Showing posts with label স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস. Show all posts
Showing posts with label স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস. Show all posts

Friday, July 12, 2024

বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক চিন্তাধারা -- রওনক জাহান

আমাদের প্রজন্ম, যারা বাংলাদেশকে স্বাধীনভাবে আবির্ভূত হতে দেখেছে এবং তার পেছনে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের যে অসামান্য অবদান তা প্রত্যক্ষ করেছে, তাদের পক্ষে বঙ্গবন্ধুর কর্মকাণ্ড এবং রাজনৈতিক চিন্তাধারার মূল্যায়ন সহজ ভাষায় ব্যক্ত করা অত্যন্ত কঠিন। আমি নিজে যখনই বঙ্গবন্ধুর কথা ভাবি, তখনই আমার প্রথমে মনে পড়ে ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের সেই উত্তাল দিনগুলোর কথা। আমি তখন ঢাকাতেই ছিলাম। বিদেশে উচ্চশিক্ষা শেষ করে ১৯৭০-এর ডিসেম্বর মাসে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষকতা শুরু করেছি। ১৯৭০ সালের ডিসেম্বর মাসেই সেই ঐতিহাসিক নির্বাচন হয়, যাতে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ অভূতপূর্ব বিজয় লাভ করে। আওয়ামী লীগ জাতীয় পরিষদের ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭ আসনে এবং প্রাদেশিক পরিষদের ৩০০ আসনের মধ্যে ২৮৮টিতে জয়লাভ করে। ছয় দফা এবং এগারো দফার ভিত্তিতে নির্বাচনী ইশতেহার রচিত হয় এবং নির্বাচনী প্রচারণা চালানো হয়। সমগ্র জনসাধারণকে অভূতপূর্বভাবে ঐক্যবদ্ধ করা হয় বাঙালির অধিকার আদায়ের সংগ্রামে।

১৯৭০ সালের নির্বাচনের এই বিশাল সাফল্যের পর থেকেই আমরা বিপুল আশা-উদ্দীপনার মধ্যে ছিলাম। বাংলাদেশ যে সৃষ্টি হতে যাচ্ছে, তা নিয়ে আমাদের মনে আর কোনো সন্দেহ ছিল না। তখন একমাত্র প্রশ্ন ছিল আমরা কি শান্তিপূর্ণভাবে আলোচনার মাধ্যমে এই স্বাধীন দেশ সৃষ্টি করতে পারব, নাকি আমাদের একটা বিরাট রক্তাক্ত সংঘাতের পথে যেতে হবে।

আমার মনে পড়ে, ১ মার্চে যখন জেনারেল ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের বৈঠক স্থগিত করলেন এবং তার পরে যখন বঙ্গবন্ধু ৩ মার্চ থেকে অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিলেন, বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষই তখন স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই আন্দোলনে যোগ দিয়েছিল। প্রশাসন, বিচার বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যবর্গ, ব্যবসায়ী সম্প্রদায় সবাই পাকিস্তান সরকারের পক্ষ ত্যাগ করে বঙ্গবন্ধুর প্রতি তাঁদের আনুগত্য প্রকাশ করলেন। পৃথিবীর আর কোনো দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে সংশ্লিষ্ট দেশটির জাতীয় স্বাধীনতার স্বীকৃতি না পাওয়া পর্যন্ত প্রশাসনকে এভাবে তাদের আনুগত্য পরিবর্তন করতে দেখা যায়নি। এর একটি প্রধান কারণ হলো বঙ্গবন্ধু আহূত অসহযোগ আন্দোলন এমনই ব্যাপক ও সর্বজনগ্রাহ্য ব্যাপার হয়ে পড়েছিল যে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সচল রাখার প্রয়োজনে অসহযোগ আন্দোলন চলাকালেই বঙ্গবন্ধুকে সারা দেশের শাসনভার পরিচালনার দায়িত্ব নিতে হয়।

মার্চ মাসের ২ তারিখের পর থেকেই প্রতিদিন আমি ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াতাম। দেখতাম রাস্তায় হাজার হাজার লোক, কিন্তু সবাই ছিল শান্তিপূর্ণ। সবারই মনে এবং মুখে একই কথা, যা ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু রেসকোর্স ময়দানের (আজকের সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) দেওয়া বক্তৃতায় বললেন। তিনি বললেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। আমি নিজে সেদিন রেসকোর্স ময়দানে উপস্থিত ছিলাম, দেখেছিলাম লাখো মানুষের ঢল, সবার মনে একই আশা এবং উদ্দীপনা।

আমার মনে আছে, আমি তখন একটি কথা খুবই ভাবতাম। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে আমার কাছে ফরাসি দার্শনিক রুশোর ‘সামাজিক চুক্তি’ (social contract) বইটি খুব প্রিয় ছিল, বিশেষ করে রুশোর একটি তাত্ত্বিক ধারণা ‘‘general will” যখন পড়তাম এবং পরবর্তীকালে ক্লাসে আমি এটা পড়াতাম, তখন ভাবতাম general will কেমন হতে পারে। ১৯৭১ সালের ২ মার্চের পর যখন আমি অসহযোগ আন্দোলনে হাজার হাজার জনতার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ দেখলাম এবং সবার মুখে মুখে শুধু স্বাধীনতার কথা শুনতাম তখন বুঝতে পারলাম রুশোর general will কথাটির অর্থ কী। আমি স্পষ্টই দেখতে পেলাম আমাদের স্বাধীনতার পক্ষে general will সৃষ্টি হয়েছে। সারা দেশের মানুষ এখন ঐক্যবদ্ধ স্বাধীনতার দাবির ডাকে। এই general will, এই ঐক্যবদ্ধ জনমত গঠিত হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর বহু বছরের সাধনা, ত্যাগ এবং কর্মকাণ্ডের ফলে।

আমি নিজেকে খুবই ভাগ্যবান মনে করি যে আমি নিজের চোখে ১৯৭১ সালের মার্চ মাসকে এবং বঙ্গবন্ধুর সেদিনের ভূমিকাকে প্রত্যক্ষ করেছি। খুব কম লোকেরই ভাগ্য হয় ইতিহাস সৃষ্টি হতে দেখা। আমি ইতিহাস সৃষ্টি হতে দেখেছি। স্বাধিকার আন্দোলনকে স্বাধীনতার আন্দোলনে রূপান্তরিত হতে দেখেছি। এসব ঐতিহাসিক ঘটনার মূল নায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে অসম্ভব সম্ভব করতে দেখেছি।

আমি আগেই বলেছি, সে সময়ের আমাদের অনুভূতি যাঁরা তখন উপস্থিত ছিলেন না, যাঁরা চোখে দেখেননি এবং সেই অনুভূতি যাঁদের হৃদয়ে তখন স্পর্শ করেনি, তাঁদের ঠিক ভাষায় বলে বোঝানো কষ্টকর। পৃথিবীর অনেক দেশেই অনেক সময়ে অনেক নেতা নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন। দেশ পরিচালনা করতে পারেন। কিন্তু খুব অল্পসংখ্যক নেতাই ইতিহাস রচনা করতে পেরেছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন তেমনই একজন অনন্য কালজয়ী ইতিহাসের মহানায়ক।

যদিও আমাদের স্বাধীনতা অর্জনের পর ৪৮ বছর এবং বঙ্গবন্ধু হত্যার পর ৪৩ বছর অতিবাহিত হয়েছে, তবু এখন পর্যন্ত সর্বাঙ্গীণভাবে গবেষণালব্ধ বঙ্গবন্ধুর কোনো আত্মজীবনী লেখা হয়নি। আমার মনে হয় বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে কিছু জানতে হলে, বিশেষ করে তাঁর রাজনৈতিক চিন্তাধারা এবং কর্মকাণ্ডের উৎস খুঁজতে হলে তাঁর নিজের লেখা ডায়েরি যার ওপর ভিত্তি করে দুটি বই প্রকাশিত হয়েছে, ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ (২০১২) এবং ‘কারাগারের রোজনামচা’ (২০১৭) তাই হলো সবচেয়ে মূল্যবান সূত্র। অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে তিনি তাঁর ছোটবেলা, যৌবনের জীবনদর্শন এবং রাজনীতি সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন। অসমাপ্ত হলেও এই বইটি থেকে তাঁর রাজনৈতিক ধ্যানধারণা খুবই পরিষ্কারভাবে বোঝা যায়। অন্য বইটি, ‘কারাগারের রোজনামচা’ও তাঁর ডায়েরিভিত্তিক। এই বইটিতে ১৯৬৬ সালের ঐতিহাসিক ছয় দফা আন্দোলনের সময়ের তাঁর কারাগারের দিনগুলোর বিশদ বিবরণ আছে। এখানেও তাঁর রাজনৈতিক চিন্তাধারা সুস্পষ্ট। বিশেষ করে স্বৈরাচারী রাষ্ট্র জনগণের আন্দোলনকে দমন করার জন্য কত রকমের নিপীড়ন চালাতে পারে, তার বর্ণনা তিনি দিয়েছেন। এ ছাড়া গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় ব্যক্তিস্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কত প্রয়োজনীয়, তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা বইটির বিভিন্ন স্থানে আমরা পাই।

আমার আজকের এই প্রবন্ধ প্রধানত এই দুটি বই এবং বঙ্গবন্ধুর অন্যান্য ভাষণের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করেছি, যাতে যতটা সম্ভব আমরা বঙ্গবন্ধুর নিজের ভাষা শুনতে পাই। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক চিন্তাধারা বুঝতে হলে প্রথমেই আমাদের মনে রাখা দরকার বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের বেশির ভাগ অংশই কেটেছে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বাইরে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর খুবই অল্প সময়ের জন্য—সাড়ে তিন বছর—তিনি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ছিলেন। জীবনের বেশির ভাগ সময়ই তিনি ব্যয় করেছেন ঔপনিবেশিক ও অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে। প্রথমে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক এবং তারপর পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে তিনি বহুদিন সংগ্রাম করেছেন বাংলার মানুষের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার আদায়ের জন্য।

রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন একজন সাধারণ কর্মী হিসেবে কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যে বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠেন কোটি কোটি মানুষের অবিসংবাদিত নেতা। একদিকে তাঁর ছিল অসাধারণ সাংগঠনিক ক্ষমতা, অন্যদিকে অতুলনীয় বাগ্মিতা। সাধারণত একই ব্যক্তির মধ্যে আমরা এই দুই গুণের সমাহার দেখি না। তিনি নিজেই লিখেছেন যে তাত্ত্বিক আলোচনার চেয়ে দল সংঘটনের কাজে তাঁর বেশি উৎসাহ ছিল। তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে তিনি লিখেছেন যে যখন তিনি কলকাতায় ছাত্র ছিলেন, তখন আবুল হাশিম সাহেব, মওলানা আজাদ সোবহানী, যিনি একজন দার্শনিক ছিলেন, তাঁকে আমন্ত্রণ করে এনেছিলেন ছাত্রদের ক্লাস নেওয়ার জন্য। বঙ্গবন্ধু লিখেছেন:
‘আমার সহকর্মীরা অধিক রাত পর্যন্ত তাঁর আলোচনা শুনতেন। আমার পক্ষে ধৈর্য ধরে বসে থাকা কষ্টকর। কিছু সময় যোগদান করেই ভাগতাম। আমি আমার বন্ধুদের বলতাম, ‘‘তোমরা পণ্ডিত হও, আমার অনেক কাজ। আগে পাকিস্তান আনতে দাও, তারপর বসে বসে আলোচনা করা যাবে।” ... কাজ তো থাকতই ছাত্রদের সাথে, দল তো ঠিক রাখতে হবে।”’১

তবে তাত্ত্বিক না হলেও বঙ্গবন্ধুর সুনির্দিষ্ট কিছু আদর্শ ছিল, মূল্যবোধ ছিল, লক্ষ্য ছিল এবং সেই লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য তিনি একনিষ্ঠভাবে এবং নিরলস কাজ করেছেন। তাঁর কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়েই আমরা তাঁর রাজনৈতিক চিন্তাধারা উপলব্ধি করতে পারি। মাত্র তিনটি বাক্যেই বঙ্গবন্ধু তাঁর আত্মপরিচিতি ও মূল্যবোধ অত্যন্ত পরিষ্কার করেছেন। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র প্রথমেই বঙ্গবন্ধুর একটি উদ্ধৃতি রয়েছে, যা তিনি ১৯৭৩ সালের মে মাসের ৩ তারিখে লিখেছেন। তিনি লিখেছেন:
‘একজন মানুষ হিসাবে সমগ্র মানবজাতি নিয়েই আমি ভাবি। একজন বাঙালি হিসাবে যা কিছু বাঙালিদের সঙ্গে সম্পর্কিত তাই আমাকে গভীরভাবে ভাবায়। এই নিরন্তর সম্প্রীতির উৎস ভালোবাসা, অক্ষয় ভালোবাসা যে ভালোবাসা আমার রাজনীতি এবং অস্তিত্বকে অর্থবহ করে তোলে’।২

এই উদ্ধৃতি থেকে এটা স্পষ্ট যে বঙ্গবন্ধু নিজেকে একাধারে মানুষ এবং তার সঙ্গে বাঙালি হিসেবে আত্মপরিচয় স্বীকৃতি দিচ্ছেন। তাঁর কর্মপ্রেরণার উৎস হিসেবে চিহ্নিত করছেন বাঙালি এবং মানবসম্প্রদায়ের জন্য তাঁর ভালোবাসা। এই আত্মপরিচয় থেকেই আমরা উপলব্ধি করতে পারি তাঁর রাজনৈতিক চিন্তাধারার চারটি বৈশিষ্ট্য: বাঙালি জাতিসত্তা, জনসম্প্রীতি, অসাম্প্রদায়িকতা এবং সমাজতন্ত্র।

তাঁর রাজনৈতিক চিন্তাধারার অবশ্যই আরও অনেক বৈশিষ্ট্য ছিল। কিন্তু আজকের এই প্রবন্ধের আলোচনা আমি এই চারটি বৈশিষ্ট্যেই সীমাবদ্ধ রাখব।

বাঙালি জাতিসত্তা: স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও মুক্তি
রাজনৈতিক জীবনের প্রথম থেকেই বঙ্গবন্ধুর বাঙালি আত্মপরিচয়, স্বকীয়তা এবং তা নিয়ে গর্ববোধের পরিচয় পাই। তিনি পাকিস্তান আন্দোলনের সঙ্গে সংযুক্ত ছিলেন, কিন্তু আত্মজীবনীতে তিনি লিখেছেন সে সময় জনসভায় পাকিস্তান আন্দোলনকে তিনি উত্থাপিত করতেন লাহোর প্রস্তাবের ধারণায়, দুটি মুসলমান প্রধান সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে:
‘পাকিস্তান দুইটা হবে, লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে। একটা বাংলা ও আসাম নিয়ে পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র; আর একটা পশ্চিম পাকিস্তান স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হবে—পাঞ্জাব, বেলুচিস্তান, সীমান্ত ও সিন্দু প্রদেশ নিয়ে।’৩

বাঙালি জাতিসত্তা সম্পর্কে সচেতনতার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল দরিদ্র, নির্যাতিত ও বঞ্চিত মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। তিনি পাকিস্তান আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন এই ভেবে যে এই নতুন রাষ্ট্রে দরিদ্র মুসলমান কৃষক জমিদার শ্রেণির নির্যাতন থেকে মুক্তি পাবে। তিনি সব সময় স্বাধীনতার আন্দোলনকে শুধু ঔপনিবেশিক শাসন থেকে স্বাধীন হওয়ার সংগ্রাম হিসেবে দেখেননি, তিনি এটাকে দেখেছেন নির্যাতিত দরিদ্র মানুষের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মুক্তির সংগ্রাম হিসেবে। তাঁর জাতীয়তাবাদের ধ্যানধারণার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও সুষম সমাজব্যবস্থার চিন্তা। বাঙালির জাতিসত্তার স্বীকৃতির আন্দোলনকে তিনি সব সময় দেখেছেন একটি গণতান্ত্রিক আন্দোলন হিসেবে, শোষিত–বঞ্চিত মানুষের মুক্তির আন্দোলন হিসেবে। তাই ৭ মার্চ ১৯৭১-এ তিনি একই সঙ্গে ডাক দেন স্বাধীনতা ও মুক্তির সংগ্রামের জন্য।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আগে কলকাতায় ছাত্র থাকাকালে যখন তিনি মুসলিম লীগে যোগ দেন, তখন বঙ্গবন্ধু ছিলেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং আবুল হাশিমের দলে, যাঁরা প্রগতিশীল বলে পরিচিত ছিলেন। আত্মজীবনীতে বঙ্গবন্ধু লিখছেন:
‘শহীদ সাহেবের নেতৃত্বে আমরা বাংলার মধ্যবিত্ত শ্রেণির লোকেরা মুসলিম লীগকে জনগণের লীগে পরিণত করতে চাই। মুসলিম লীগ তখন পর্যন্ত জনগণের প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয় নাই। জমিদার, জোতদার ও খান বাহাদুর নবাবদের প্রতিষ্ঠান ছিল।’ ৪

মুসলিম লীগের এই পুনর্গঠনের কাজে বঙ্গবন্ধু নিবেদিতপ্রাণ হয়ে কাজ করেন। আত্মজীবনীতে তিনি লিখছেন:
‘মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠান পূর্বে ছিল খান সাহেব, খান বাহাদুর ও ব্রিটিশ খেতাবধারীদের হাতে, আর এদের সাথে ছিল জমিদার, জোতদার শ্রেণির লোকেরা। এদের দ্বারা কোনো দিন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা হতো না। শহীদ সাহেব ও হাশিম সাহেব যদি বাংলার যুবক ও ছাত্রদের মধ্যে মুসলিম লীগকে জনপ্রিয় না করতে পারতেন এবং বুদ্ধিজীবী শ্রেণিতে টেনে আনতে না পারতেন, তা হলে কোনো দিনও পাকিস্তান আন্দোলন বাংলার কৃষকদের মধ্যে জনপ্রিয়তা লাভ করতে পারত না।’৫
লাহোর প্রস্তাব যখন ১৯৪৬ সালের মুসলিম লীগ কনভেনশনে পরিবর্তন করা হলো এবং দুটি পাকিস্তান রাষ্ট্রের বদলে শুধু একটি রাষ্ট্রের কথা প্রস্তাবিত হলো, সেই পরিবর্তন সম্বন্ধে বঙ্গবন্ধু আত্মজীবনীতে লিখছেন যে তখন তাদের বলা হয়েছিল যে কাউন্সিলের প্রস্তাব পরিবর্তন করা হয় নাই, এটা কনভেনশনের প্রস্তাব। এরপর ১৯৪৭ সালে সোহরাওয়ার্দী এবং শরৎবসুর উদ্যোগে বাংলাকে ভাগ না করে যুক্ত বাংলার উদ্যোগ নেওয়া হয়, তখন সেই উদ্যোগের সঙ্গেও বঙ্গবন্ধু যুক্ত ছিলেন। এক পাকিস্তান সৃষ্টি নিয়ে তাঁর মনে যে প্রশ্ন এবং পরবর্তীতে যুক্ত বাংলার উদ্যোগের সঙ্গে তাঁর যুক্ত হওয়ার প্রচেষ্টা থেকে বোঝা যায় যে বঙ্গবন্ধু ছাত্র অবস্থা থেকেই বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর বঙ্গবন্ধু ঢাকায় ফিরে প্রগতিশীল সংগঠন ও বাঙালির বিভিন্ন অধিকার আদায়ের আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৪৮ সালে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে আন্দোলনে অংশগ্রহণের জন্য তিনি কারাবরণ করেন। তবে সে সময় তিনি যে শুধু ভাষার অধিকার নিয়েই সংগ্রাম করেছেন তা নয়, গরিব এবং নির্যাতিত মানুষের পাশে থেকে অন্যায়–অবিচারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রতিবাদী আন্দোলনে যোগ দেন, যেমন কর্ডন প্রথার বিরুদ্ধে, জিন্নাহ ফান্ডের বিরুদ্ধে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিম্ন বেতনভোগী কর্মচারীদের সমর্থনে।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার কয়েক বছরের মধ্যেই তিনি গণতন্ত্রের স্বার্থে একটি শক্তিশালী বিরোধী দল গঠনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন। আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার সপক্ষে যে যুক্তি তাঁর আত্মজীবনীতে তিনি লিখেছেন তা হলো:
‘আর মুসলিম লীগের পিছনে ঘুরে লাভ নেই, এ প্রতিষ্ঠান এখন গণবিচ্ছিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে...বিরোধী দল সৃষ্টি করতে না পারলে এ দেশে একনায়কত্ব চলবে।’৬

এরপর ১৯৪৯ সালে আওয়ামী লীগের (প্রথমে আওয়ামী মুসলিম লীগ) প্রতিষ্ঠালগ্নে তিনি আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন যদিও তিনি তখন কারাগারে ছিলেন। ১৯৫৩ সালে তিনি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হন। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনী জোটের একজন সদস্য হিসেবে বঙ্গবন্ধু প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা নির্বাচনী ইশতেহারের অন্যতম দফা ছিল পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসন এবং বাংলা ভাষার রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেওয়া। ১৯৫৫ সালের মে মাসে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। গণপরিষদের এক বক্তৃতায় তিনি বাঙালির স্বকীয়তা এবং বাঙালিদের বিভিন্ন দাবিদাওয়া জোরালোভাবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন:
‘ওরা পূর্ব বাংলা নামের পরিবর্তে পূর্ব পাকিস্তান নাম রাখতে চায়। আমরা বহুবার দাবি জানিয়েছি আপনারা এটাকে বাংলা নামে ডাকেন। বাংলা শব্দটার একটা নিজস্ব ইতিহাস আছে, আছে এর একটা ঐতিহ্য।...বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে কি হবে? যুক্ত নির্বাচনী এলাকা গঠনের প্রশ্নটারই কি সমাধান? আমাদের স্বায়ত্তশাসন সম্পর্কেই বা কি ভাবছেন?...আমার ঐ অংশের [পশ্চিম পাকিস্তান] বন্ধুদের কাছে আবেদন জানাব যে আমাদের জনগণের রেফারেন্ডাম অথবা গণভোটের মাধ্যমে দেওয়া রায়কে মেনে নেন।’৭

অবশ্য বাংলার ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতি রক্ষার পাশাপাশি তাঁর বৃহত্তর সংগ্রাম ছিল বাঙালি জাতিকে বিভিন্ন শোষণের হাত থেকে মুক্ত করা এবং তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। আত্মজীবনীতে তিনি লিখেছেন:
‘পূর্ব বাংলার সম্পদ কেড়ে নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানকে কত তাড়াতাড়ি গড়া যায় একদল পশ্চিমা নেতা ও বড় বড় সরকারি কর্মচারীরা গোপনে সে কাজ করে চলেছিল।...শ্রমিক কৃষক মেহনতি মানুষ যে আশা নিয়ে স্বাধীনতা আন্দোলন, যে পাকিস্তান আন্দোলনে শরিক হয়ে অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছে তাদের অর্থনৈতিক মুক্তির দিকে কোনো নজর দেওয়াই তারা দরকার মনে করল না।’ ৮

১৯৫৫ সালে কাউন্সিল সেশনে আওয়ামী লীগের নাম থেকে মুসলিম শব্দটি অপসারণ করা হয় এবং বঙ্গবন্ধু আবারও দলের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৬৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে লাহোরে বঙ্গবন্ধু তাঁর ঐতিহাসিক ছয় দফা দাবি উত্থাপন করেন, যার মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে অত্যন্ত সীমিত ক্ষমতা ন্যস্ত করার প্রস্তাব করা হয়। সেই বছর মার্চ মাসে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন এবং ছয় দফার পক্ষে জনমত সৃষ্টির লক্ষ্যে সারা বাংলায় গণসংযোগ সফর শুরু করেন। ১৯৬৬ সালের পর থেকে বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতীয়তাবাদের অ্যাজেন্ডাকে একমাত্র দাবি হিসেবে উপস্থাপন করেন। ছয় দফা আন্দোলন শুরু করার পর বঙ্গবন্ধু পুনরায় কারাবরণ করেন এবং কারাগারে থাকা অবস্থায় পাকিস্তান সরকার তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা করে (আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা)। ১৯৬৯ সালে প্রচণ্ড ছাত্র আন্দোলনের মুখে আইয়ুব সরকারের পতন হয় এবং বঙ্গবন্ধু কারামুক্ত হন। কারামুক্তির পর ছাত্রসমাজ তাঁকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনী প্রচারণায় বঙ্গবন্ধু ‘বাংলাদেশ’ ও ‘জয় বাংলা’ এই দুটি স্লোগান ব্যবহার করতে আরম্ভ করেন। ১৯৬৬ থেকে ১৯৭০—মাত্র চার বছরের মধ্যে বঙ্গবন্ধু সমগ্র জাতিকে স্বাধীনতার পক্ষে ঐকমত্যে আনতে পারেন। এত অল্প সময়ের মধ্যে পৃথিবীতে অন্য কোনো স্থানে জনগণকে এমন সংঘবদ্ধ করা সম্ভব হয়েছে বলে আমার জানা নেই।

বঙ্গবন্ধু সারা জীবন আন্দোলনের রাজনীতি করেছেন ও দল গঠন করেছেন, মুক্তির কথা বলেছেন। তিনি লাখ লাখ জনতাকে সংঘবদ্ধ করতেন আন্দোলনে, কিন্তু তাঁর লক্ষ্য ছিল অহিংস এবং শান্তিপূর্ণ আন্দোলন, যাতে গণতান্ত্রিক পন্থার মধ্য দিয়ে জনমত সৃষ্টি করে অধিকার আদায় করা যায় এবং অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পরিবর্তন আনা যায়।

‘কারাগারের রোজনামচা’য় বিভিন্ন জায়গায় তিনি অগণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার কুফল সম্পর্কে বিস্তারিত লিখেছেন। গণতান্ত্রিক উপায়ে বিরোধী রাজনীতি না করতে পারলে যে দেশ সন্ত্রাসী রাজনীতির দিকে অগ্রসর হতে পারে, তার আশঙ্কাও তিনি প্রকাশ করেছেন। ছয় দফা আন্দোলনের সময় পাকিস্তানি সরকার যখন আওয়ামী লীগ কর্মীদের নির্বিচারে জেল–জুলুমের সম্মুখীন করে এবং গণমাধ্যমে খবর প্রচারের বিরুদ্ধে নির্দেশনা দেয়, তখন গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর দুর্ভাবনার কথা তিনি ব্যক্ত করেছেন। তিনি লিখছেন:
‘খবরের কাগজ এসে গেল। দেখে আমি শিহরিয়া উঠলাম, এ দেশ থেকে গণতান্ত্রিক রাজনীতির পথ চিরদিনের জন্য এরা বন্ধ করে দিতে যাচ্ছে। জাতীয় পরিষদে “সরকারী গোপন তথ্য আইন সংশোধনী বিল” আনা হয়েছে। কেউ সমালোচনামূলক যে কোনো কথা বলুন না কেন মামলা দায়ের হবে। ... বক্তৃতা করার জন্য ১২৪ ধারা ৭(৩)...এবং ডিপি আর রুল দিয়ে আমার বিরুদ্ধে মোটমাট পাঁচটি মামলা আর অন্যান্য আরও তিনটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।...আমার ভয় হচ্ছে এরা পাকিস্তানকে সন্ত্রাসবাদী রাজনীতির দিকে নিয়ে যেতেছে। আমরা এ পথে বিশ্বাস করি না।...আমরা যারা গণতন্ত্রের পথে দেশের মঙ্গল করতে চাই, আমাদের পথ বন্ধ হতে চলেছে।’৯

১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৭০—এই ২৩ বছরে তাঁর নেতৃত্বে বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ক্রমাগত বেগবান হয়েছে, কিন্তু তিনি সব সময় গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্যেই ছিলেন। যখনই পাকিস্তানি শাসকেরা নির্বাচনের সুযোগ দিয়েছে, তিনি তাতে অংশগ্রহণ করেছেন, যদিও বারবার শাসকশ্রেণি নির্বাচনের ফলাফলকে বানচাল করার চেষ্টা করেছে। তাঁর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু অত্যন্ত সুন্দরভাবে বাঙালি জাতীয়তাবাদের আন্দোলনকে একই সঙ্গে গণতান্ত্রিক ও মুক্তির আন্দোলন হিসেবে জনগণের সামনে তুলে ধরেছিলেন। তিনি বলেছিলেন:
‘আজ বাংলার মানুষ মুক্তি চায়, বাংলার মানুষ বাঁচতে চায়, বাংলার মানুষ তার অধিকার চায়।... নির্বাচনে বাংলাদেশের মানুষ সম্পূর্ণভাবে আমাকে, আওয়ামী লীগকে ভোট দেন। আমাদের ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি বসবে, আমরা সেখানে শাসনতন্ত্র তৈয়ার করব এবং এই দেশকে আমরা গড়ে তুলব, এ দেশের মানুষ অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তি পাবে।...আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব চাই না। আমরা এ দেশের মানুষের অধিকার চাই।’১০

জনসম্প্রীতি: জনগণের রাজনীতি
অনেক সময়ই যাঁরা বড়মাপের নেতা হন, তাঁরা জনগণের সঙ্গে তেমন সম্পৃক্ত হন না। তাঁরা জনগণকে কোনো মহৎ উদ্দেশ্যে পরিচালনার কথা বলেন। তাঁরা অনেক সময় থেকে যান জনগণের ঊর্ধ্বে। বঙ্গবন্ধু এর ব্যতিক্রম। তিনি সব সময় বাংলাদেশের জনসাধারণের সঙ্গে নিজেকে এক করে দেখতেন। এবং তাই তিনি বারবার একদিকে তাঁর জনগণের জন্য ভালোবাসা এবং অন্যদিকে জনগণের তাঁর জন্য ভালোবাসার কথা উল্লেখ করতেন।

পৃথিবীর বিভিন্ন নেতার ভাষণ আমি যখন পড়ি এবং তাঁদের ভাষণের সঙ্গে যখন আমি বঙ্গবন্ধুর ভাষণের তুলনা করি, তখন আমার কাছে তাঁর একটি অভিব্যক্তি, ‘জনগণের প্রতি ভালোবাসা’, তা অনন্য বলে মনে হয়েছে। বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণের জন্য তাঁর যে ভালোবাসা এবং প্রতিদানে জনগণের যে ভালোবাসা তিনি পেয়েছেন, তার কথা তিনি নানা ভাষণে বারবার ব্যক্ত করেছেন।

বঙ্গবন্ধু জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, অসাম্প্রদায়িকতা, সমাজতন্ত্র—এসব নানা রকমের আদর্শের কথা বলতেন, তবে সাধারণ মানুষের দুঃখ–কষ্টে তাদের পাশে দাঁড়ানো, জনসাধারণ কোন কোন ইস্যুকে প্রাধান্য দিচ্ছে তার দিকেও তাঁর দৃষ্টি ছিল। জনসাধারণের ইস্যু নিয়েই তিনি কথা বলতেন, রাজনীতি করতেন। আমরা দেখতে পাই যখন তিনি পাকিস্তান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত, তখন তিনি দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের জন্য লঙ্গরখানা খুলে কাজ করেছেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর যখন দেশে খাদ্যের অভাব, তখন তিনি সুষম খাদ্যবণ্টনের আন্দোলন, ভুখা মানুষের মিছিলে অংশগ্রহণ করেন। তিনি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রতিরোধে কাজ করেন। দাঙ্গাকবলিত মানুষকে উদ্ধারের জন্য কাজ করেন। তাঁর রাজনৈতিক চিন্তাধারা শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতাকেন্দ্রিক ছিল না, সাধারণ মানুষের সমস্যার সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে তিনি তাঁর রাজনৈতিক চিন্তা গড়ে তুলেছিলেন।

তাঁর লেখায় আমরা দেখতে পাই দেশে বন্যা কিংবা খাদ্যাভাব অথবা দ্রব্যমূল্য বা কর বৃদ্ধি হলে তাঁর কত দুশ্চিন্তা হতো। জনসাধারণের ওপর যেসব ইস্যু প্রভাব ফেলে, তার সবই তার রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডার মধ্যে ছিল। যেমন ‘কারাগারের রোজনামচা’য় তিনি লিখছেন:
‘খবরের কাগজ এসেছে...সিলেটের বন্যায় দেড় লক্ষ লোক গৃহহীন, ১০ জন মারা গেছে। কত যে গবাদিপশু ভাসাইয়া নিয়া গেছে তার কি কোনো সীমা আছে। কি করে এ দেশের লোক বাঁচবে তা ভাবতেও পারি না।...কত কর মানুষ দিবে। কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী শোয়েব সাহেব বলেছেন জনসাধারণ অধিকতর সচ্ছল হইয়াছে তাই কর ধার্য করেছেন। তিনি যাদের মুখপাত্র এবং যাদের স্বার্থে কাজ করেছেন তারা সচ্ছল হয়েছে। তাদের করের বোঝা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। শিল্পপতি ও বড় ব্যবসায়ীরা আনন্দিতই শুধু হন নাই, প্রকাশ্যে মন্ত্রীকে মোবারকবাদ দিয়ে চলেছেন। আর জনগণ এই গণবিরোধী বাজেট যে গরিব মারার বাজেট বলে চিৎকার করতে শুরু করেছে।’১১

যারা সমাজে অনাদৃত ও বঞ্চিত, তাদের প্রতি তার বিশেষ সহমর্মিতা ছিল। ‘কারাগারের রোজনামচা’ বইটিতে তিনি বিভিন্ন কয়েদির জীবনবৃত্তান্ত, দুঃখ–কষ্ট বর্ণনা করেছেন। বিশেষ করে পাগল কয়েদিদের প্রতি তাঁর মমতাবোধ আমরা লক্ষ করি। জেলের কর্মচারীদের সঙ্গেও তাঁর সম্প্রীতি গড়ে ওঠে। তিনি জেলে নিজ হাতে রান্না করেছেন, বাগান করেছেন এবং তার সঙ্গে ডায়েরিও লিখেছেন। আওয়ামী লীগের অগণিত কর্মীর ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখেরও তিনি খবর রাখতেন। তাঁর দুটি বইয়েই আমরা তাঁর বহু সহকর্মীর এবং আওয়ামী লীগের নাম জানা-অজানা বহু কর্মীর ত্যাগ–তিতিক্ষার বর্ণনা পাই।

বঙ্গবন্ধু একদিকে ছিলেন সাধারণ মানুষের লোক, মানুষের কাছ থেকে তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষার কথা তিনি জেনেছেন, শিখেছেন। অন্যদিকে তিনি ছিলেন জনতার নেতা। সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষাকেই তিনি সামনের দিকে, প্রগতির দিকে নিতে চেয়েছেন। সব বিষয়ে তিনি শেষ ভরসা করতেন মানুষের ওপরে। তাই ১৯৭১ সালের ৭ মার্চে তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণে তিনি জনগণকে আহ্বান করেন, বলেন ‘যার যা আছে তাই নিয়ে’ স্বাধীনতাসংগ্রামে যুক্ত হওয়ার জন্য। জাগ্রত জনতার ওপর তাঁর বিশ্বাস ছিল বলেই তিনি সেদিন বলতে পেরেছিলেন, ‘সাত কোটি মানুষকে দাবায়ে রাখতে পারবা না। আমরা যখন মরতে শিখেছি, তখন কেউ আমাদের দাবাতে পারবা না।...রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেব, এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশা আল্লাহ।’১২

অসাম্প্রদায়িকতা: সকল নাগরিকের সম–অধিকার
যদিও বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে সুসংহত করেছিলেন, কিন্তু তিনি কখনো বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে ঘৃণা সৃষ্টি ও সংঘাতের রাজনীতি করেননি। বহু জাতীয়তাবাদী আন্দোলন এক জাতিকে অন্য জাতির বিরুদ্ধে সহিংস আচরণের দিকে ঠেলে দেয়। কিন্তু বঙ্গবন্ধু শোষকদের হাত থেকে বাঙালির মুক্তি কামনার লক্ষ্যে কাজ করেছেন। বাঙালিকে অন্য কোনো জাতির বিরুদ্ধে সহিংস আচরণে প্ররোচনা দেননি। সম্প্রতি আমরা পশ্চিমের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক দেশে উগ্র জাতীয়তাবাদের উত্থান দেখছি, যেখানে বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে তিক্ততা এবং সংখ্যাগুরুদের সংখ্যালঘুদের প্রতি অসহিষ্ণু মনোভাব লক্ষ করছি। বঙ্গবন্ধুর জাতীয়তাবাদের চিন্তা ছিল এর বিপরীত। তিনি সব গোষ্ঠীর সহাবস্থান এবং সব নাগরিকের সমান অধিকারে বিশ্বাস করতেন। তাঁর আত্মজীবনীতে তিনি নিজেকে একাধারে বাঙালি এবং মানুষ হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। তিনি কোনো অমানবিক কাজের সমর্থন কখনো করেননি। তিনি সব সময় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এবং সহিংসতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন।

বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের প্রথম থেকেই আমরা দেখি তাঁকে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে। ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট কলকাতার প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস ও কলকাতার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন তিনি। সোহরাওয়ার্দী তাঁদেরকে এই দিবসটি শান্তিপূর্ণভাবে পালনের নির্দেশ দিয়েছিলেন যেন সোহরাওয়ার্দী সরকারকে কেউই দোষারোপ করতে না পারে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে কলকাতায় এবং পরে নোয়াখালীতে। কলকাতায় তিনি হিন্দু, মুসলমান দুই সম্প্রদায়ের লোককেই দাঙ্গা দেখে উদ্ধার করার চেষ্টা করেন। এরপর যখন মহাত্মা গান্ধীর সাথে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ফিরিয়ে আনার জন্য সোহরাওয়ার্দী যুক্ত হয়েছিলেন, তখন বঙ্গবন্ধুও সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে সেই প্রচেষ্টায় যুক্ত হন।

১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির পর বঙ্গবন্ধু যখন কলকাতা থেকে চলে আসেন, তখন সোহরাওয়ার্দী তাঁকে বলেন তিনি যেন পূর্ববঙ্গে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার জন্য কাজ করেন, যাতে হিন্দুরা পূর্ববঙ্গ ত্যাগ করে পশ্চিমবঙ্গে চলে আসতে বাধ্য না হয়। সোহরাওয়ার্দী তাঁকে বলেছিলেন:
‘চেষ্টা করো যাতে হিন্দুরা চলে না আসে। ওরা এদিকে এলেই গোলমাল করবে, তাতে মুসলমানরা বাধ্য হয়ে পূর্ব বাংলায় ছুটবে। যদি পশ্চিম বাংলা, বিহার ও আসামের মুসলমান একবার পূর্ব বাংলার দিকে রওনা হয়, তবে...এত লোকের জায়গাটা তোমরা কোথায় দিবা...’১৩

ঢাকায় ফিরে এসে গণতান্ত্রিক যুবলীগে যোগ দিয়ে তিনি সাম্প্রদায়িক মিলনকে একমাত্র কর্মসূচি হিসেবে নেওয়ার ওপর জোর দেন। পূর্ব বাংলায় যাতে দাঙ্গা না হয়, তার জন্য তিনি সব সময়ই সতর্ক ছিলেন। দাঙ্গা বলতে যে শুধু হিন্দু-মুসলমানের দাঙ্গা তাই নয়, সব রকমের দাঙ্গারই তিনি বিরোধী ছিলেন। তাঁর আত্মজীবনীতে লাহোরে ১৯৫৩ সালের কাদিয়ানিদের বিরুদ্ধে দাঙ্গার তিনি নিন্দা করেছেন। ধর্ম নিয়ে রাজনীতির বিপক্ষে ছিলেন তিনি। ১৯৫৪ সালে নারায়ণগঞ্জের আদমজী পাটকলে বাঙালি-অবাঙালি দাঙ্গা যাতে বিস্তৃতি লাভ না করে, তার জন্য তিনি কাজ করেন। ১৯৬৪ সালে ভারতে হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গার পর তিনি সারা বাংলাদেশে দাঙ্গা প্রতিরোধ কমিটি গঠন করেন এবং ‘পূর্ব পাকিস্তান রুখিয়া দাঁড়াও’ শিরোনামে প্রচারপত্র প্রকাশ করেন। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ভাষণেও তিনি জনগণকে সতর্ক করে বলেন:
‘মনে রাখবেন, শত্রুবাহিনী ঢুকেছে, নিজেদের মধ্যে আত্মকলহ সৃষ্টি করবে, লুটপাট করবে। এই বাংলায় হিন্দু-মুসলমান, বাঙালি-অবাঙালি যাঁরা আছেন, তাঁরা আমাদের ভাই, তাঁদের রক্ষার দায়িত্ব আমাদের ওপরে, আমাদের যেন বদনাম না হয়।’ ১৪

ব্যক্তিগত জীবনে বঙ্গবন্ধু নামাজ পড়তেন, রোজা রাখতেন, কোরআন শরিফ পড়তেন। তিনি সব নাগরিকের নিজ নিজ ধর্ম পালনের অধিকারে বিশ্বাসী ছিলেন। তবে তিনি রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহারের বিরোধী ছিলেন।

সমাজতন্ত্র: শোষণমুক্তি ও বৈষম্যহীনতা
তাঁর আত্মজীবনীতে বঙ্গবন্ধু লিখছেন:
‘আমি নিজে কমিউনিস্ট নই, তবে সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করি এবং পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে বিশ্বাস করি না। একে আমি শোষণের যন্ত্র হিসাবে মনে করি। এই পুঁজিপতি সৃষ্টির অর্থনীতি যত দিন দুনিয়ায় থাকবে, তত দিন দুনিয়ার মানুষের উপর থেকে শোষণ বন্ধ হতে পারে না।’ ১৫
সমাজতন্ত্র বলতে তিনি প্রাধানত শোষণমুক্ত এবং বৈষম্যহীন একটা ব্যবস্থার কথা ভাবতেন। ১৯৫২ সালে চীন যাবার পর চীন এবং পাকিস্তানের মধ্যে যে পার্থক্য তিনি দেখেছেন, তা তাঁর মনে গভীর দাগ কেটেছে। এই দুই দেশের পার্থক্য সম্বন্ধে তিনি লিখছেন:
‘তাদের সঙ্গে আমাদের পার্থক্য হল তাদের জনগণ জানতে পারল ও অনুভব করতে পারল এই দেশ ও এ দেশের সম্পদ তাদের। আর আমাদের জনগণ বুঝতে আরম্ভ করল, জাতীয় সম্পদ বিশেষ গোষ্ঠীর আর তারা যেন কেউই নন।’১৬

শোষণমুক্তি এবং বৈষম্য দূরীকরণে সরকারের যে দায়িত্ব আছে, তা তিনি বিশ্বাস করতেন। চীনে গিয়ে তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন চীন সরকার জনসাধারণের জন্য কী কী কাজ করছে, সে দেশে প্রাধান্য পাচ্ছে শিল্পকারখানার উন্নতি, শৌখিন দ্রব্য নয়।
তিনি লিখছেন:
‘ভূমিহীন কৃষক জমির মালিক হয়েছে। আজ চীন দেশ কৃষক–মজুরের দেশ। শোষক শ্রেণি শেষ হয়ে গেছে।’১৭
‘নতুন নতুন স্কুল, কলেজ গড়ে উঠেছে চারিদিকে। ছোট্ট ছোট্ট ছেলেমেয়েদের শিক্ষার ভার সরকার নিয়েছে।’ ১৮
‘কারাগারের রোজনামচা’য়ও তিনি লিখেছেন বৈষম্যহীনতার কথা। তিনি লিখেছেন যে কারাগারে তিনি সবার সঙ্গে একসঙ্গে খেতেন, যেমন ব্যবস্থা ছিল তাঁর নিজ বাড়িতে:
‘আমি যাহা খাই ওদের না দিয়ে খাই না। আমার বাড়িতেও একই নিয়ম।...আজ নতুন নতুন শিল্পপতিদের ও ব্যবসায়ীদের বাড়িতেও দুই পাক হয়। সাহেবদের জন্য আলাদা, চাকরদের জন্য আলাদা। আমাদের দেশে যখন একচেটিয়া সামন্তবাদ ছিল, তখন জমিদার, তালুকদারদের বাড়িতেও এই ব্যবস্থা ছিল না। আজ সামন্ততন্ত্রের কবরের উপর শিল্প ও বাণিজ্য সভ্যতার সৌধ গড়ে উঠতে শুরু করেছে, তখনই এই রকম মানসিক পরিবর্তনও শুরু হয়েছে। সামন্ততন্ত্রের শোষণের চেয়েও এই শোষণ ভয়াবহ।’১৯
স্বাধীনতার পর তাঁর স্বপ্নের সোনার বাংলায় তিনি কোনো বৈষম্য দেখতে চাননি। ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে তিনি বলেন:
‘বাংলাদেশে মানুষে মানুষে, ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে বৈষম্য থাকবে না। সম্পদের বণ্টনব্যবস্থায় সমতা আনতে হবে এবং উচ্চতর আয় ও নিম্নতম উপার্জনের ক্ষেত্রে যে আকাশচুম্বী বৈষম্য এত দিন ধরে বিরাজ করছিল, সেটা দূর করতে হবে।’

বঙ্গবন্ধুর চিন্তাধারা ও সংবিধানের চার মূলনীতি
বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক চিন্তাধারার যে চারটি বৈশিষ্ট্য নিয়ে আমি আলোচনা করেছি, তার প্রতিফলন আমরা আমাদের সংবিধানের চার মূলনীতিতে দেখতে পাই। তাঁর কর্মকাণ্ডের লক্ষ্য তিনি খুব সহজ দুটি শব্দে প্রায়ই ব্যক্ত করতেন। তিনি প্রায়ই বলতেন তাঁর লক্ষ্য হচ্ছে ‘সোনার বাংলা গড়ে তোলা’, কিংবা তিনি বলতেন ‘দুঃখী মানুষের মুখে তিনি হাসি ফোটাতে চান’। বঙ্গবন্ধু তাঁর জনসভায় খুবই সরল ভাষায় বক্তৃতা করতেন। তাই তাঁর বক্তব্য ছিল সুস্পষ্ট। যেমন বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরপরই ১৯৭২ সালে এক জনসভায় তিনি বলেন:

‘আমি কী চাই? আমি চাই বাংলার মানুষ পেট ভরে ভাত খাক। আমি কী চাই? আমার বাংলার মানুষ সুখী হোক। আমি কী চাই? আমার বাংলার মানুষ হেসেখেলে বেড়াক। আমি কী চাই? আমার সোনার বাংলার মানুষ আবার প্রাণভরে হাসুক।’
তাঁর বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার কিংবা অন্য তাত্ত্বিক বিষয় নিয়ে মাথা ঘামাতেন না। তিনি ঠিকই জানতেন জীবনে একটি হাসি কত অমূল্য এবং সেই অমূল্য সম্পদই অর্জন করাটা ছিল তাঁর লক্ষ্য।

তথ্যনির্দেশ
১. শেখ মুজিবুর রহমান, অসমাপ্ত আত্মজীবনী, ঢাকা, দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, ২০১২, পৃ ৪১
২. অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃ i
৩. আত্মজীবনী, পৃ ২২
৪. আত্মজীবনী, পৃ ১৭
৫. আত্মজীবনী, পৃ ৩৫
৬. আত্মজীবনী, পৃ ১২০
৭. আত্মজীবনী, পৃ ২৯৪
৮. আত্মজীবনী, পৃ ২৪০-২৪১
৯. শেখ মুজিবুর রহমান, কারাগারের রোজনামচা, ঢাকা, বাংলা একাডেমি, ২০১৭, পৃ ৬১-৬২
১০. https://bn.wikipedia.org/wiki/ সাতই মার্চের ভাষণ
১১. কারাগারের রোজনামচা। পৃ ৮৭
১২. https://bn.wikipedia.org/wiki/ সাতই মার্চের ভাষণ
১৩. আত্মজীবনী, প ৮২
১৪. https://bn.wikipedia.org/wiki/ সাতই মার্চের ভাষণ
১৫. আত্মজীবনী, পৃ ২৩৪
১৬. আত্মজীবনী, পৃ ২৩৪
১৭. আত্মজীবনী, পৃ ২৩০
১৮. আত্মজীবনী, পৃ ২৩৩
১৯. কারাগারের রোজনামচা, পৃ ১১


 

রওনক জাহান: সম্মানীয় ফেলো, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)

Friday, June 28, 2024

বাংলাদেশের সমাজ ও জনগোষ্ঠীর উপর ভূ-প্রকৃতির প্রভাব আলোচনা -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

ভূমিকাঃ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপূর্ব লীলাভূমির দেশ এই বাংলা। সবুজ প্রান্তর, মনোরম উদার মাঠ, বহু বিচিত্র ফুলফল লতাপাতায় সমৃদ্ধ এই দেশ । অসংখ্য নদী ও জলপথ, আকাশে মেঘের মেলা, ঝড়, বৃষ্টি, বজ্রপাত, প্লাবন সবকিছু মিলিয়ে প্রকৃতি বাংলাকে দান করেছে এক অপূর্ব সৌন্দর্য ভাণ্ডার । প্রকৃতির সৌন্দর্যের এই বিপুল সম্পদ বাংলায় কবিতা, সাহিত্য, সঙ্গীত, নৃত্য ও শিল্পকলার সমৃদ্ধির অফুরন্ত প্রাণ । তাইতো বাংলার ভৌগোলিক অবস্থান ও প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য এখানকার ইতিহাসের ধারাকে বহুলাংশে নিয়ন্ত্রিত করেছে । প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যই বাংলার অধিবাসীদের খাদ্য, পরিচ্ছদ ও বাসস্থানের স্বরূপ নির্ধারণ করেছে । বাংলার নদ-নদী কাজ করেছে এর প্রতিরক্ষা ব্যূহ হিচাবে ।

বাংলার ইতিহাসে ভৌগোলিক উপকরণের প্রভাব : বাংলার আর্থ- সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে এর ভৌগোলিক উপকরণের নানামুখী প্রভাব পড়েছে । যেমন—

১. রাজনীতির উপর ভূ-প্রকৃতির প্রভাবঃ
বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসের উপর এর ভৌগোলিক উপকরণের নানামুখী
প্রভাব পড়েছে । যেমন-

(ক) প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যুহঃ
 বাংলার নদ-নদী, খালবিল, ও জলাভূমিসমূহ এর সামরিক প্রতিরক্ষা ব্যূহের ন্যায় কাজ করতো । গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, মহানন্দা, কুশী ও তাদের অসংখ্য উপনদী এবং শাখা-প্রশাখাগুলো অতিক্রম করা সেই যুগে একটি শত্রু বাহিনীর পক্ষে সহজসাধ্য ছিল না । তাইতো বাংলার একটি ক্ষুদ্র বাহিনী উত্তর সীমান্তের প্রবেশদ্বারে একটি বিরাট শত্রু বাহিনীকেও ঠেকিয়ে রাখতে পারত ।

(খ) নৌবাহিনী গঠনে  ভূ-প্রকৃতির প্রভাবঃ
বাংলার চতুর্দিকে নদ-নদী ও জলবেষ্টিত হওয়ায় বাঙালিরা স্বভাবতই নৌচালনায় ও নৌযুদ্ধে পারদর্শী হয়ে উঠেছিল । ফলে বাংলার প্রতিটি মানুষই একজন নৌসেনার মতো দায়িত্ব পালন করতে পারত। ঐতিহসিক মিনহাজের মতে, গিয়াসউদ্দিন ইওয়াজ খলজিই সর্বপ্রথম কিছু সংখ্যক রণতরী নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নৌবাহিনী গঠন করেন ।

(গ) বাংলার স্বাধীনতা রক্ষার ক্ষেত্রে প্রভাবঃ  
প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতার আশ্রয় নিয়ে এবং ভৌগোলিক ও তথাকথিত খারাপ আবহাওয়ার সুযোগে এর শাসনকর্তাগণ সহজেই দিল্লির আধিপত্য অগ্রাহ্য করে প্রদেশে স্বাধীনতা ঘোষণা করতে সক্ষম হতেন । উদাহরণস্বরূপ বলা যায় ঈসা খাঁর মতো একজন জমিদার সম্রাট আকবরের ন্যায় প্রতাপশালী বাদশাহের বাহিনীকে ঠেকিয়ে বাংলার স্বাধীনতা বজায় রেখেছিল ।

২.আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে ভৌগোলিক উপকরণের  ভূ-প্রকৃতির প্রভাবঃ
নিম্ন বাংলার আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে এর ভৌগোলিক উপকরণের প্রভাব বর্ণনা করা হলো :

(ক) আচার-আচরণের উপর প্রভাবঃ
বাংলার মৃদু ও নাতিশীতোষ্ণ জলবায়ু প্রকৃতিগতভাবে বাঙালি অধিবাসীদেরকে করেছে শান্ত প্রকৃতির এবং অমায়িক । গ্ধি কোমল অন্তঃকরণের চমৎকার আবেগময়তা তাদের পারিবারিক জীবন ও সামাজিক সম্পর্ককে করেছে মধুময় ।

(খ) খাদ্য, পরিচ্ছদ ও বাসস্থানের উপর  ভূ-প্রকৃতির প্রভাবঃ
ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যই বাংলার অধিবাসীদের খাদ্য, পরিচ্ছদ ও বাসস্থানের স্বরূপ নির্ধারণ করেছে । নদ-নদী ও খালবিলের মাধ্যমে জলসেচের সুবিধার কারণে বাংলায় জন্মায় প্রচুর ধান আর নদ-নদীতে পাওয়া যায় প্রচুর মাছ । তাই বাংলার অধিবাসীদের প্রধান খাদ্য ভাত- মাছ । ঘর-বাড়ি তথা বাসস্থান প্রাকৃতিক প্রতিকূলতার দিকে লক্ষ করেই তৈরি করা হয়।

(গ) প্রাকৃতিক উত্থান-পতনঃ
নদ-নদীর ফলে বাংলায় যেমন অসংখ্য নগর-বন্দর গড়ে উঠেছে । আবার নদী ভাঙার ফলে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে বহু সমৃদ্ধ নগর, বন্দর, রাজধানী ও রাজ্যপাট প্রভৃতি । তাইতো একটি মুর্শিদি গান বলে—
‘একুল ভাঙ্গে ওকুল গড়ে
এইতো নদীর খেলা
সকালবেলা আমীর যে ভাই, ফকীর সন্ধ্যাবেলা
এইতো নদীর খেলা।’

(ঘ) শ্রমের উপর  ভূ-প্রকৃতির প্রভাবঃ
বাংলার জনগণ একাধারে শ্রমবিমুখ ও সংগ্রামশীল। এখানে বিনা কসরতে প্রচুর খাদ্যশস্য ও মাছ পাওয়া যায় বলে বাংলার জনগণ হয়ে উঠে কর্মবিমুখ। পক্ষান্তরে বর্ষাকাল, বন্যা, ঝড়-ঝঞ্ঝা ও নদীর ভাঙা-গড়ার সাথে লড়াই করে মানুষকে বেঁচে থাকতে হয় বলে বাঙালিরা হয়ে উঠে সংগ্রামশীল।

(ঙ) ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারঃ
বাংলায় নদীপথে যাতায়াত সহজ ও সুলভ ছিল। এ কারণে প্রদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার হয়েছিল এবং শিল্পজাত দ্রব্য বৃদ্ধি পেয়েছিল। নদীপথে প্রদেশের যেকোনো অঞ্চল থেকে সমুদ্রে যাতায়াত সম্ভব ছিল বিধায় ব্যাপক রপ্তানি বাণিজ্য সৃষ্টি হয়েছিল।

৩. সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে  ভূ-প্রকৃতির প্রভাবঃ
মেঘমালা, নদ-নদী, সবুজ-শ্যামল বনভূমি, শস্য-শ্যামল মাঠ ও ফলমূলকে কেন্দ্র করেই রচিত হয়েছে বাংলার শ্রেষ্ঠ কাব্য ও রচনা। কৃষকদের ধান কাটা, জেলেদের নদীতে মাছধরা, গায়ের মেয়ে ও বধূদের কলসী কাঁখে নদীতে যাওয়া ও পানি নিয়ে চলা এমনি ধরনের বিষয়বস্তু তাদের নৃত্য শিল্পকে সমৃদ্ধিশালী করে তুলেছে। নদীর জোয়ার ভাটা থেকে প্রেরণা পেয়ে সৃষ্টি হয়েছে ভাটিয়ালি সুর।
৪. ধর্মীয় জীবনে  ভূ-প্রকৃতির প্রভাব
প্রকৃতি বাঙালির অন্তরে গভীর ধর্মীয় বোধের সৃষ্টি করেছে। বাংলার জনসাধারণের মন মরমিবাদ দ্বারা সহজেই অনুপ্রাণিত হয় । বাঙালি হিন্দুদের ধর্মীয় বিশ্বাস, প্রধান প্রধান উৎসব ও অনুষ্ঠান মূলত প্রকৃতির প্রভাব থেকেই উদ্ভূত হয়েছে। মৌসুমি আবহাওয়ার খাম খেয়ালিপনা এবং এর উপর শস্য ও জীবিকার নির্ভরশীলতা তাদেরকে পরম সত্যের প্রতি আস্থাবান ও অতি প্রাকৃতিক শক্তিতে বিশ্বাসী করেছে। হিন্দুদের কালী ও দুর্গা দেবীর ধারণার জন্ম হয়েছে মানুষের জীবনে রুদ্র প্রকৃতির কার্যকলাপের ফলে।

উপসংহারঃ
পরিশেষে বলা যায় যে, ভৌগোলিক অবস্থান ও প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য বাংলাদেশের ইতিহাসের ধারাকে বহুলাংশে নিয়ন্ত্রিত করেছে। পদ্মা, ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, করতোয়া, মেঘনা প্রভৃতি অসংখ্য নদীনালা বাংলার ভূমিকে করেছে উর্বর এবং অধিবাসীদেরকে করেছে সম্পদশালী। প্রকৃতি এখানকার মানুষকে করেছে সংস্কৃতিমনা। বাংলার প্রকৃতি তার বিচিত্ররূপ ও লহরি নিয়ে একাধারে আনন্দ ও বিষাদ, করুণা ও নিষ্ঠুরতা, ধ্বংস ও সৃষ্টির মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ে চিন্তা ও ভাবনার সম্পদ যুগিয়ে এসেছে সর্বকালে ও সকল যুগে।
 
 

বাংলাদেশের সমাজ ও জনগোষ্ঠীর উপর ভূ-প্রকৃতির প্রভাব আলোচনা কর -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

Thursday, June 27, 2024

অখন্ড স্বাধীন বাংলা গঠনের প্রস্তাব ব্যর্থ হয় কেন? আলোচনা কর।

ভূমিকা : ভারত বিভক্তির প্রাক্কালে স্বাধীন অখণ্ড বাংলা রাষ্ট্র গঠনের পরিকল্পনা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও শরৎ বসু অখণ্ড স্বাধীন বাংলা গঠনের জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেন। ২৭ এপ্রিল দিল্লিতে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী বাংলার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য মি. জিন্নাহ এর সাথে আলোচনায় বসেন।

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর বড় ভাই শরৎচন্দ্র বসুসহ অন্যান্য বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেসের সংসদীয় দলের নেতা কিরণ শংকর রায় প্রমুখ ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হন অখণ্ড বাংলা প্রতিষ্ঠার দাবিতে। এ প্রচেষ্টা সফল হলে ভারত ও পাকিস্তানের পাশাপাশি অবিভক্ত বাংলা তৃতীয় স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতো। কিন্তু বাঙালিদের ভুল বোঝাবুঝি এবং মুসলিম লীগ ও কংগ্রেসের কায়েমি স্বার্থরক্ষায় অখণ্ড স্বাধীন বাংলা প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়।

অখণ্ড স্বাধীন বাংলা গঠনের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার কারণ : ১৯৪৭ সালে অখণ্ড স্বাধীন বাংলা গঠনের এঁচেষ্টা যে সকল কারণে ব্যর্থ হয় তা বর্ণনা করা হলো :

১. হিন্দু নেতৃবৃন্দের মধ্যে বিচ্ছিন্নতাবোধ : ভারত বিভক্তির পূর্বে গুরুত্বপূর্ণ এক দশক (১৯৩৭ – ১৯৪৭) সময়কালে বাংলার হিন্দু সম্প্রদায় সরকার পরিচালনায় কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা রাখার সুযোগ পায়নি। এ সময় মুসলমানরা রাষ্ট্র পরিচালনায় মুখ্য ভূমিকায় ছিল। এজন্য হিন্দু নেতৃবৃন্দের মধ্যে রাজনৈতিক হতাশা ও এক ধরনের বিচ্ছিন্নতাবোধ জন্ম নেয়। এ অবস্থার জন্য সর্বভারত ভিত্তিক হিন্দু-মুসলমান রাজনৈতিক মেরুকরণ বহুলাংশে দায়ী ছিল এবং এ থেকেই হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে বাংলা বিভক্তির মানসিকতা সৃষ্টি হয়। অখণ্ড স্বাধীন বাংলা প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়।

২. কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ নেতৃবৃন্দের অনীহা : কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ অখণ্ড বাংলাকে সমর্থন করেনি। কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের যে সকল নেতৃবৃন্দ অখণ্ড বাংলা প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিল তারা মুসলিম লীগ ও কংগ্রেসের হাইকমাণ্ডের বিরোধিতায় শেষ পর্যন্ত বাংলা বিভক্তির পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করে।

৩. বাংলার জনসংখ্যা বণ্টন সমস্যা : বাংলার পশ্চিম অংশে হিন্দু এবং পূর্ব অংশে মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল। জনসংখ্যার এরূপ বণ্টন সাম্প্রদায়িকতার বা ধর্মের ভিত্তিতে প্রদেশগুলোকে বিভক্তি করা সহজতর করে তোলে।

৪. সর্বভারতীয় ভিত্তিক হিন্দু-মুসলিম মেরুকরণ : বাংলা বিভক্তির জন্য সর্বভারতীয় ভিত্তিক হিন্দু-মুসলমান রাজনৈতিক মেরুকরণ বহুলাংশে দায়ী ছিল বলে অনেকে মনে করেন। ফলে অবিভক্ত বাংলা গঠন প্রস্তাব বানচাল হয়ে যায়।

৫. সময়ের সীমাবদ্ধতা : যুক্ত বাংলা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের ক্ষেত্রে সময়ের সীমাবদ্ধতা একটি অন্যতম বাধা। একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে (১৯৪৮ সালের জুন মাস পর্যন্ত) ব্রিটিশরা ক্ষমতা হস্তান্তর করে ভারত পরিত্যাগের চূড়ান্ত ঘোষণা দেয়। কিন্তু কার্যত তারা এর পূর্বেই আগস্ট ১৯৪৭ ভারত ত্যাগ করে। সময়ের সীমাবদ্ধতার ফলে পরিকল্পনাটি ব্যর্থ হয়।

৬. ১৯৪৬ সালের কোলকাতা দাঙ্গা : ১৯৪৬ সালের আগস্ট মাসে মুসলিম লীগের ‘প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবসে’ সংঘটিত ভয়াবহ কোলকাতা দাঙ্গার পর থেকে বিরাজমান সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতি বাংলা বিভক্তির পক্ষে প্রচারণা চালাতে স্বার্থান্বেষী হিন্দু মালিকানাধীন পত্রিকাগুলোর জন্য অপূর্ব সুযোগ এনে দেয়। যা দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে এক ভয়াবহ সন্দেহের সৃষ্টি হয় ।

৭. ব্রিটিশ সরকারের আন্তরিকতার অভাব : ব্রিটিশ সরকারের আন্তরিকতার অভাবে বাংলা বিভক্ত হয়। মাউন্ট ব্যাটেন কংগ্রেসের প্রতি পক্ষপাতিত্ব করেন। তেমনি বাংলা বিভাগের সিদ্ধান্তের পর গঠিত সীমানা কমিশনের চেয়ারম্যান র‍্যাড ক্লিফ কংগ্রেসের পক্ষ অবলম্বন করেন। ফলে স্বাধীন বাংলা গঠনের প্রচেষ্টা সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়।

উপসংহার : পরিবেশে বলা যায় যে, ভারত স্বাধীনতা আইন অনুসারে ভারত বিভক্ত হয় এবং পাকিস্তান সৃষ্টি হয়। পাকিস্তান সৃষ্টির পূর্বে অবিভক্ত বাংলা গঠনের প্রচেষ্টা গ্রহণ করে সোহরাওয়ার্দী ও বসু। কিন্তু মুসলিম লীগ কংগ্রেস ও অন্যান্য কারণে প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীনতা আইন গৃহীত হয়। যদিও আইনটি ছিল উত্তম তথাপি আইনের বেশকিছু ত্রুটি বিদ্যমান থাকায় ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী তিক্ততা সৃষ্টি করে।

Wednesday, May 1, 2024

বাঙালিকে সংকর বা মিশ্র-জাতি বলার কারণ

বাঙালি জাতির নৃগােষ্ঠীগত পরিচয় অল্প কথায় বিশ্লেষণ করা কঠিন। বাঙালি নরগােষ্ঠী বহুকাল ধরে নানা জাতির সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে। বিভিন্ন জাতিবর্ণের রক্তপ্রবাহ বাঙালি জাতির ধমনীতে সঞ্চারিত হয়েছে। এ কারণে কোনাে কোনাে তাত্ত্বিক বাঙালি জাতিকে সংকর জাতি হিসেবে অভিহিত করেছেন।

বাঙালিকে সংকর বা মিশ্র-জাতি বলার কারণ : বিভিন্ন জাতিগােষ্ঠীর সমন্বয়ে যে জাতির উদ্ভব ঘটায়, তাদেরকে সংকর জাতি বলা হয়। বাঙালিকে সংকর বা মিশ্র জাতি বলার কারণসমূহ নিয়ে আলােচনা করা হলাে :

১. আদি অস্ট্রীয় প্রভাব :

বাংদেশের অধিবাসীদের মধ্যে আদি অস্ট্রীয় প্রভাব বিদ্যমান। শ্রীলঙ্কার ভেড্ডিড জাতির সাথে এদের সাদৃশ্য রয়েছে। এদের বৈশিষ্ট্য হলাে লম্বাকৃতির মাথা, চওড়া নাক, গায়ের রং কালাে, গড়নে বেঁটে বা মধ্যাকৃতি । বাংলাদেশের গারাে, সাঁওতাল, ওরাও এবং কিছু সমতলবাসীর মাঝে এ ধরনের দৈহিক বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়।

২. মােঙ্গল দ্রাবিড় গােষ্ঠীর প্রভাব :  

বাংলাদেশের অধিবাসীদের মধ্যে মঙ্গোলীয় প্রভাব লক্ষ করা যায় । মঙ্গোলীয়রা পীতবর্ণের। গােল মাথা, ক্ষুদ্রাকৃতি চোখ, চোয়ালের উঁচু হাড়ের প্রভাব এ দেশের জনগােষ্ঠীর মধ্যে কমবেশি লক্ষ করা যায়। রিজলের মতে বাঙালিরা মােঙ্গল দ্রাবিড় প্রভাবিত এক সংকর জাতি।

৩. আর্য ভাষা ভাষীদের প্রভাব : 

আর্যরা দ্রাবিড় ভেন্ড্রিডদের পদানত করে এবং ভারতবর্ষে বর্ণপ্রথার সৃষ্টি করে। তাই অনেকের ধারণা বাংলাদেশী জনগােষ্ঠীর উপর আর্য ভাষাভাষীদের প্রভাব রয়েছে।

৪. আলপাইন নরগােষ্ঠীর প্রভাব : 

নৃবিজ্ঞানী হুটন উপমহাদেশের জনগােষ্ঠীকে যে আট ভাগে ভাগ করেছেন তন্মধ্যে আলপাইন একটি। তিনি নৃতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করে দেখেছেন যে, আলপাইন মানবগােষ্ঠীর সাথে বাঙালি জনগােষ্ঠীর অনেক দৈহিক মিল রয়েছে।

৫. বহিরাগত মুসলমানদের প্রভাব : 

অষ্টম ও নবম শতকে এদেশে বাইরের বিভিন্ন মুসলিম দেশ থেকে পীর, আউলিয়া ও তাদের শিষ্যরা এসেছিলেন। তাই ধারণা করা হয় ঐসব তুর্কি, আফগান, মুঘল, আরব, আবিসিনীয়, ইরানি জনগােষ্ঠীর প্রভাব এদেশের মধ্যে রয়েছে।

পরিশেষে বলা যায় যে, বাংলাদেশের জনগােষ্ঠীর মধ্যে সুপ্রাচীনকাল থেকে বিভিন্ন নৃগােষ্ঠীর প্রভাব বিদ্যমান। মূলত বৈচিত্র্যময় পরিবেশে ভিন্ন ভিন্ন জাতিগােষ্ঠীর সঙ্গে মেলামেশার ফলে বাঙালি পরিণত হয়েছে একটি সংকর বা মিশ্র-জাতিতে। তাই বাঙালি হচ্ছে নানা গােত্রভুক্ত মানুষের রক্তের মিশ্রণজাত এবং এক বিচিত্র জনগােষ্ঠী। এসব কারণে। বাঙালি জাতিকে একটি মিশ্র জাতি বা সংকর জাতি বলা হয়।

 

বাঙালিকে সংকর বা মিশ্র-জাতি বলার কারণ -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

Wednesday, March 31, 2021

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

 সংক্ষিপ্ত জীবনীঃ

১৭ই মার্চ, ১৯২০ সালে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় শেখ লুৎফুর রহমান এবং সায়রা বেগমের ঘরে জন্ম নেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ছয় ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। গোপালগঞ্জ পাবলিক স্কুল ও কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে পড়াশনা শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক পাশ করেন। ১৮ বছর বয়সে বেগম ফজিলাতুন্নেসার সাথে তাঁর বিয়ে হয়। তাদের ২ মেয়ে - শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা এবং তিন ছেলে- শেখ কামাল, শেখ জামাল ও শেখ রাসেল।
অল্পবয়স থেকেই তাঁর রাজনৈতিক প্রতিভার প্রকাশ ঘটতে থাকে। ১৯৪০ সালে তিনি নিখিল ভারত মুসলিম লীগের ছাত্র সংগঠন নিখিল ভারত মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনে যোগ দেন। কট্টরপন্থী এই সংগঠন ছেড়ে ১৯৪৩ সালে যোগ দেন উদারপন্থী ও প্রগতিশীল সংগঠন বেঙ্গল মুসলিম লীগে। এখানেই সান্নিধ্যে আসেন হুসেইন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালীন সময়ে রক্ষণশীল কট্টরপন্থী নিখিল ভারত মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনের কর্তৃত্ব খর্ব করতে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্র লীগ।
ভাষা আন্দোলনের সময় রাজনৈতিক নেতা হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন শেখ মুজিব। ১৯৪৮ সালে ভাষার প্রশ্নে তাঁর নেতৃত্বেই প্রথম প্রতিবাদ এবং ছাত্র ধর্মঘট শুরু হয় যা চূড়ান্ত রূপ নেয় ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে।
পঞ্চাশের দশক তাঁর রাজনৈতিক উত্থানের কাল। ধীরে ধীরে তিনি হয়ে উঠেন দূরদর্শীতা এবং প্রজ্ঞাসম্পন্ন এক কুশলী রাজনৈতিক নেতা। এসময় শেখ মুজিব মুসলিম লীগ ছেড়ে দেন এবং হোসেন সোহরাওয়ার্দী এবং মাওলানা ভাসানীর সাথে মিলে গঠন করেন আওয়ামী মুসলিম লীগ। তিনি দলের প্রথম যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৫৩ সালে তিনি দলের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান। ১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হয়ে যুক্তফ্রন্ট সরকারের কৃষি মন্ত্রী হন মুজিব। ১৯৫৬ সালে কোয়ালিশন সরকারের মন্ত্রিসভায় শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান তিনি।
১৯৬৩ সালে হোসেন সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর পর আওয়ামী মুসলিম লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন শেখ মুজিব। ১৯৬৬ সালে লাহোরে অনুষ্ঠিত বিরোধী দলগুলোর জাতীয় সম্মেলনে শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক ৬ দফা দাবি উত্থাপন করেন। এই ছয় দফা ছিল পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্ত্বশাসনের রূপরেখা।
মুজিবের ৬ দফার প্রতি জনগণের ব্যাপক সমর্থনে ভীত হয়ে তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় গ্রেপ্তার শেখ মুজিবকে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে বাংলার সমস্ত জনগণ। জনরোষের কাছে নতি স্বীকার করে এক পর্যায়ে শোষকগোষ্ঠী তাঁকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয় । ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে শেখ মুজিবুর রহমানকে গণসম্বর্ধনা দেওয়া হয়৷সেখানেই উত্থাপিত হয় এগার দফা দাবি যার মধ্যে ছয় দফার সবগুলোই দফাই অন্তর্ভুক্ত ছিল। লাখো মানুষের এই জমায়েতে শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়৷
১৯৬৯ সালের ৫ ডিসেম্বর আয়োজিত এক জনসভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব পূর্ব বাংলার নামকরণ করেন ‘বাংলাদেশ’। তিনি বলেন, “জনগণের পক্ষ হইতে আমি ঘোষণা করিতেছি- আজ হইতে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশটির নাম পূর্ব পাকিস্তানের পরিবর্তে শুধুমাত্র বাংলাদেশ”।
১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বরে সাধারণ নির্বাচনে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে জাতীয় পরিষদের ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসন এবং প্রাদেশিক পরিষদের ৩১০টি আসনের মধ্যে ৩০৫টি আসন লাভ করে। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী মুজিবের স্বায়ত্বশাসনের নীতির পুরোপুরি বিপক্ষে ছিলো। আওয়ামী লীগের সরকার গঠন ঠেকাতে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান সংসদের অধিবেশন ডাকা নিয়ে টালবাহানা শুরু করেন। শেখ মুজিব তখনই বুঝে যান যে, পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের দুঃশাসনের অবসান ঘটাতে লড়াইয়ের কোনো বিকল্প নেই।
১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে এক ঐতিহাসিক ভাষণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ডাক দেন। রেসকোর্সের জনসমুদ্রে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম”। ঐতিহাসিক এ ভাষণে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতিকে শৃংখল মুক্তির আহ্বান জানিয়ে ঘোষণা করেন, “রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেবো। এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ্। ... প্রত্যেকে ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তোলো। যার যা কিছু আছে তাই নিয়েই শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে”।
বঙ্গবন্ধুর ডাকে উত্তাল হয়ে ওঠে সারা বাংলা। মুজিবের নেতৃত্বে বাঙ্গালি জাতির এই জাগরণে ভীত ইয়াহিয়া খান সামরিক আইন জারি করেন, নিষিদ্ধ করেন আওয়ামী লীগকে এবং শেখ মুজিবকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেন।
এরপর আসে ২৫ মার্চ, ১৯৭১। রাতের অন্ধকারে নিরীহ নিরস্ত্র বাঙালীর ওপর শকুনের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে পাকিস্তানি সেনারা; শুরু করে অপারেশন সার্চলাইট নামে ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাকান্ড।অশীতিপর বৃদ্ধ থেকে কোলের শিশু- কেউ রক্ষা পায়না পাক হায়েনাদের নারকীয়তা থেকে। মুজিবকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়া হয় পশ্চিম পাকিস্তানে। অবশ্য তার আগেই, পাক বাহিনীর অভিযান শুরু হলে ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন এবং জনগণকে সর্বাত্মক আন্দোলনে সামিল হতে আহ্বান জানান।
১৯৭১ সালের ১৭ই এপ্রিল গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রথম সরকার গঠিত হয় এবং শেখ মুজিবকে রাষ্ট্রপতি করা হয়। তাঁর অনুপস্থিতিতে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম। এ সরকারের অধীনেই গঠিত হয় মুক্তিবাহিনী এবং শুরু হয় পাক সেনাদের প্রতিহত করার পালা। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের পর, ৩০ লক্ষ বাঙ্গালীর প্রাণের বিনিময়ে অবশেষে আসে বিজয়। ১৬ ডিসেম্বর সেই সোহরাওয়ার্দী উদ্যান যেখান থেকে স্বাধীনতা সংগ্রামের ডাক দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু, সেখানেই বাংলাদেশ-ভারত মিত্রবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পন করে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী। পৃথিবীর মানচিত্রে জন্ম নেয় বাংলাদেশ নামের নতুন একটি দেশ।
১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু ফিরে আসেন তাঁর প্রিয় মাতৃভূমিতে, তাঁর স্বপ্নের স্বাধীন দেশে। স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্টা, জাতির জনককে বরণ করতে লাখো মানুষের ঢল নামে বিমানবন্দরে। দেশে ফিরেই যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে ঝাঁপিয়ে পড়েন বঙ্গবন্ধু । মানবিক বিপর্যয় মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সাহায্যের আবেদন জানান বঙ্গবন্ধু এবং খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সাহায্য আসতে শুরু করে। শুরু হয় বাংলাদেশ পুনর্গঠনের এক নতুন যুদ্ধ। এরই মধ্যে সক্রিয় হয়ে ওঠে স্বাধীনতাবিরোধী একটি চক্র। মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতাকারী দেশীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রের প্রত্যক্ষ ইন্ধনে রাজনৈতিক অস্থিতশীলতা সৃষ্টি করতে উঠেপড়ে লাগে এই চক্রটি। এসময় বঙ্গবন্ধু বুঝতে পারেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। ১৯৭৪ সালে তিনি সকল রাজনৈতিক দলকে এক ছাতার নীচে আনতে প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ বা ‘বাকশাল'। এর ফলে দেশে স্থিতিশীলতা আসতে শুরু করে। সমস্ত দেশ যখন ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠে ঘুরে দাঁড়াচ্ছিল, ঠিখ তখনই আসে আরেকটি আঘাত।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট মধ্যরাতে একদল বিপথগামী সেনা কর্মকর্তা হত্যা করে শেখ মুজিব এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের। কেবল তাঁর দুই মেয়ে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা সেই সময় দেশের বাইরে থাকায় বেঁচে যান। সদ্য স্বাধীন জাতির জীবনে এক অপূরণীয় ক্ষতি নিয়ে আসে এই জঘন্য হত্যাকাণ্ড, তৈরি করে রাজনৈতিক শূণ্যতা, ব্যাহত হয় গণতান্ত্রিক উন্নয়নের ধারা।
 

 (মোঃ হেলাল উদ্দিন, ৩৩ তম বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা)
 

Monday, February 22, 2021

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের পূর্ণাঙ্গ ভাষণ

'এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম ...' বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কণ্ঠের এই ভাষণ বাঙালি জাতিকে উজ্জীবিত করেছিল। ১৮ মিনিট স্থায়ী এই ভাষণে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদেরকে স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত হওয়ার আহবান জানান। 

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণকে ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে ইউনেস্কো। এ ভাষণকে স্বীকৃতি দিয়ে 'মেমরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টারে' (এমওডাব্লিউ) তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এমওডব্লিউ-তে এটাই প্রথম কোনো বাংলাদেশি দলিল, যা আনুষ্ঠানিক ও স্থায়ীভাবে সংরক্ষিত হবে।

১২টি ভাষায় ভাষণটি অনুবাদ করা হয়। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঢাকার রমনায় অবস্থিত রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) দেওয়া বঙ্গবন্ধুর সেই ঐতিহাসিক ভাষণটি হুবহু প্রকাশ করা হলো :

"আজ দুঃখ-ভারাক্রান্ত মন নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি। আপনারা সবই জানেন এবং বুঝেন। আমরা আমাদের জীবন দিয়ে চেষ্টা করেছি- আজ ঢাকা, চট্টগ্রাম, রংপুর ও যশোরের রাজপথ আমার ভাইয়ের রক্তে রঞ্জিত হয়েছে।

আজ বাংলার মানুষ মুক্তি চায়-তারা বাঁচতে চায়। তারা অধিকার পেতে চায়। নির্বাচনে আপনারা সম্পূর্ণভাবে আমাকে এবং আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করেছেন শাসনতন্ত্র রচনার জন্য। আশা ছিল জাতীয় পরিষদ বসবে, আমরা শাসনতন্ত্র তৈরী করবো এবং এই শাসনতন্ত্রে মানুষ তাদের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তি লাভ করবে। কিন্তু ২৩ বছরের ইতিহাস বাংলার মানুষের রক্ত দিয়ে রাজপথ রঞ্জিত করার ইতিহাস।

২৩ বছরের ইতিহাস বাংলার মানুষের মুমূর্ষু আর্তনাদের ইতিহাস, রক্ত দানের করুণ ইতিহাস। নির্যাতিত মানুষের কান্নার ইতিহাস। ১৯৫২ সালে আমরা রক্ত দিয়েছি। ১৯৫৪ সালে নির্বাচনে জয় লাভ করেও ক্ষমতায় বসতে পারিনি। ১৯৫৮ সালে দেশে সামরিক শাসন জারি করে আইয়ুব খান দশ বছর আমাদের গোলাম করে রাখলো। ১৯৬৬ সালে ৬-দফা দেয়া হলো এবং এরপর এ অপরাধে আমার বহু ভাইকে হত্যা করা হলো। ১৯৬৯ সালে গণ-আন্দোলনের মুখে আইয়ুবের পতনের পর ইয়াহিয়া খান এলেন। তিনি বলেলেন, তিনি জনগণের হাতে ক্ষমতা ফিরিয়ে দেবেন, শাসনতন্ত্র দেবেন, আমরা মেনে নিলাম।

তার পরের ঘটনা সকলেই জানেন। ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে আলোচনা হলো-আমরা তাকে ১৫ ফেব্রুয়ারি জাতীয় পরিষদের অধিবেশন ডাকার অনুরোধ করলাম। কিন্তু ‘মেজরিটি’ পার্টির নেতা হওয়া সত্ত্বেও তিনি আমার কথা শুনলেন না। শুনলেন সংখ্যালঘু দলের ভুট্টো সাহেবের কথা। আমি শুধু বাংলার মেজরিটি পার্টির নেতা নই, সমগ্র পাকিস্তানের মেজরিটি পার্টির নেতা। ভুট্টো সাহেব বললেন, মার্চের প্রথম সপ্তাহে অধিবেশন ডাকতে, তিনি মার্চের ৩ তারিখে অধিবেশন ডাকলেন।

আমি বললাম, তবুও আমরা জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে যাব এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হওয়া সত্বেও কেউ যদি ন্যায্য কথা বলে আমরা তা মেনে নেব, এমনকি তিনি যদি একজনও হন।

জনাব ভুট্টো ঢাকা এসেছিলেন। তাঁর সঙ্গে আলোচনা হলো। ভুট্টো সাহেব বলে গেছেন আলোচনার দরজা বন্ধ নয়; আরো আলোচনা হবে। মওলানা নুরানী ও মুফতি মাহমুদসহ পশ্চিম পাকিস্তানের অন্যান্য পার্লামেন্টারি নেতারা এলেন, তাদের সঙ্গে আলোচনা হলো- উদ্দেশ্য ছিলো আলাপ-আলোচনা করে শাসনতন্ত্র রচনা করবো। তবে তাদের আমি জানিয়ে দিয়েছি ৬-দফা পরিবর্তনের কোন অধিকার আমার নেই, এটা জনগণের সম্পদ।

কিন্তু ভুট্টো হুমকি দিলেন। তিনি বললেন, এখানে এসে ‘ডবল জিম্মী’ হতে পারবেন না। পরিষদ কসাই খানায় পরিণত হবে। তিনি পশ্চিম পাকিস্তানী সদস্যদের প্রতি হুমকি দিলেন যে, পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিলে রক্তপাত করা হবে, তাদের মাথা ভেঙে দেয়া হবে। হত্যা করা হবে। আন্দোলন শুরু হবে পেশোয়ার থেকে করাচী পর্যন্ত। একটি দোকানও খুলতে দেয়া হবে না।

তা সত্বেও পয়ত্রিশ জন পশ্চিম পাকিস্তানী সদস্য এলেন। কিন্ত পয়লা মার্চ ইয়াহিয়া খান পরিষদের অধিবেশন বন্ধ করে দিলেন। দোষ দেয়া হলো, বাংলার মানুষকে, দোষ দেয়া হলো আমাকে, বলা হলো আমার অনমনীয় মনোভাবের জন্যই কিছু হয়নি।

এরপর বাংলার মানুষ প্রতিবাদ মুখর হয়ে উঠলো। আমি শান্তিপূর্ণ সংগ্রাম চালিয়ে যাবার জন্য হরতাল ডাকলাম। জনগণ আপন ইচ্ছায় পথে নেমে এলো।

কিন্তু কি পেলাম আমরা? বাংলার নিরস্ত্র জনগণের উপর অস্ত্র ব্যবহার করা হলো। আমাদের হাতে অস্ত্র নেই। কিন্তু আমরা পয়সা দিয়ে যে অস্ত্র কিনে দিয়েছি বহিঃশত্রুর হাত থেকে দেশকে রক্ষা করার জন্যে, আজ সে অস্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে আমার নিরীহ মানুষদের হত্যা করার জন্য। আমার দুখি জনতার উপর চলছে গুলি।

আমরা বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ যখনই দেশের শাসনভার গ্রহণ করতে চেয়েছি, তখনই ষড়যন্ত্র চলেছে-আমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে।

ইয়াহিয়া খান বলেছেন, আমি নাকি ১০ই মার্চ তারিখে গোলটেবিল বৈঠকে যোগদান করতে চেয়েছি, তাঁর সাথে টেলিফোন আমার আলাপ হয়েছে। আমি তাঁকে বলেছি আপনি দেশের প্রেসিডেণ্ট, ঢাকায় আসুন দেখুন আমার গরীব জনসাধারণকে কি ভাবে হত্যা করা হয়েছে, আমার মায়ের কোল খালি করা হয়েছে । 

আমি আগেই বলে দিয়েছি কোন গোলটেবিল বৈঠক হবে না। কিসের গোলটেবিল বৈঠক? কার গোলটেবিল বৈঠক? যারা আমার মা বোনের কোল শূন্য করেছে তাদের সাথে বসবো আমি গোলটেবিল বৈঠকে ?
তেসরা তারিখে পল্টনে আমি অসহযোগের আহবান জানালাম। বললাম, অফিস-আদালত, খাজনা-ট্যাক্স বন্ধ করুন। আপনারা মেনে নিলেন।

হঠাৎ আমার সঙ্গে বা আমাদের সঙ্গে আলোচনা না করে একজনের সঙ্গে পাঁচ ঘণ্টা বৈঠকের পর ইয়াহিয়া খান যে বক্তৃতা করেছেন, তাতে সমস্ত দোষ আমার ও বাংলার মানুষের উপর চাপিয়ে দিয়েছেন। দোষ করলেন ভুট্টো- কিন্তু গুলী করে মারা হলো আমার বাংলার মানুষকে। আমরা গুলী খাই, দোষ আমাদের- আমরা বুলেট খাই, দোষ আমাদের।

ইয়াহিয়া সাহেব অধিবেশন ডেকেছেন। কিন্ত আমার দাবী সামরিক আইন প্রত্যাহার করতে হবে, সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নিতে হবে, হত্যার তদন্ত করতে হবে। তারপর বিবেচনা করে দেখবো পরিষদে বসবো কি বসনো না। এ দাবী মানার আগে পরিষদে বসার কোন প্রশ্নই ওঠে না, জনগণ আমাকে সে অধিকার দেয়নি। রক্তের দাগ এখনো শুকায়নি, শহীদদের রক্ত মাড়িয়ে ২৫ তারিখে পরিষদে যোগ দিতে যাব না।

ভাইয়েরা, আমার উপর বিশ্বাস আছে? আমি প্রধানমন্ত্রীত্ব চাইনা, মানুষের অধিকার চাই। প্রধান মন্ত্রীত্বের লোভ দেখিয়ে আমাকে নিতে পারেনি, ফাঁসীর কাষ্ঠে ঝুলিয়ে নিতে পারেনি। আপনারা রক্ত দিয়ে আমাকে ষড়যন্ত্র মামলা থেকে মুক্ত করে এনেছিলেন। সেদিন এই রেসকোর্সে আমি বলেছিলাম, রক্তের ঋণ আমি রক্ত দিয়ে শোধ করবো; মনে আছে? আজো আমি রক্ত দিয়েই রক্তের ঋণ শোধ করতে প্রস্তুত।

আমি বলে দিতে চাই, আজ থেকে কোর্ট-কাচারী, হাইকোর্ট, সুপ্রীম কোর্ট, অফিস, আদালত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমুহ অনির্দিষ্ট-কালের জন্য বন্ধ থাকবে। কোন কর্মচারী অফিস যাবেন না। এ আমার নির্দেশ। 
গরীবের যাতে কষ্ট না হয় তার জন্য রিক্সা চলবে, ট্রেন চলবে আর সব চলবে।

ট্রেন চলবে- তবে সেনাবাহিনী আনা-নেয়া করা যাবে না। করলে যদি কোন দূর্ঘটনা ঘটে তার জন্য আমি দায়ী থাকবো না।

সেক্রেটারীয়েট, সুপ্রীম কোর্ট, হাইকোর্ট জজকোর্ট সহ সরকারী, আধা-সরকারী এবং স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাগুলো বন্ধ থাকবে। শুধু পূর্ব বাংলার আদান-প্রদানের ব্যাঙ্কগুলো দু-ঘন্টার জন্য খোলা থাকবে। পূর্ব বাংলা থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে টাকা যেতে পারবেন না। টেলিগ্রাফ, টেলিফোন বাংলাদেশের মধ্যে চালু থাকবে। তবে, সাংবাদিকরা বহির্বিশ্বে সংবাদ পাঠাতে পারবেন।

এদেশের মানুষকে খতম করা হচ্ছে, বুঝে শুনে চলবেন। দরকার হলে সমস্ত চাকা বন্ধ করে দেয়া হবে। 
আপনারা নির্ধারিত সময়ে বেতন নিয়ে আসবেন। যদি একটিও গুলী চলে তাহলে বাংলার ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তুলবেন। যার যা আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে। রাস্তা ঘাট বন্ধ করে দিতে হবে। আমরা তাদের ভাতে মারবো-পানিতে মারবো। হুকুম দিবার জন্য আমি যদি না থাকি, আমার সহকর্মীরা যদি না থাকেন, আপনারা আন্দোলন চালিয়ে যাবেন।

তোমরা আমার ভাই, তোমরা ব্যারাকে থাকো, কেউ কিছু বলবেনা। গুলী চালালে আর ভাল হবে না। সাত কোটি মানুষকে আর দাবীয়ে রাখতে পারবা না। বাঙ্গালী মরতে শিখেছে, তাদের কেউ দাবাতে পারবে না। 
শহীদদের ও আহতদের পরিবারের জন্য আওয়ামী লীগ সাহায্য কমিটি করেছে। আমরা সাহায্যের চেষ্টা করবো। আপনারা যে যা পারেন দিয়ে যাবেন।

সাত দিনের হরতালে যে সব শ্রমিক অংশগ্রহণ করেছেন, কারফিউর জন্য কাজ করতে পারেননি-শিল্প মালিকরা তাদের পুরো বেতন দিয়ে দেবেন।

সরকারী কর্মচারীদের বলি, আমি যা বলি তা মানতে হবে। কাউকে যেন অফিসে দেখা না যায়। এ দেশের মুক্তি না হওয়া পর্যন্ত খাজনা-ট্যাক্স বন্ধ থাকবে। আপনারা আমার উপর ছেড়ে দেন, আন্দোলন কিভাবে করতে হয় আমি জানি।

কিন্তু হুঁশিয়ার, একটা কথা মনে রাখবেন, আমাদের মধ্যে শত্রু ঢুকেছে, ছদ্মবেশে তারা আত্মকহলের সৃষ্টি করতে চায়। বাঙ্গালী-অবাঙ্গালী, হিন্দু-মুসলমান সবাই আমাদের ভাই, তাদের রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদের। 
রেডিও, টেলিভিশন ও সংবাদপত্র যদি আমাদের আন্দোলনের খবর প্রচার না করে তবে কোন বাঙ্গালী রেডিও এবং টেলিভিশনে যাবেন না।

শান্তিপূর্ণভাবে ফয়সালা করতে পারলে ভাই ভাই হিসাবে বাস করার সম্ভাবনা আছে, তা না হলে নেই। বাড়াবাড়ি করবেন না, মুখ দেখাদেখিও বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

প্রস্তুত থাকবেন, ঠাণ্ডা হলে চলবে না। আন্দোলন ও বিক্ষোভ চালিয়ে যাবেন। আন্দোলন ঝিমিয়ে পড়লে তারা আমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। শৃংখলা বজায় রাখুন। শৃংখলা ছাড়া কোন জাতি সংগ্রামে জয়লাভ করতে পারে না।

আমার অনুরোধ প্রত্যেক গ্রামে, মহল্লায়, ইউনিয়নে, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম কমিটি গড়ে তুলুন। হাতে যা আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকুন। রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেবো। এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ।

এবারের সংগ্রাম, মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম।

জয় বাংলা।"


 (মোঃ হেলাল উদ্দিন, ৩৩ তম বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা)

Saturday, February 20, 2021

বঙ্গবন্ধুর ভাষা আন্দোলন -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

 বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার ‘সভ্যতার সংকট’ প্রবন্ধে লিখেছিলেন, ‘আজও আশা করে আছি পরিত্রাণ কর্তা আসবে সভ্যতার দৈববাণী নিয়ে, চরম আশ্বাসের কথা শোনাবে পূর্ব দিগন্ত থেকেই।’ বাঙ্গালী জাতিকে সেই আশ্বাসের কথা শোনাতে এসেছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। যিনি শুধু বাঙ্গালীর স্বাধীনতাই এনে দেননি। এই স্বাধীনতার ভিত্তি বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের প্রথম আন্দোলন ভাষা আন্দোলনেও তার ছিল অসামান্য অবদান। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টির পর পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী সচেতনভাবে বাঙালির কাছ থেকে ভাষার অধিকার হরণ করতে চেয়েছিল। তারা চেয়েছিল সংখ্যালঘু জনগণের ভাষা উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দিতে। কিন্তু তাদের সেই অপতৎপরতার বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিলেন বাঙালির ত্রাণকর্তা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। আজীবন মাতৃভাষাপ্রেমী এই মহান নেতা ১৯৪৭ সালে ভাষা আন্দোলনের সূচনা পর্বে, ১৯৪৮ সালে রাজপথে আন্দোলন ও কারাবরণ, পরে আইনসভার সদস্য হিসেবে রাষ্ট্রভাষার সংগ্রাম ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় অতুলনীয় ভূমিকা রাখেন। স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি বাংলা ভাষাকে তুলে ধরেছেন বিশ্ববাসীর কাছে।

ভাষা আন্দোলনে তার এই অবদানকে তেমন করে তুলে ধরা হয়নি ইতিহাসে। কিন্তু ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ প্রকাশের পর ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর বৃহৎ অবদান স্পষ্ট হয়। সেখানে বঙ্গবন্ধু নিজেই উল্লেখ করেছেন ভাষা আন্দোলনের ঘটনাক্রম ও তাঁর ভূমিকা। ১৯৪৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান সংবিধান সভায় ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বাংলা ভাষাকেও রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানান। কিন্তু কেবল উর্দুকেই রাষ্ট্রভাষা করতে চায় মুসলিম লীগ। বঙ্গবন্ধু ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র ৯১ পৃষ্ঠায় লিখেছেন, ‘আমরা দেখলাম, বিরাট ষড়যন্ত্র চলছে বাংলাকে বাদ দিয়ে রাষ্ট্রভাষা উর্দু করার। পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ ও তমুদ্দুন মজলিস এর প্রতিবাদ করল এবং দাবি করল, বাংলা ও উর্দু দুই ভাষাকেই রাষ্ট্রভাষা করতে হবে। আমরা সভা করে প্রতিবাদ শুরু করলাম। এই সময় পূর্ব পাকিস্তান মুসলীম ছাত্রলীগ ও তমদ্দুন মজলিস যুক্তভাবে সর্বদলীয় সভা আহ্বান করে একটা ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করল।’

 ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে এক অনন্য অবিস্মরণীয় দিন। এদিন ভাষার দাবিতে প্রথম হরতাল পালিত হয়। এটাই হলো পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর প্রথম হরতাল। হরতালের নেতৃত্ব দেন শেখ মুজিবুর রহমান। ওইদিন তিনি পুলিশি নির্যাতনের শিকার হন এবং তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এটি ছিল পাকিস্তানে কোনো প্রথম রাজনৈতিক নেতাকে গ্রেপ্তার। (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান: জীবন ও রাজনীতি, প্রকাশক বাংলা একাডেমি)।

ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে ১৯৪৯ সালের অক্টোবরে শেখ মুজিবুর রহমানকে আটক করে পাকিস্তান সরকার। তবে কারাগার থেকেই ওই আন্দোলনে একাত্মতা ঘোষণা করেন তিনি। ভাষাসৈনিক গাজীউল হক তার স্মৃতিকথায় লিখেছেন- ‘১৯৪৯ সালের অক্টোবর মাসে গ্রেপ্তার হওয়ার পর জনাব শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিভিন্ন জেলে আটক ছিলেন। ফলে স্বাভাবিক কারণেই ’৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করা জনাব শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে সম্ভব ছিল না। তবে জেলে থেকেই তিনি আন্দোলনের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলতেন এবং বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ দিতেন। ’ (গাজীউল হক, আমার দেখা আমার লেখা, পৃষ্ঠা-৪০)।

একই কথা লিখেছেন প্রখ্যাত সাংবাদিক আবদুল গাফফার চৌধুরী তার  ‘একুশকে নিয়ে কিছু স্মৃতি, কিছু কথা’ প্রবন্ধে। সেখানে তিনি লিখেছেন, শেখ মুজিব ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ১৬ তারিখ ফরিদপুর জেলে যাওয়ার আগে ও পরে ছাত্রলীগের একাধিক নেতার কাছে চিরকুট পাঠিয়েছেন। ’ (তথ্যসূত্র: ভালোবাসি মাতৃভাষা- পৃষ্ঠা: ৬২)

১৯৫১ সালে যখন খাজা নাজিমুদ্দীন ঘোষণা দেন, ‘উর্দুই হবে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’। বঙ্গবন্ধু তখন জেলে। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র ১৯৬ পৃষ্ঠায় বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘বারান্দায় বসে আলাপ হল এবং আমি বললাম, সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠন করতে। আওয়ামী নেতাদেরও খরব দিয়েছি।...আবার ষড়যন্ত্র চলছে বাংলা ভাষার দাবিকে নস্যাৎ করার। এখন প্রতিবাদ না করলে কেন্দ্রীয় আইনসভায় মুসলিম লীগ উর্দুর পক্ষে প্রস্তাব পাস করে নেবে।...খবর পেয়েছি আমাকে শীঘ্রই আবার জেলে পাঠিয়ে দিবে, কারণ আমি নাকি হাসপাতালে বসে রাজনীতি করছি।’

১৯৭ পৃষ্ঠায় লিখেছেন, ‘পরের দিন রাতে এক এক করে অনেকেই আসল। সেখানেই ঠিক হল আগামী ২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা দিবস পালন করা হবে এবং সভা করে সংগ্রাম পরিষদ গঠন করতে হবে। ছাত্রলীগের পক্ষ থেকেই রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের কনভেনর করতে হবে। ফেব্রুয়ারি থেকেই জনমত সৃষ্টি করা শুরু হবে।’

বঙ্গবন্ধু জেলে থাকলেও আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত নেতাকর্মীদের সাথে তার যোগাযোগ হতো নিয়মিত। তিনি ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র ২০৩ পৃষ্ঠায় লিখেছেন, ‘২১শে ফেব্রুয়ারি আমরা উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা নিয়ে দিন কাটালাম, রাতে সিপাহিরা ডিউটিতে এসে খবর দিল, ঢাকায় ভীষণ গোলমাল হয়েছে। কয়েকজন লোক গুলি খেয়ে মারা গেলে। রেডিওর খবর। ফরিদপুরে হরতাল হয়েছে, ছাত্র-ছাত্রীরা শোভাযাত্রা করে জেলগেটে এসেছিল। তারা বিভিন্ন স্লোগান দিচ্ছিল, ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’, ‘বাঙালিদের শোষণ করা চলবে না’, ‘শেখ মুজিবের মুক্তি চাই’, ‘রাজবন্দীদের মুক্তি চাই’, আরও অনেক স্লোগান।’

ভাষার মিছিলে গুলিতে শহিদ হওয়া নিয়ে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘মুসলিম লীগ সরকার কত বড় অপরিণামদর্শিতার কাজ করল। মাতৃভাষা আন্দোলনে পৃথিবীতে এই প্রথম বাঙালিরাই রক্ত দিল। দুনিয়ার কোথাও ভাষা আন্দোলন করার জন্য গুলি করে হত্যা করা হয় নাই। জনাব নূরুল আপনি বুঝতে পারলেন না, আমলাতন্ত্র তাঁকে কোথায় নিয়ে গেল।...আমি ভাবলাম, দেখব কি না জানি না, তবে রক্ত যখন আমাদের ছেলেরা দিয়েছে তখন বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা না করে আর উপায় নাই। মানুষের যখন পতন আসে তখন পদে পদে ভুল হতে থাকে।’

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ভাষা আন্দোলন নিয়ে বিবৃতি দিলে মুসলিম লীগের পত্রিকায় তা বিকৃতি করে ছাপা হয়। বঙ্গবন্ধু ২১২ নম্বর পৃষ্ঠায় লিখেছেন, ‘এদিকে মুসলিম লীগের কাগজগুলি শহীদ সাহেবের বিবৃতি এমনভাবে বিকৃত করে ছাপিয়েছে যে মনে হয় তিনিও উর্দুই একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হোক এটাই চান। আমি সাধারণ সম্পাদক হয়েই একটা প্রেস কনফারেন্স করলাম। তাতে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করতে হবে, রাজবন্দীদের মুক্তি দিতে হবে এবং যাঁরা একুশে ফেব্রুয়ারি শহীদ হয়েছেন তাঁদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দান এবং যারা অন্যায়ভাবে জুলুম করেছে তাদের শাস্তির দাবি করলাম। সরকার যে বলেছেন, বিদেশী কোন রাষ্ট্রের উসকানিতে এই আন্দোলন হয়েছে, তার প্রমাণ চাইলাম।’

ভাষা আন্দোলনের পর বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদাদান, সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু, সংসদের দৈনন্দিন কার্যাবলী বাংলায় চালু প্রসঙ্গে তিনি আইন সভায় গর্জে ওঠেন এবং মহানায়কের ভূমিকা পালন করেন। ১৯৫৩ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির প্রভাত ফেরিতে মওলানা ভাসানী, বঙ্গবন্ধুসহ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। ওইদিনও রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবি জানান তিনি।  

১৯৫৪ সালে প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট জয়লাভ করলে ৭ মে অনুষ্ঠিত গণপরিষদের অধিবেশনে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। বাংলাকে পাকিস্তানের দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষা হিসাবে স্বীকৃতি দিয়ে সংবিধানে পরিবর্তন আনা হয় ১৯৫৬ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি। এর পেছনেও বিশেষ অবদান রয়েছে বঙ্গবন্ধুর।

১৯৭১ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় উপস্থিত জনতার উদ্দেশে বক্তব্য রাখেন বঙ্গবন্ধু। সেখানে তিনি বলেন, ‘আজ মহান একুশে ফেব্রুয়ারি। শহিদ দিবসে আপনারা এখানে এসেছেন, ১২টা ১ মিনিটের সময় আমি মাজারে গিয়েছি, সেখান থেকে সোজা এখানে চলে এসেছি। বাঙালিরা বহু রক্ত দিয়েছে। ১৯৫২ সালে যে রক্ত দেয়া শুরু হয়েছে সে রক্ত আজো শেষ হয় নাই, কবে হবে তা জানি না। আজ শহিদ দিবসে শপথ নিতে হবে, যে পর্যন্ত না ৭ কোটি মানুষ তার অধিকার আদায় করতে না পারবে সে পর্যন্ত বাংলার মা-বোনেরা বাংলার ভাইয়েরা আর শহিদ হবে না, গাজী হবে।’

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ বিজয় অর্জন করে বিশ্বের মানচিত্রে স্বাধীন দেশের মর্যাদা লাভ করে। ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধানে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। বাংলা ভাষায় সংবিধান প্রণীত করেন বঙ্গবন্ধু। স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে ১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে প্রথম বাংলায় বক্তব্য দিয়ে বিশ্বসভায় বাংলাকে তুলে ধরেন। বঙ্গবন্ধু মনে করতেন, মাতৃভাষার প্রতি যার ভালোবাসা নেই দেশের প্রতি তার ভালোবাসা থাকবে বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। তাই ১৯৭৫ সালের ১২ মার্চ রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন বঙ্গবন্ধু শেষ মুজিবুর রহমান সরকারি কাজে বাংলাভাষা প্রচলনের প্রথম সরকারি নির্দেশ জারি করেন। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব ভাষা-আন্দোলনেরই সুদুর প্রসারী ফলশ্রুতি। ’ (দৈনিক সংবাদ, ২১ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৫)।

বাংলা ভাষা আজ দেশের গণ্ডি পেরিয়ে সারাবিশ্বে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে। যার পিছনে ছিল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অনন্য অবদান। তাই কবিতার ভাষায় বলতে পারি, একুশ মানে মাথা নত না করা; একুশ মানে দৃপ্ত পথে এগিয়ে যাওয়া। একুশের পথ ধরেই এসেছে বাংলার স্বাধীনতা, একুশের চেতনায় এগিয়ে চলেছি আমরা।

 (মোঃ হেলাল উদ্দিন, ৩৩ তম বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা)