ্ট্রচিন্তাঃ

ভৌগোলিক অবস্থানের ভিত্তিতে রাষ্ট্রচিন্তাকে দুইভাগে ভাগ করে আলোচনা করা হয়। যথা- পাশ্চাত্যের রাষ্ট্রচিন্তা এবং প্রাচ্যের রাষ্ট্রচিন্তা। ইউরোপীয় দেশসমূহের চিন্তাবিদদের বিপরীতে প্রাচ্যের তথা মিশর, পারস্য, চীন ও ভারতের চিন্তাবিদদের যে রাজনৈতিক চিন্তাধারা তাই প্রাচ্যের রাষ্ট্রচিন্তা নামে পরিচিত। প্রাচ্যের রাষ্ট্রচিন্তায় মুসলিম রাষ্ট্রচিন্তাবিদদের পদচারণাই মুখ্য।

অন্যভাবে বলা যায়, প্রাচ্যের যে সকল মনীষী ইসলামের বিধিবিধানের আলোকে রাষ্ট্রীয় কাঠামো বিনির্মাণের লক্ষ্যে তাদের চিন্তাধারা ব্যক্ত করতে গিয়ে ইসলাম ভিত্তিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার উপর গুরুত্বারোপ করেন তাই প্রাচ্যের রাষ্ট্রচিন্তা। প্রাচ্যের রাষ্ট্রচিন্তায় আরব, আফ্রিকা, পারস্য, চীন ও ভারতের চিন্তাবিদদের চিন্তাধারাও অন্তর্ভুক্ত।

প্রাচ্যের রাষ্ট্রচিন্তার বৈশিষ্ট্যঃ

১। ধর্মের প্রাধান্যঃ রাষ্ট্রচিন্তার মধ্যযুগে যেমন খ্রিস্টধর্মের প্রভাব বিদ্যমান ছিল তেমনি প্রাচ্যের রাষ্ট্রচিন্তায় ধর্মের প্রাধান্য লক্ষণীয়। যেমন- মিশর, চীন, ভারতের রাষ্ট্রচিন্তা ধর্মের ভিত্তিতেই বিকশিত হয়েছে। আল-ফারাবী, আল-গাজ্জালী, ইবনে সিনা, ইবনে খালদুন প্রমুখ রাষ্ট্রচিন্তাকে ইসলামি ভাবধারার সাথে সামঞ্জস্য বিধান করেই আলোচনা করেছেন।

২। নৈতিকতার প্রাধান্যঃ প্রাচ্যের রাষ্ট্রচিন্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো নৈতিক বিধিবিধানের প্রাধান্য। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রের আলোচনায়, কনফুসিয়াসের জীবন ব্যবস্থায়, মাওবাদের বৈশিষ্ট্যও নৈতিকতাপূর্ণ। আর ইসলামি রাষ্ট্রচিন্তার উৎস যেহেতু ধর্ম, সুতরাং সেখানে নৈতিকতাই মূখ্য।
৩। ইসলামি আইনঃ ইসলামি আইনের মূল উৎস কুরআন, সুন্নাহ্, ইজমা ও কিয়াস। যা প্রাচ্যের রাষ্ট্রচিন্তায়ও বিশেষ অবদান রেখেছে।
৪। খিলাফতঃ প্রাচ্যের রাষ্ট্রচিন্তায় এক বিশেষ স্থান দখল করে আছে খিলাফত তথা ইসলামি সরকার ও প্রশাসন ব্যবস্থা।
৫। মৌলিক ধারণায় ইসলামের প্রাধান্যঃ প্রাচ্যের রাষ্ট্রচিন্তার মৌলিক ধারণা যেমন- রাষ্ট্র, সরকার, সামজিক ন্যায় বিচার, মৌলিক মানবাধিকার, স্বাধীনতা, সাম্য, সন্ত্রাসবাদ, মৌলবাদ, সার্বভৌমত্ব প্রভৃতিতে ইসলামের প্রাধান্য বিদ্যমান।
৬। ইসলামি ধর্মতত্ত্বের সাথে গ্রিকদর্শনের সমন্বয়সাধনঃ প্রাচ্যের রাষ্ট্রচিন্তার আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো ইসলামি ধর্মতত্ত্বের সাথে গ্রিক সাহিত্য ও দর্শনের সমন্বয় সাধনের প্রচেষ্টা। আল-ফারাবী, ইমাম গাজ্জালী, ইবনে রুশদ্, ইবনে সিনা প্রমুখ মুসলিম চিন্তাবিদ এই প্রচেষ্টায় ভূমিকা রেখেছেন।
৭। রক্ষণশীলতাঃ প্রাচ্যের রাষ্ট্রচিন্তায় রক্ষণশীলতার বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। যেমন- কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র, কনফুসিয়াসের দর্শন এমনকি গান্ধীর দর্শনেও রক্ষণশীলতার আভাস পাওয়া যায়। তবে মাওবাদ, এম এন রায়ের দর্শনে বৈপ্লবিক চিন্তার আভাস পাওয়া যায়।
 

প্রাচ্যের রাষ্ট্রচিন্তার প্রকৃতি ও পরিধিঃ

১। ইসলাম সম্পর্কে আলোচনাঃ ইসলাম কি, এর উৎসমূল, বিকাশধারা, বৈশিষ্ট্য, ইসলাম সম্পর্কে পাশ্চাত্যের ধারণা, ইসলাম কিভাবে মানুষের ব্যক্তিগত, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জীবনের নিশ্চয়তা বিধান করে ইত্যাদি বিষয় প্রাচ্যের রাষ্ট্রচিন্তার কেন্দ্রবিন্দু।
২।ইসলামি রাজনৈতিক ব্যবস্থাঃ ইসলামি রাজনৈতিক ব্যবস্থা কি, ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মূলনীতি, ইসলামি রাষ্ট্র ব্যবস্থার সাথে পাশ্চাত্যের আধুনিক গণতান্ত্রিক, পুঁজিবাদী ও সমাজতাত্ত্বিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার তুলনা, ইসলামি আইনসভা, রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব-কর্তব্য, নির্বাচন পদ্ধতি, নাগরিকদের অধিকার, দায়িত্ব-কর্তব্য, মুসলিম রাষ্ট্রে অমুসলিমদের অধিকার ও কর্তব্য প্রভৃতি বিষয় প্রাচ্যের রাষ্ট্রচিন্তার আলোচনার ক্ষেত্র।
৩।ইসলামি অর্থব্যবস্থাঃ ইসলামি অর্থব্যবস্থার পরিচয়, এর বৈশিষ্ট্য, ইসলামি রাষ্ট্রে আয়ের উৎস ও ব্যয়ের খাত, ব্যবসা-বাণিজ্য, যাকাত, ব্যাংকিং ব্যবস্থা, সুদ-মুনাফা এবং পাশ্চাত্যের প্রচলিত অর্থব্যবস্থার সাথে ইসলামি অর্থব্যবস্থার তুলনামূলক আলোচনা করে প্রাচ্যের রাষ্ট্রচিন্তা।
৪। ইসলামি রাষ্ট্রচিন্তারর মৌল ধারণাঃ
৫। নৈতিক বিধানাবলি নিয়ে আলোচনাঃ প্রাচ্যের রাষ্ট্রচিন্তায় নৈতিক বিধানের উপর গুরুত্বারোপ করে। কেননা উন্নত সমাজের জন্য উন্নত মানব মনের দরকার। UNESCO তার সংবিধানে বলেছে, এ পৃথিবী থেকে যুদ্ধের সম্ভাবনা দূর করতে হলে মানব মনকে উন্নত করতে হবে।
৬। ইসলামি আইন সম্পর্কে আলোকপাতঃ
৭। যুদ্ধ, শান্তি ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গিঃ সারা বিশ্ব থেকে অন্যায়-অসংগত যুদ্ধ থেকে মুক্ত রাখার জন্য ইসলামের দিকনির্দেশনা, বিশ্বকে বিশ্ব মানবের জন্য সুখী, সমৃদ্ধশালী, শান্তিময় আবাসভূমি হিসাবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও ইসলামের সুস্পষ্ট নীতি ও দিকনির্দেশনা রয়েছে। এসকল বিষয় নিয়ে প্রাচ্যের রাষ্ট্রচিন্তায় আলোচনা রয়েছে।
৮। আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাঃ ইসলামের দৃষ্টিতে আন্তর্জাতিকতা, বিশ্বভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা, বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় মুসলিম উম্মাহের ভূমিকা, রাষ্ট্রে-রাষ্ট্রে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠায় ইসলাম ইত্যাদি বিষয় নিয়েও প্রাচ্যের রাষ্ট্রচিন্তা আলোকপাত করে থাকে।
 
আন্ত-পরিচিতি ও আত্নশুদ্ধি থেকে শুরু করে পারলৌকিক মুক্তি তথা ব্যক্তিগত, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সকল বিষয়ই প্রাচ্যের রাষ্ট্রচিন্তায় অন্তর্ভুক্ত।
 
 
   (মোঃ হেলাল উদ্দিন, ৩৩ তম বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা)

Wednesday, March 31, 2021

নারী উন্নয়নে জাতিসংঘের ভূমিকা

 পৃথিবীতে নারীর অবস্থান প্রায় পুরুষের সমান। কাউকে বাদ দিয়ে কারো অস্তিত্ব কল্পনা প্রায় অসম্ভব। কিন্তু নারীর এই অবদান সত্ত্বেও তারা অবহেলিত, বঞ্চিত ও নির্যাতিত। তাদের এই বঞ্চনার হাত থেকে রক্ষার জন্য জাতিসংঘ নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার পর থেকে নারীর উন্নয়নে যে সকল পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, তাহলো-

১। নারীর মর্যাদা সংক্রান্ত কমিশন গঠনঃ জাতিসংঘ ১৯৪৮ সালে নারীর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক মর্যাদা সম্পর্কিত কমিশন গঠন করে।

২। নারী পাচারের বিরুদ্ধে উদ্যোগঃ জাতিসংঘ ১৯৪৯ সালে মানুষ পাচার দমন ও পতিতাবৃত্তির মাধ্যমে শোষণের অবসানের জন্য সনদ অনুমোদন করে।

৩। সমান মজুরি নির্ধারণঃ জাতিসংঘ ১৯৫১ সালে নারী-পুরুষের সমান কাজের জন্য সমান মজুরি নির্ধারণের জন্য আই এল ও সনদ স্বাক্ষর করে। এর ফলে বিশ্বে নারী-পুরুষ সমান মজুরি লাভের অধিকারি হয়।

৪। রাজনৈতিক ও ভোটাধিকারঃ জাতিসংঘ ১৯৫২ সালে নারীর রাজনৈতিক অধিকার অনুমোদন করে। এ সনদে প্রথমবারের মতো নারীর ভোটাধিকারের স্বীকৃতি লাভ করে।

৫। জাতীয়তা সম্পর্কিত সনদঃ জাতিসংঘে ১৯৫৭ সালে নারীর জাতীয়তা সম্পর্কিত সনদ গৃহিত হয়। এ সনদে স্বামীর কার্যক্রম নির্বিশেষে নারীর জাতীয়তা সংরক্ষণ বা পরিবর্তন করার অধিকার প্রদান করা হয়।

৬। বিবাহ সম্পর্কিত অধিকারঃ জাতিসংঘ ১৯৬২ সালে বিবাহের ক্ষেত্রে সম্মতি, বিয়ের নূন্যতম বয়স ও বিয়ে রেজিস্ট্রিকরণ সম্পর্কিত সনদ অনুমোদন করে।

৭। ইউনেস্ক সনদ গৃহিতঃ বিশ্বব্যাপী বালিকা ও মহিলাদের শিক্ষা ক্ষেত্রে সমানাধিকার ও সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টির লক্ষ্যে ১৯৬২ সালে জাতিসংঘ সনদ গৃহিত হয়।

৮। নারীর বিরুদ্ধে সকল প্রকার বৈষম্য দূরীকরণ ঘোষণাঃ জাতিসংঘ ১৯৬৭ সালে নারীর বিরুদ্ধে সকল প্রকার বৈষম্য দূরীকরণের পদক্ষেপ গ্রহণ করে এবং ১৯৭৯ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ কর্তৃক নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ সনদ (সিডও) গৃহিত হয়।

৯। বিশ্ব নারী সম্মেলনঃ জাতিসংঘ ১৯৭৫ সালে বিশ্ব নারী সম্মেলন আয়োজনের মধ্য দিয়ে নারী উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে। আজ পর্যন্ত বিশ্বে ৪টি বিশ্ব নারী সম্মেলন এবং অনেকগুলো কনভেনশন অনুষ্ঠিত হয়েছে।

১০। নারী দশক ঘোষণাঃ জাতিসংঘ ১৯৭৫ সালকে আন্তর্জাতিক নারী বর্ষ এবং ১৯৭৬-৮৫ সময়কালকে নারী দশক হিসাবে ঘোষণা করে। এর মাধ্যমে নারীদের অগ্রগতি পর্যালোচনার কথা জোরালোভাবে চিন্তা করা হয়।

এভাবেই জাতিসংঘ তার প্রতিষ্ঠার পর থেকে নারীর উন্নয়নে নানামুখী পদক্ষেপ নিয়ে আসছে, যা এখনো চলমান আছে। এর ফলেই বর্তমান বিশ্বে নারীর অবস্থান অনেক উন্নত হয়েছে।

  (মোঃ হেলাল উদ্দিন, ৩৩ তম বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা)