Showing posts with label রাজনীতি ও উন্নয়নে নারী. Show all posts
Showing posts with label রাজনীতি ও উন্নয়নে নারী. Show all posts

Friday, June 28, 2024

বাংলাদেশের সংবিধানে নারীর অধিকার -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

 

বাংলাদেশের সমস্ত কর্মক্ষেত্রে পুরুষের পাশাপাশি নারীর সরব অংশগ্রহণ দৃশ্যমান। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান সবক্ষেত্রে নারীর পদচারণা যেমন বেড়েছে, তেমনি সমাজে নারীকে শক্তিশালী করতে তৈরি করা হয়েছে আইনি সুরক্ষা বলয়, যার ওপর দাঁড়িয়ে এখন নারী সংকটে সংগ্রাম করতে শিখেছে ও শিখছে।

জাতিসংঘের সার্বজনীন মানবাধিকারের ঘোষণায় নারী–পুরুষ নির্বিশেষে সমান মানবিক মর্যাদা, আইনের আশ্রয়লাভ, কর্ম বেছে নেয়া ও সামাজিক নিরাপত্তার অধিকারের স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। বিবাহ, দাম্পত্য জীবন এবং বিবাহ বিচ্ছেদের ক্ষেত্রে নারী পুরুষ দুজনের সমান অধিকার এবং সাধারণ স্বাস্থ্য কল্যাণের পাশাপাশি মাতৃত্বকালীন স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের উপর জোর দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানে মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্রের এসব অঙ্গীকারের প্রতিফলন রয়েছে। পৃথিবীর অন্যান্য রাষ্ট্রের মতো আমাদের সংবিধানেও নারীর অধিকার নিয়ে স্পষ্ট বলা আছে। সংবিধানের বেশ কয়েকটি অনুচ্ছেদে অত্যন্ত সুনিপুণ ও সুন্দরভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে নারীর অধিকারগুলো। কিন্তু আমাদের দেশের অধিকাংশ নারীই তার সাংবিধানিক অধিকার সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নয়। তারা জানে না, একজন মানুষ কিংবা রাষ্ট্রের একজন নাগরিক হিসেবে কী তার অধিকার। ফলে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে নিজের অধিকার আদায়ের জন্য সোচ্চার হতে পারে না।

বাংলাদেশে নারীদের সাংবিধানিক অধিকার: গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সংবিধানের আলোকে প্রত্যেক নাগরিকের জন্য সম–অধিকার নিশ্চিত করার কথা বর্ণিত হয়েছে। এক্ষেত্রে নারী–পুরুষ ধমর্–বর্ণ নির্বিশেষে সকলের মানবাধিকার নিশ্চিতসহ সম–অধিকার, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক সকল সুযোগ সুবিধা, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত করাই সংবিধানের মূল মন্ত্র।

বাংলাদেশের সংবিধানের আলোকে নারীদের নিম্নবর্ণিত অধিকারের কথা নিশ্চিত করা হয়েছে:

অনুচ্ছেদ ০৮। রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি

জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা

এই নীতিসমূহ এবং তৎসহ এই নীতিসমূহ হইতে উদ্ভূত এই ভাগে বর্ণিত অন্য সকল নীতি রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি বলিয়া পরিগণিত হইবে।

অনুচ্ছেদ ১০। সমাজতন্ত্র ও শোষণ মুক্তি –

মানুষের উপর মানুষের শোষণ হইতে মুক্ত ন্যায়ানুগ ও সাম্যবাদী সমাজলাভ নিশ্চিত করিবার উদ্দেশ্যে সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হইবে।

অনুচ্ছেদ ১১। গণতন্ত্র ও মানবাধিকার

প্রজাতন্ত্র হইবে একটি গণতন্ত্র, যেখানে মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা থাকিবে, মানবসত্তার মর্যাদা ও মূল্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নিশ্চিত হইবে [এবং প্রশাসনের সকল পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত হইবে।]

অনুচ্ছেদ ১৯। সুযোগের সমতা –

(১) সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা নিশ্চিত করিতে রাষ্ট্র সচেষ্ট হইবেন।

(২) জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে মহিলাদের অংশগ্রহণ ও সুযোগের সমতা রাষ্ট্র নিশ্চিত করিবেন।

অনুচ্ছেদ ২৭। আইনের দৃষ্টিতে সমতা সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।

অনুচ্ছেদ ২৮। ধর্ম প্রভৃতি কারণে বৈষম্য

(১) কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারীপুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোন নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করিবেন না।

(২) রাষ্ট্র ও গণ জীবনের সর্বস্তরে নারী পুরুষের সমান অধিকার লাভ করিবেন।

(৩) কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারীপুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে জনসাধারণের কোন বিনোদন বা বিশ্রামের স্থানে প্রবেশের কিংবা কোন শিক্ষা– প্রতিষ্ঠানে ভর্তির বিষয়ে কোন নাগরিককে কোনরূপ অক্ষমতা, বাধ্যবাধকতা, বাধা বা শর্তের অধীন করা যাইবে না।

(৪) নারী বা শিশুদের অনুকূলে কিংবা নাগরিকদের যে কোন অনগ্রসর অংশের অনগ্রগতির জন্য বিশেষ বিধান–প্রণয়ন হইতে এই অনুচ্ছেদের কোন কিছুই রাষ্ট্রকে নিবৃত্ত করিবে না।

অনুচ্ছেদ ৩৮। সংগঠনের স্বাধীনতা জনশৃংখলা ও নৈতিকতার স্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধা–নিষেধ সাপেক্ষ সমিতি বা সংঘ গঠন করিবার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের থাকিবে –

তবে শর্ত থাকে যে, কোন ব্যক্তির উত্তমরূপ সমিতি বা সংঘ গঠন করিবার কিংবা উহার সদস্য হইবার অধিকার থাকিবে না, যদি:

(ক) উহা নাগরিকদের মধ্যে ধর্মীয়, সামাজিক এবং সামপ্রদায়িক সমপ্রীতি বিনষ্ট করিবার উদ্দেশ্যে গঠিত হয়;

(খ) উহা ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী–পুরুষ, জন্মস্থান বা ভাষার ক্ষেত্রে নাগরিকের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি করিবার উদ্দেশ্যে গঠিত হয়;

(গ) উহা রাষ্ট্র বা নাগরিকের বিরুদ্ধে কিংবা অন্য কোন দেশের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী বা জঙ্গী কার্য পরিচালনার উদ্দেশ্যে গঠিত হয়; বা

(ঘ) উহার গঠন ও উদ্দেশ্যে এই সংবিধানের পরিপন্থী হয়।]

অনুচ্ছেদ ৬৫ । সংসদ প্রতিষ্ঠা

সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৬৫ (৩) এ জাতীয় সংসদের পঞ্চাশটি আসন কেবল মহিলা সদস্যদের জন্য সংরক্ষিত রাখা হয়েছে যারা জাতীয় সংসদের মাননীয় সংসদ সদস্যদের মাধ্যমে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতির ভিত্তিতে একক হস্তান্তর যোগ্য ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত হবেন।

নারীর উন্নয়ন ও অগ্রগতির ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ কুসংস্কার অনেক পুরনো। পশ্চাৎপদ দৃষ্টিভঙ্গি, সামাজিক ও ধর্মীয় রক্ষণশীলতা, রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহারের সঙ্গে ইদানীং যুক্ত হয়েছে উগ্র সামপ্রদায়িক রাজনীতি। এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করেই নারীদের অগ্রসর হতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত। পুরুষের লড়াই সমাজে ও রাষ্ট্রে মানুষ হিসেবে। কিন্তু নারীর লড়াই মানুষ হিসেবে তো আছেই সে সাথে নারীর হিসেবেও তাকে আলাদা লড়াইয়ে সামিল হতে হয়।

নারীকে অধস্তন হিসেবে দেখার পারিবারিক ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি যতদিন বদল না হবে, নারীকে মানুষ হিসেবে দেখার মানসিকতা যতদিন গড়ে না উঠবে ততদিন নারীকে অসম্মান এবং বৈষম্যের শিকার হতে হবে বলেই মনে করা হয়। তবে নারীর লড়াইয়ে একটা বড় হাতিয়ার তার সাংবিধানিক অধিকার। অধিকার সম্পর্কে সচেতন হলে বন্ধুর পথ চলা সহজ হবে। 

 

 বাংলাদেশের সংবিধানে নারীর অধিকার -- রিমঝিম আহমেদ

Monday, April 5, 2021

বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে নারী ও রাজনীতি অধ্যয়নের গুরুত্ব

বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে নারী ও রাজনীতি অধ্যয়নের গুরুত্ব অপরিসীম। বাংলাদেশ নামক দেশটি ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে মাধ্যমে স্বাধীন হয়েছে। স্বাধীনতা যুদ্ধে নারীর অবদান কোন অংশেই কম নয়। নারী ও পুরুষের গভীর আত্মত্যাগই আমাদের স্বাধীনতার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপায়িত করেছে। নারীরাও এ স্বাধীন দেশের নাগরিক, অথচ আমাদের সমাজে নারীরা এখেেনা পুরুষ কর্তৃক অবদমিত ও অবহেলিত। তাই নারীর প্রতি এই নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি দূর করে একটি সুষম সমাজ গড়ে তুলে স্বাধীনতার স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে একটি আলাদা বিষয় হিসেবে নারীও রাজনীতি অধ্যয়ন করা প্রয়োজন। নিম্নে এ সম্পর্কে আলোচনা করা হলো :

১. দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন : দীর্ঘকাল ঔপনিবেশিক শাসন, পাকিস্তান আমলে ধর্মীয় গোঁড়ামি বাংলাদেশের সমাজে যে রক্ষণশীলতার জন্ম দিয়েছে নারী তা দ্বারা প্রত্যক্ষভাবে ক্ষতির শিকার হচ্ছে। ফলে পুরুষ আধিপত্য বেড়েই চলছে। এর মূল কারণ নারীর প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ। নারী ও রাজনীতি অধ্যয়নের ফলে সমাজের এ দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে সম্ভব। এ জন্যই বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে নারী বিষয় বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা খুবই জরুরি।
২. নারী সচেতনতা বৃদ্ধি : বাংলাদেশ আয়থন ও জনসংখ্যার তুলনায় ছোট এবং দরিদ্র দেশ। দারিদ্র্য, সামাজিক কুসংস্কার পরস্পর সহাবস্থান করে। ফলে নারীর উন্নয়ণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। নারীরা তাদের অধিকার ও কর্তব্য সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন নয়। তাই নারী অধ্যয়নের মাধ্যমে নারীদের অনগ্রসরতার কারণগুলো চিহ্নিত করে নারী উন্নয়ণ ত্বরান্বিত করা সম্ভব। এ কারণেই নারী অধ্যয়ন খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
৩. নারী ক্ষমতায়ন : বাংলাাদেশের নারী সমাজ পুরুষের তুলনায় এখনো অনগ্রসর। কেবল পার্লামেন্টের সংরক্ষিত নারী আসনই নারী ক্ষমতায়নের দৃষ্টান্ত হতে পারে না। পুরোপুরি নারী ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে হলে পরিবার; সমাজ ও রাষ্ট্রে নারীর ভূমিকা আরো বাড়াতে হবে। নারী ক্ষমতায়নের এ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা এবং নারীর ক্ষমতায়নের পথে প্রতিবন্ধকতাসমূহ দূর করার লক্ষ্যে বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে নারী অধ্যয়ন খুবই জরুরি।
৪. নির্যাতন প্রতিরোধ : নারীনির্যাতন বাংলাদেশের নারী সমাজের জন্য একটি অভিশাপ। আমাদের সমাজে প্রতিনিয়তই নারীনির্যাতন হচ্ছে। শারীরিক, মানসিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ইত্যাদি ধরনের নারীনির্যাতন লক্ষ্য করা যায়। তবে অধিকাংশ নারীনির্যাতন হয়ে থাকে যৌতুক সংক্রান্ত কারণে। এছাড়া এসিড নিক্ষেপ, রাস্তাঘাটে নারীরা ইভটিজিং এর শিকার হয়ে থাকে, ধর্ষিত হয়ে থাকে। নারী নির্যাতনের কারণসমূহ চিহ্নিতকরণ ও সমাধানের উপায় জানার জন্য নারী রাজনীতি অধ্যয়ন আবশ্যক। আর এজন্য চবাংলাদেশের প্রেক্ষিতে নারী অধ্যয়ন খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
৫. জেন্ডার বৈষম্য দূর করা : নারীদের অনগ্রসরতার আর একটি অন্যতম কারণ হলো জেন্ডার বৈষম্য। বাংলাদেশের সংবিধানে স্পষ্ট করে বলা আছে যে, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গভেদে নাগরিকদের মাঝে কোন প্রকার বৈষম্য করা যাবে না, কিন্তু নারী সম্পর্কে সমাজে বিদ্যমান নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি যেমন- নারী দুর্বল, হীন, পুরুষের অধস্তন, মেধাহীন ইত্যাদি নারী-পুরুষের বৈষম্য বাড়িয়ে দেয়। নারী অধ্যয়নের মাধ্যমে একাডেমিকভাবে জেন্ডার বৈষম্যের কারণ, ক্ষতিকর প্রভাবসমূহ জানা যায়। বাংলাদেশে নারী ও রাজনীতি অধ্যয়ন অত্যন্ত জরুরি।
৬. ইতিবাচক সামাজিকীকরণ : আজকে নারীর যে অধস্তনত লক্ষ্য করছি তা হাজার বছরের সামাজিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ফল। দীর্ঘদিন যাবৎ অধস্তন থাকার ফলে আমরা লক্ষ্য করছি যে নারী উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে শুধু পুরুষই নয় বরং অনেক নারীও নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করে। এর মূল কারণ নেতিবাচক সমাজিকীকরণ। নারী ও রাজনীতি অধ্যয়নের ফলে এই নেতিবাচক সামাজিকীরকণের প্রভাব দূর করে ইতিবাচক সামাজিকীকরণ করা সম্ভব। তাই বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে নারীর ইতিবাচক সামাজিকীকরণের লক্ষ্যেই নারী ও রাজনীতি অধ্যয়ন জরুরি।
৭. সামাজিক নিরাপত্তা : সামাজিক নিরাপত্তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সামাজিক নিরাপত্তার সাথে অন্যান্য নিরাপত্তা জড়িত। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতৈ নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে হলে সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে ধর্ষণ, রাহাজানি, শ্লীলতাহানী< অবাধে রাস্তাঘাটে চলাচল ইত্যাদি বন্ধ না হলে নারী গৃহের বাইরে যেতে পারের না। তাই নারী অধ্যয়নের মাধ্যমে এ বিষয় বিস্তারিত জানা যাবে না নারীর জন্য সামাজিক নিরাপত্তার বেষ্টনী তৈরিতে সহায়তা করবে।
৮. মাতৃস্বাস্থ্য সুরক্ষা : সুস্থ মা দিতে পারে সুস্থ সন্তানের নিশ্চয়তা আমাদের দেশে অধিকাংশ নারী বাচ্চা প্রসবকালীন সময় বা মাতৃত্বজনিত জটিলতায় মারা যান। আবার কোন কোন মা মাতৃজনিত মাারাত্মক রোগ বহন করে চলছেন সারাজীবন। এর ফলে নবজাতক শিশুর বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। শুধু তাই নয়< এর প্রভাব পড়ছে পুরো পরিবারের উপর। তাই এ অবস্থা থেকে নারীকে সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনের নিশ্চয়তা দিতে পারে বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে নারী ও রাজনীতি অধ্যয়ন খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
৯. নারী শিক্ষা নিশ্চিত করা : নারী উন্নয়নের পূর্বশর্ত হলো নারী শিক্ষা। নারীকে যথাযথ ভাবে শিক্ষিত করা না গেলে নারীদের মধ্যে সচেতনতা জাগ্রত করা যাবে না। বাংলাদেশে নারী শিক্ষার পথে ব্যাপক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। যেমন- পারিবারিক নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি, ধর্মীয় গোড়ামি, মৌলবাদ, দারিদ্র্য ইত্যাদি। নারী অধ্যয়নের মাধ্যমে নরী শিক্ষার পথে এসব প্রতিবন্ধকতাসমূহ চিহ্নিত করা যায় এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে নারী শিক্ষা নিশ্চিত করা যেতে পারে।
১০. নারী উন্নয়ন ও দাতা সংস্থার ভূমিকা : নারী ক্ষমতায়ন দাতাগোষ্ঠী ও বিভিন্ন এনজিও’র অন্যতম লক্ষ্য। অধিকাংশ দাতাগোষ্ঠী নারীকে টার্গেট গ্র“প হিসেবে বিবেচনা করে। বাংলাদেশে নারী উন্নয়নের লক্ষ্যে দাতাগোষ্ঠী ও এনজিও কর্তৃক গৃহীথ বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে এবং বর্তমানে বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। এসব প্রকল্পে নারী উন্নয়ন ও ক্ষমতায়ন হচ্ছে বলে দাবি করা হয়। নারী অধ্যায়নের মাধ্যমে এসব দাবির সত্যতা যাচাই করা যেতে পারে।
 
পরিশেষে বলা যেতে পারে যে, বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ। এ দেশটির উন্নয়নের সকল ক্ষেত্রে নারীকে সম্পৃক্ত করতে পারলে সত্যিকার অর্থেই এখানে সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করা যাবে। নারীকে সম্পৃক্ত করে বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়ণ গতিশীল করতে নারী ও রাজনীতি অধ্যয়ন অতীব গুরুত্বপূর্ণ।

 

 ৩৩ তম বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা)

Sunday, April 4, 2021

নারীর উপর বিশ্বায়নের প্রভাব

বিশ্বায় পুজিতন্ত্রায়নেরই একটি নতুন রূপ। এটি বর্তমান বিশ্বব্যবস্তার একটি অন্যতম প্রক্রিয়াও বটে। বস্তুত, আমরা যে সমাজে বাস করছি, সে সমাজে সকল সামাজিক প্রক্রিয়া বিশ্বায়ন দ্বারা প্রভাবিত ও পরিচালিত। মূলত আজকের বিশ্বে পুর্জি প্রযুক্তি ও শ্রমের অবাধ প্রবাহ বিশ্বায়ন নামে পরিচিত। আমাদের জীবনের সকল স্তরেই বিশ্বায়নের প্রভাব রয়েছে। নারীর উপর বিশ্বায়নের নানা প্রভাব বিদ্যমান।
বিশ্বায়ণঃ
সাধারণভাবে বিশ্বায়ন বোঝাতে ৩টি ধারণা ব্যাখ্যা করা হয়। এগুলো হলো :
i. Cros border relations.
ii. Open border relations.
iii. Trans border relations.
প্রামাণ্য সংজ্ঞাঃ বিভিন্ন চিন্তাবিদ বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে বিশ্বায়নে সংজ্ঞা প্রদান করেছেন। নিম্নে তাদের প্রদত্ত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংজ্ঞা উল্লেখ করা হলোঃ
অনিতা রডিস এর মতে, “অর্থনৈতিক উদারনীতিকরণ, যেমন-নিয়ন্ত্রণমূক্তকরণ, বেসরকারিককরণ এবং অধিকতর মুক্ত বাণিজ্য ও বিনিয়োগের মাধ্যমে বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্তার সাথে সংহতিকরণকে বিশ্বায়ণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।”
অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আইয়ুব রহমান ভুইয়া বলেছেন, “বিশ্বায়ণ বলতে বাণিজ্য উদারীকরণ, যেমন নিয়ন্ত্রণমুক্ত করণ, বেসরকারিকরণ ও বিশ্ব অর্থনীতিতে মুক্ত ও অবাধ বাণিজ্য বুঝায়।”
জার্মান অর্থনীতিবিদ জর্জ শেল বলেছেন, “Globalization is the benchmarking for economic activities in which the standards in profit making is the deciding factor.” অর্থাৎ বিশ্বায়ন হলো মুনাফা সর্বোচ্চকরণের জন্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যা দেশের সীমানার অভ্যন্তরে বা বাইরে যে কোন স্থানে পরিচালিত হতে পারে।
নারীর উপর বিশ্বায়নের ইতিবাচক প্রভাবঃ
নিম্নে নারীর উপর বিশ্বায়নের ইতিবাচক প্রভাব আলোচনা করা হলোঃ
১. নারীমুক্তি আন্দোলনের অভ্যুদয় ও বিকাশঃ নারী মুক্তি আন্দোলনের অভ্যুদয় ও বিকাশ বিশ্বায়ন গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা। পালন করেছে। পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ নারীর প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বিশ্বায়ন গুরুত্বপূর্ণূ ভূমিকা পালন করেছে। বিশ্বায়নের প্রভাবেই নারীবাদী আন্দোলন ক্রমশ বৈশ্বিক রূপ লাভ করে এবং পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে।
২. নারীর অধিকার ও মর্যাদার স্বীকৃতিঃ সারা বিশ্বে নারীর অধিকার ও মর্যাদা আদায়ের জন্য যে বিভিন্ন রকম সংগ্রাম ও আন্দোলন হয়েছে তাকে যৌক্তিক করে তুলেছে বিশ্বায়ণ। বিশ্বায়নের ফলেই জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে নারী অধিকার স্বীকৃত হয়েছে।
৩. আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলনঃ বিশ্বায়নের ফলে নারীমুক্তি আন্দোলন আজ আন্তর্জাতিক রূপ লাভ করেছে। ফলে আন্তর্জাতিকভাবে নারী উন্নয়নের বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। এক্ষেত্রে আন্তর্ঝাতিক সংগঠন, বিশ্বব্যাংক, বিশেষ করে জাতিসংঘ সবচেয়ে বেশি ভূমিকা পালন করছে।
৪. নতুন নতুন তত্ত্ব ও ধারণার উদ্ভবঃ বিশ্বায়নের ফলে নানা নতুন তত্ত্বের পাশাপাশি নারীবাদী বিভিন্ন তত্ত্বের উদ্ভব ঘটেছে। যেমন উদার নারী বাদী, মৌলিক নারীবাদী, সমাজতান্ত্রিক নারীবাদী< সাংস্কৃতিক নারীবাদী, পরিবেশ নারীবাদী প্রভৃতি। এসব তত্ত্ব বিশ্বব্যাপী প্রচার হওয়ার ফলে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তণ ঘটছে এবং নারীর উন্নয়ন সাধন হচ্ছে।
৫. নারীর ক্ষমতায়ন ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধিঃ বিশ্বায়নের প্রভাব সারা বিশ্বে নারীর ক্ষমতায়ন বৃদ্ধি পেয়েছে এবং নারীরা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করছে। তারা স্থানীয় ও রজাতীয় নির্বাচনেও অংশ নিচ্ছে।
৬. নারী শিক্ষার হার বৃদ্ধি পাচ্ছেঃ বিশ্বায়নের ইতিবাচক প্রভাবের ফলেই সারা বিশ্বে নারী শিক্ষার হার বৃদ্ধি পেয়েছে। নারী শিক্ষাকে উৎসাহিত করার জন্য উপবৃত্তি, বিনা বেতনে পড়ার সুযোগ ইত্যাদি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এটি নারী শিক্ষাকে ত্বরান্বিত করতে সাহায্য করছে।
নারীর উপর বিশ্বায়নের নেতিবাচক প্রভাবঃ
নারীর উপর বিশ্বায়নের নেতিবাচক প্রভাব বেশ মারাত্মক। এর ফলে নারীর ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবন মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নিম্নে এর নেতিবাচক প্রভাব আলোচনা করা হলোঃ
১. সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও বিভ্রাস্ত নারীঃ বিশ্বায়নের নেতিবাচক প্রভাবের ফলে বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতি আমাদের দেশের সংস্কৃতির উপর নেতিবাচক প্রভাব র্ফেলছে। সংস্কৃতি ও নারীর সাথে নিবিড় সম্পর্ক থাকে। বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতির অনুপ্রবেশের কারণে সন্তানের লালন-পালনের ক্ষেত্রৈ দ্বান্দ্বিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় এবং নারী বিভ্রান্তিতে পড়ে। ফলে তার মধ্যে এক ধরনের সংকট তৈরি হয়, যা তার জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে।
২. পুরষতন্ত্রের ভিত্তিকে দৃঢ় করেঃ বিশ্বায়ন হলো পুজিবাদের উপজাত। আর পুজিবাদ এর সাথে পুরূষতন্ত্রের সম্পর্ক নিবিড়। পুজিবাদ পুরুষতন্ত্র উবয় শোষণের মাধ্যমে নিজের অবস্তান অব্যাহত রাখতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। পুরষতন্ত্রের ভিত্তি সুদৃঢ় হবার ফলে নারীরা গৃহে আবদ্ধ হয়ে পড়ে।
৩. পরিবেশ বিপর্যয় ও নারীঃ বিশ্বায়নের ফলে যততত্র নগরায়ন হচ্ছে এবং শিল্পায়ন ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে নানা কলকারখানা গড়ে উঠছে এবং পরিবেশ বিপর্যয় দেখা দিচ্ছে। বিভিন্ন প্রতিকূল পরিবেশে নারীরা নিজের জীবন রক্ষা করতে পারছে না। শিল্পায়নে নেতিবাচক প্রভাবে শিল্প ও প্রযুক্তির ব্যাপক বিকাশ হচ্ছে র্ফলে ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পের বাজার দখল করে নিয়েছে শিল্পায়িত বিভিন্ন সামগ্রী। এর ফলে তার জীবনযাপন দুঃসাধ্য হয়ে উঠেছে।
৪. হস্ত ও কুটিরশিল্পায়নঃ বিশ্বায়নের নেতিবাচক প্রভাবে শিল্প ও প্রযুক্তির ব্যাপক বিকাশ হচ্ছে। ফলে ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পের বাজার দখল করে নিয়েছে শিল্পায়িত সামগ্রী। এতে নারী তার কর্মসংস্থান হারাচ্ছে এবং পরিবারে তার আয়ের যোগান দেয়া সম্ভব হচ্ছে না।
৫. কৃষিতে নারীর ভূমিকা হ্রাসঃ বিশ্বায়নের ফলে কৃষিকাজেও নারীর ভূমিকা হ্রাস পেয়েছে। বীজ সংগ্রহ চারা উৎপাদন ফসল মাড়াই প্রভৃতি ক্ষেত্রে বিভিন্ন যন্ত্রপাতির আবিষ্কার হওয়ার ফলে কৃষিক্ষেত্রে নারীকে আর তেমন প্রয়োজন হয় না। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নারীকে এসব কার্মকাণ্ড থেকে অব্যাহতি দিয়েছে।
৬. যুদ্ধ, জাতিগত সংঘর্ষ ও নারীঃ বিশ্বায়নের নেতিবাচক প্রভাবের কারণে বিশ্বব্যাপী একক সংস্কৃতি পরিমণ্ডল তৈরি করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু এ প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয় যখন ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলো টিকে থাকার জন্য সংগ্রাম করে। এর ফলে পুরুষেরা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে এবং নারীরা অরক্ষিত থেকে যায়। ফিলিস্তিন ও কাশ্মীরে বিধবা নারীর সংখ্যা প্রতিনিয়তই বাড়ছে।
৭. গণমাধ্যম ও নারীঃ বিশ্বায়নের নেতিবাচক প্রভাবের ফলে বিভিন্ন পণ্যের গুণগত মান তুলে ধরার জন্য নারীকে অপ্রাসঙ্গিক ও অশালীনভাবে তুলে ধরা হচ্ছে। ফলে এর নেতিবাচক প্রভাব নারীর উপর পড়ছে।
 
পরিশেষে বলা যায়, বিশ্বায়নের নানা ইতিবাচক প্রভাব নারীর উপর রয়েছে। বিশ্বায়নের ফলেই নারী মুক্তি আন্দোলন সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে এবং নারী উন্নয়ণ সম্পর্কিত বিভিন্ন তত্ত্বের উদ্ভব হয়েছে। বিশ্বায়নের ইতিবাচক প্রভাবের সাথে সাথে এর কিছু নেতিবাচক প্রভাব নারীর উপর বিদ্যমান। বিশ্বায়নের নেতিবাচক প্রভাব কখনই আমাদের জীবনে সুফল বয়ে আনতে পারে না। তাই এর নেতিবাচক দিকগুলোকে আমাদের পরিহার করতে হবে।
 


৩৩ তম বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা)

Wednesday, March 31, 2021

নারী উন্নয়নে জাতিসংঘের ভূমিকা

 পৃথিবীতে নারীর অবস্থান প্রায় পুরুষের সমান। কাউকে বাদ দিয়ে কারো অস্তিত্ব কল্পনা প্রায় অসম্ভব। কিন্তু নারীর এই অবদান সত্ত্বেও তারা অবহেলিত, বঞ্চিত ও নির্যাতিত। তাদের এই বঞ্চনার হাত থেকে রক্ষার জন্য জাতিসংঘ নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার পর থেকে নারীর উন্নয়নে যে সকল পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, তাহলো-

১। নারীর মর্যাদা সংক্রান্ত কমিশন গঠনঃ জাতিসংঘ ১৯৪৮ সালে নারীর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক মর্যাদা সম্পর্কিত কমিশন গঠন করে।

২। নারী পাচারের বিরুদ্ধে উদ্যোগঃ জাতিসংঘ ১৯৪৯ সালে মানুষ পাচার দমন ও পতিতাবৃত্তির মাধ্যমে শোষণের অবসানের জন্য সনদ অনুমোদন করে।

৩। সমান মজুরি নির্ধারণঃ জাতিসংঘ ১৯৫১ সালে নারী-পুরুষের সমান কাজের জন্য সমান মজুরি নির্ধারণের জন্য আই এল ও সনদ স্বাক্ষর করে। এর ফলে বিশ্বে নারী-পুরুষ সমান মজুরি লাভের অধিকারি হয়।

৪। রাজনৈতিক ও ভোটাধিকারঃ জাতিসংঘ ১৯৫২ সালে নারীর রাজনৈতিক অধিকার অনুমোদন করে। এ সনদে প্রথমবারের মতো নারীর ভোটাধিকারের স্বীকৃতি লাভ করে।

৫। জাতীয়তা সম্পর্কিত সনদঃ জাতিসংঘে ১৯৫৭ সালে নারীর জাতীয়তা সম্পর্কিত সনদ গৃহিত হয়। এ সনদে স্বামীর কার্যক্রম নির্বিশেষে নারীর জাতীয়তা সংরক্ষণ বা পরিবর্তন করার অধিকার প্রদান করা হয়।

৬। বিবাহ সম্পর্কিত অধিকারঃ জাতিসংঘ ১৯৬২ সালে বিবাহের ক্ষেত্রে সম্মতি, বিয়ের নূন্যতম বয়স ও বিয়ে রেজিস্ট্রিকরণ সম্পর্কিত সনদ অনুমোদন করে।

৭। ইউনেস্ক সনদ গৃহিতঃ বিশ্বব্যাপী বালিকা ও মহিলাদের শিক্ষা ক্ষেত্রে সমানাধিকার ও সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টির লক্ষ্যে ১৯৬২ সালে জাতিসংঘ সনদ গৃহিত হয়।

৮। নারীর বিরুদ্ধে সকল প্রকার বৈষম্য দূরীকরণ ঘোষণাঃ জাতিসংঘ ১৯৬৭ সালে নারীর বিরুদ্ধে সকল প্রকার বৈষম্য দূরীকরণের পদক্ষেপ গ্রহণ করে এবং ১৯৭৯ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ কর্তৃক নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ সনদ (সিডও) গৃহিত হয়।

৯। বিশ্ব নারী সম্মেলনঃ জাতিসংঘ ১৯৭৫ সালে বিশ্ব নারী সম্মেলন আয়োজনের মধ্য দিয়ে নারী উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে। আজ পর্যন্ত বিশ্বে ৪টি বিশ্ব নারী সম্মেলন এবং অনেকগুলো কনভেনশন অনুষ্ঠিত হয়েছে।

১০। নারী দশক ঘোষণাঃ জাতিসংঘ ১৯৭৫ সালকে আন্তর্জাতিক নারী বর্ষ এবং ১৯৭৬-৮৫ সময়কালকে নারী দশক হিসাবে ঘোষণা করে। এর মাধ্যমে নারীদের অগ্রগতি পর্যালোচনার কথা জোরালোভাবে চিন্তা করা হয়।

এভাবেই জাতিসংঘ তার প্রতিষ্ঠার পর থেকে নারীর উন্নয়নে নানামুখী পদক্ষেপ নিয়ে আসছে, যা এখনো চলমান আছে। এর ফলেই বর্তমান বিশ্বে নারীর অবস্থান অনেক উন্নত হয়েছে।

  (মোঃ হেলাল উদ্দিন, ৩৩ তম বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা)

Monday, March 1, 2021

নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ -- ফারজানা মাহমুদ

ফারজানা মাহমুদফারজানা মাহমুদ

নারীর ক্ষমতায়ন এমন একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে নারীরা তাদের পূর্বের অবস্থান থেকে বেরিয়ে এসে নিজেদের যোগ্যতা ও অর্জনকে তুলে ধরতে পারেন এবং পরিবার, সমাজ বা গণজীবনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে নিজেদের সিদ্ধান্ত ও অবস্থানকে তুলে ধরেন। নারীর ক্ষমতায়ন মূলত অর্থনৈতিক ক্ষেত্র এবং রাজনৈতিক অবকাঠামোতে অংশগ্রহণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের একটি মাধ্যম বা উপায়, যার মাধ্যমে নারীরা নিজেদের মেধা ও যোগ্যতাকে প্রকাশ করতে পারেন এবং নিজেদের অধিকারগুলো আদায়ে সচেষ্ট হতে পারেন। নারীর ক্ষমতায়ন তখনই সম্ভব, যখন কোনও বাধা বা সীমাবদ্ধতা ছাড়াই নারীরা শিক্ষা, কর্মজীবন এবং নিজেদের জীবনধারায় পরিবর্তন আনার জন্য বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধাগুলো ব্যবহারের সুযোগ পান। নারীর ক্ষমতায়নই হচ্ছে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, রাজনৈতিক স্থিতাবস্থা ও সামাজিক পরিবর্তনের অন্যতম চাবিকাঠি।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন বাঙালি নারীদের ক্ষমতায়নের পথিকৃৎ। ১৯৬৭ সালে মহিলা লীগ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু নারীদের মূলধারার রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করার সুযোগ সৃষ্টি করে দেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্র ও গণজীবনের সব পর্যায়ে নারীদের সম অধিকারের নিশ্চয়তা দেওয়া হয় এবং নারী ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে রাষ্ট্রের বিশেষ বিধান প্রণয়নের ক্ষমতাও সংযোজন করা হয় (অনুচ্ছেদ ২৭ ও ২৮)। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শ অনুসরণ করেই বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পরপরই সব পর্যায়ে লিঙ্গ সমতা, নারীর উন্নয়ন এবং ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার জন্য অসংখ্য নীতিমালা ও আইন প্রণয়ন করেন এবং বাস্তবিক অর্থে সব পর্যায়ে তা সুসংহত ও কার্যকর করার জন্য নিরলসভাবে কাজ করেছেন।

শিক্ষায় নারীদের শতভাগ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তোলা, নারীবান্ধব কর্মপরিবেশ সৃষ্টি করা, আইন প্রণয়নের মাধ্যমে নারীদের সুরক্ষা ও অধিকার নিশ্চিত করা এবং রাজনীতিতে নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করার জন্য শেখ হাসিনার গৃহীত উদ্যোগ ও সাফল্য অভাবনীয়।

২০১৭-১৮ সালের অর্থবছরে জাতীয় বাজেটের ২৮ শতাংশ নারী উন্নয়নে বরাদ্দ ছিল, ২০১৮-১৯ সালে তা ২৯.৬৫ শতাংশে উন্নীত করা হয়। বর্তমানে প্রাথমিক পর্যায়ে নারী শিক্ষার্থীর হার ৯৯.৪ শতাংশ। সরকার বিনামূল্যে ৬-১০ বছর বয়সী সব শিশুকে প্রাথমিক শিক্ষা প্রদানের সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত বিনামূল্যে মেয়েরা পড়াশোনা করতে পারছে। মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ করা হয় এবং স্কুলে যেতে উৎসাহিত করতে মেয়েদের দেওয়া হয় বৃত্তি। সম্প্রতি সরকার ঘোষণা দিয়েছে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে বিনামূল্যে খাবার বিতরণ করা হবে এবং শিক্ষার্থীরা এককালীন ২০০ টাকা পাবে স্কুলের পোশাক তৈরি করার জন্য।

নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে কোনও জামানত ছাড়াই সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা এসএমই ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। আবার নারী উদ্যোক্তারা বাংলাদেশ ব্যাংক ও এশিয়া উন্নয়ন ব্যাংক থেকে ১০ শতাংশ সুদে ঋণও নিতে পারছেন। বর্তমানে ৩০ লাখেরও বেশি নারী শ্রমিক পোশাক শিল্পে কর্মরত আছেন। সরকারের সপ্তম পঞ্চ বার্ষিক পরিকল্পনায় (২০১৬-২০২০) অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিতের অঙ্গীকার করা হয়েছে।

এছাড়া ব্যবসায়ে সমান সুযোগ তৈরি করার উদ্দেশ্যে ২০১১ সালে জাতীয় নারী নীতি গ্রহণ করা হয়। দুস্থ, অসহায় ও পিছিয়ে পড়া নারীদের জন্য বর্তমান সরকারের বহুমুখী প্রকল্প চালু আছে; এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—ভিজিএফ, ভিজিডি, দুস্থ ভাতা, মাতৃত্বকালীন ও গর্ভবতী মায়েদের ভাতা, অক্ষম মা ও তালাকপ্রাপ্তদের জন্য ভাতা, কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচি, আমার বাড়ি-আমার খামার ইত্যাদি। এছাড়া কর্মজীবনে নারীদের অংশগ্রহণকে সহজ করার লক্ষ্যে মাতৃত্বকালীন ছুটি ৪ মাস থেকে ৬ মাসে উন্নীত করা হয়েছে। প্রান্তিক নারীদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার জন্য খোলা হয়েছে গ্রামভিত্তিক কমিউনিটি ক্লিনিকের; মাতৃস্বাস্থ্য ভাউচার স্কিমের আওতায় গর্ভধারণ থেকে প্রসবকালীন সব খরচ, এমনকি যাতায়াত খরচও এখন সরকার বহন করে। যার ফলে মাতৃত্বকালীন মৃত্যুহার এখন প্রতি লাখে ১৭০ জন।

এছাড়া সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, সেনা, নৌ, পুলিশ, বিজিবি, সাহিত্য, শিল্পসহ সর্বোচ্চ বিচারিক কাজেও নারীদের অংশগ্রহণ ও সাফল্য এখন লক্ষণীয়।

আমাদের নারীরা খেলাধুলায়ও পিছিয়ে নেই। প্রথম নারী উপাচার্য, প্রথম নারী পর্বতারোহী, প্রথম বিজিএমইএ নারী সভাপতি, প্রথম সংখ্যালঘু নারী মেজর, প্রথম নারী স্পিকার, প্রথম নারী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিগত এক দশকেই সৃষ্টি হয়েছে। বলাবাহুল্য, নারীদের এই অভূতপূর্ব ক্ষমতায়নে অংশগ্রহণের সুযোগ ও অনুপ্রেরণার যিনি প্রথম ভাগীদার, তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

ভাষা আন্দোলন ও মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে সব আন্দোলন, সংগ্রাম ও দেশ গঠনে আমাদের নারীদের বিশাল ভূমিকা রয়েছে। তাই রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণকে সুসংহত করার জন্য জাতীয় সংসদে নারী আসনের সংখ্যা আরও পাঁচটি বাড়িয়ে ৫০টিতে উন্নীত করা হয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে অনেক নারীকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেও প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে ১২ হাজারের বেশি নারী জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করা হয়েছে। বর্তমান সংসদে নারী সদস্য আছেন ৭২ জন এবং বিরোধীদলীয় নেত্রী, স্পিকার, শিক্ষামন্ত্রীসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ পদে নারীদের আসীন করা হয়েছে এবং তারা দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।

নারীর প্রতি সব ধরনের সহিসংতা রোধে ২০১২ সালে প্রণয়ন করা হয় পারিবারিক সহিংসতা দমন ও নিরাপত্তা আইন ২০১২। নারীদের সুরক্ষা নিশ্চিতে প্রণয়ন করা হয় মানবপাচার প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১২, পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১১। বাল্যবিবাহ নিরোধ করে মেয়ে শিশুদের সমাজে অগ্রগামী করার জন্য বাল্যবিয়ে নিরোধ আইন ২০১৭ প্রণয়ন করা হয়েছে। এছাড়া মেয়েশিশুদের নিরাপত্তায় শিশু আইন ২০১৩ প্রণীত হয়েছে। হিন্দু নারীদের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষার্থে হিন্দু বিবাহ নিবন্ধন আইন ২০১২ প্রণয়ন করা হয়েছে। নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে সরকার জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে এবং ৭টি বিভাগে One stop crisis center খোলা হয়েছে।

ধর্ষণের আলামত সংগ্রহে ও পরীক্ষায় কিছু দিন আগেও Two finger test করা হতো, যা ধর্ষিতা নারীর প্রতি ছিল বৈষ্যমূলক ও অবমাননাকর। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই তা বাতিল করা হয়েছে। আশা করা যায় এরই ধারাবাহিকতায় অচিরেই Evidence Act 1872-এর ১৫৫ ধারা, যা ধর্ষিতা নারীর চরিত্র ও জীবনধারা নিয়ে প্রশ্ন করার এখতিয়ার প্রদান করে, সেই বৈষম্যমূলক, অমানবিক এবং নারীর প্রতি চরম অপমানসূচক ধারাটিকে শিগগিরই বাতিল করা হবে। এটি না হলে ধর্ষিতা নারীরা বিচার প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণে আগ্রহী হবে না এবং নারীর প্রতি বৈষম্য দূর ও নিশ্চিত হবে না।

সম্পত্তির উত্তরাধিকারে নারী পুরুষের সমান অধিকার নিশ্চিতের অঙ্গীকার করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আশা করা যায় এর আলোকে সংবিধানের ২৮(২) নং অনুচ্ছেদে যেখানে বলা হয়েছে ‘রাষ্ট্র ও গণজীবনে নারী পুরুষের সমান অধিকার লাভ করিবেন’, তা সংশোধন করে ‘রাষ্ট্র, গণজীবন এবং পারিবারিক জীবনে নারী পুরুষের সমান অধিকার লাভ করিবেন’ এই প্রত্যয় আমাদের মহান সংবিধানে সংযোজন করা হবে। পারিবারিক পরিমণ্ডলে নারীর সমান অধিকার নিশ্চিত করা না গেলে নারীকে পূর্ণভাবে স্বাবলম্বী করা বা সামাজিক ও গণজীবনে নারীর শতভাগ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা বাধাগ্রস্ত হবে।

নারী-পুরুষের সমতা অনুধাবনের অন্যতম মাপকাঠি হচ্ছে রাজনৈতিক ক্ষমতায় নারী-পুরুষের আনুপাতিক অবস্থান। রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে নারীর অংশগ্রহণের বিষয় বিবেচনায় বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে অষ্টম। আবার ১৩৬টি দেশের মধ্যে লিঙ্গ বৈষম্য নিরসনে বাংলাদেশের অবস্থান ৭৫তম, যা গত ১০ বছরে এগিয়েছে ১১ ধাপ (Global Gender Group Report 2013, World Economic Forum)। নারীরা তাদের মেধা, শ্রম, সাহসিকতা, শিক্ষা ও নেতৃত্ব দিয়ে আমাদের দেশ গঠনে কাজ করে যাচ্ছেন এবং একই সঙ্গে ভূমিকা রাখছেন একটি স্বাবলম্বী শিক্ষিত প্রজন্ম গঠনে। নানা অর্থনৈতিক, সামাজিক, প্রাকৃতিক প্রতিকূলতা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশে যে অভাবনীয় আর্থিক সমৃদ্ধি, উন্নয়ন ও প্রবৃব্ধি অর্জন সম্ভব হয়েছে, তা মূলত নারীর ক্ষমতায়ন ও অগ্রগতির জন্যই, আর এক্ষেত্রে যার অবদান অনস্বীকার্য, তিনি রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা। নারী উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নে তার অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি গ্লোবাল উইমেন্স লিডারশিপ, প্ল্যানেট ফিফটি ফিফটি চ্যাম্পিয়ন, এজেন্ট অব চেঞ্জসহ নানাবিধ সম্মাননা অর্জন করেছেন। তার সব অর্জন বাংলাদেশের নারীদের যেমন গর্বিত করে, তেমনি আশার আলো দেখায় পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে বৈষম্যহীন-সম্মানজনক অবস্থানে উন্নীত হয়ে দেশ গঠনে অংশগ্রহণে।

 

Bangla Tribune

লেখক: (ব্যারিস্টার-অ্যাট-ল) অ্যাডভোকেট, সুপ্রিম কোর্ট, বাংলাদেশ।। প্রধান নির্বাহী, বাংলাদেশ মানবাধিকার ও পরিবেশ আন্দোলন।

নারীর ক্ষমতায়নের প্রতিবন্ধকতা ও চ্যালেঞ্জ -- রোকেয়া কবীর

ক্ষমতায়ন হচ্ছে মানুষের বস্তুগত, দৈহিক, মানবিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদের ওপর স্বনিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা, যার সঙ্গে দক্ষতার প্রশ্নটি জড়িত। কাজেই নারীর ক্ষমতায়ন বলতে এমন একধরনের অবস্থাকে বোঝায়, যে অবস্থায় নারী তার জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রতিটি ক্ষেত্রে স্বাধীন ও মর্যাদাকর অবস্থায় উন্নীত হতে পারে।

এটি একটি প্রক্রিয়া, যার মানে হল- একদিনে হঠাৎ করে কারও ক্ষমতায়িত হয়ে ওঠার সুযোগ নেই। এজন্য দীর্ঘ ও অব্যাহত উদ্যোগ দরকার হয়। নারীর ক্ষমতায়নের আওতাকে প্রধানত সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক- এই তিন ভাগে দেখানো হয়। আজকাল অবশ্য আইনগত, তথ্যগতসহ আরও কয়েক ধরনের ক্ষমতায়নের প্রসঙ্গ উঠে এলেও মোটা দাগে উল্লিখিত তিন ধরনের ক্ষমতায়নের আওতায়ই সব চলে আসে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশের অনেক অগ্রগতি হয়েছে। অগ্রগতি হয়েছে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নারীর ক্ষমতায়নসহ বিভিন্ন সামাজিক সূচকেও। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে অর্জনের মান নিয়ে নিকট অতীতেও কিছু প্রশ্ন ছিল, সম্প্রতি প্রশ্নটি আরও জোরালো হয়েছে।

এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি অবশ্য গুরুত্বের দিক থেকে মানের প্রশ্নের চেয়েও এগিয়ে। সেটি হল, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যকে নাগরিকদের মৌলিক অধিকার হিসেবে দেখার অবস্থা দিন দিন ফুরিয়ে যাচ্ছে কিনা।

বর্তমান অবস্থা চলতে থাকলে মানসম্পন্ন শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে প্রবেশাধিকার কেবল তারই থাকবে, যার পর্যাপ্ত অর্থসম্পদ আছে। বাণিজ্যিকীকৃত সেবা খাতের সামনে অধিকারের প্রশ্নটিই অপ্রাসঙ্গিক ও অবান্তর হয়ে পড়ে। সেটা বোঝা যায় এই তথ্যেও যে, চিকিৎসা খাতে ব্যয়ের ৬০ শতাংশই নাগরিকদের নিজেদের পকেট থেকে দিতে হয়।

এই সময়ে পরিবর্তন এসেছে নারীর অবস্থা ও অবস্থানেও। বর্তমানে সমাজের প্রায় সব খাতেই নারীর অংশগ্রহণ দৃশ্যমান হচ্ছে। শিক্ষার প্রাথমিক স্তরে মেয়েদের উপস্থিতি এখন শতভাগ। পোশাক শিল্পের কৃতিত্বের সিংহভাগই নারীর। স

ফল ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের বড় অংশই নারী। পাশাপাশি নারীর অংশগ্রহণ বাড়ছে সরকারি-বেসরকারি ও আধাসরকারি অফিস-আদালত, কলকারখানা, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল-ক্লিনিক এবং বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মতো আনুষ্ঠানিক কর্মস্থলেও।

সরকার পরিচালনায়, রাজনীতিতে, প্রশাসনে, সামরিক বাহিনীতে, আইনশৃঙ্খলা বিভাগেও নারীর অবস্থান ক্রমশ উজ্জ্বল হচ্ছে। এসব পরিবর্তনের ছাপ পড়েছে পথেঘাটেও। কারণ চার দেয়ালের বাইরে নারীর চলাফেরা এখন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

কিন্তু প্রশ্ন উঠছে। বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার ৫০ শতাংশই যেখানে নারী, সেখানে অগ্রগতি দৃশ্যমান হচ্ছে খুব অল্পসংখ্যক নারীর মধ্যেই। আমাদের সিংহভাগ নারীই এখনও এসব লক্ষণের বাইরে অবস্থান করেন, যাদের তথ্য ও শিক্ষায় অভিগম্যতা নেই, যাদের ‘পরবাসী’ হয়ে জীবনযাপন করতে হয়, যারা নিজের সিদ্ধান্তে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারেন না এবং নিজের বস্তুগত ক্ষমতার পরিসর স্বাধীনভাবে ব্যবহার করতে বাধাগ্রস্ত হন।

আগের বাক্যে ‘পরবাসী’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে সচেতনভাবে। কারণ মেয়েরা জন্মগ্রহণ করার পর থেকেই জানে সেটা তাদের বাপের বাড়ি, বিয়ের পর যায় শ্বশুরবাড়ি। এ সমাজে তারা এখনও নির্বিঘ্নে রাস্তাঘাটে একা চলতে পারে না, রাতে হোটেলে বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যেতে পারে না। এই অবস্থাটি স্বদেশে পরবাসী হওয়া নয় তো কী? এতে বোঝা যায় যে, এত উজ্জ্বলতা সত্ত্বেও নারীর ক্ষমতায়নের প্রশ্নে আমাদের এখনও অনেক হতাশার জায়গা রয়েছে, যেগুলো কাটিয়ে ওঠা না গেলে সময়ে অগ্রগতি ও অধোগতির নানা পরিসংখ্যান হাজির করা সম্ভব হলেও প্রকৃতপক্ষে নারীমুক্তি সম্ভব নয়।

বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়নের সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতাটি এখনও নারীবিরোধী নেতিবাচক সমাজ মনস্তত্ত্ব। আমাদের সমাজে এখনও এই ন্যারেটিভ জনপ্রিয় যে, নারীর প্রাথমিক কাজ ঘর-সংসার দেখে রাখা, স্বামী-শ্বশুরের খেদমত করা। যদিও এই দেখে রাখা ও খেদমত করার নামে নারীর কাঁধে বিপুল পরিমাণ মজুরিবিহীন কাজের ভার চেপে বসে।

এ দৃষ্টিভঙ্গির কারণে মেয়েদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরোনোর আগে-পরে শিক্ষায় ইতি টানতে হয় এবং বয়স হওয়ার আগেই বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয়। সম্প্রতি বাল্যবিয়ে বন্ধে আইন প্রণীত হয়েছে। কিন্তু আইনের চোখকে ফাঁকি দিয়ে নানা কারসাজি করে এখনও যে বাল্যবিয়ে হচ্ছে, তা ওই নারীর ক্ষমতায়নবিরোধী সমাজ মনস্তত্ত্বের কারণেই। ইউএনএফপির এপ্রিল ২০১৯-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশে বাল্যবিয়ে কমে এখন দাঁড়িয়েছে ৫৯ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ।

দুঃখজনকভাবে আমরা স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, বিশ্ববিদ্যালয় নির্বিশেষে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেই এখনও নির্যাতনমুক্ত করতে পারিনি, যা অনেক সময়ই প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যায়েই মেয়েদের শিক্ষা সমাপ্তির একটা অজুহাত হয়ে ওঠে।

যতক্ষণ আমরা এ নিশ্চয়তা দিতে না পারব যে, মেয়েরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নির্যাতনের শিকার হবে না, ততক্ষণ এই বাধা ডিঙানো মুশকিল হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নির্যাতনের যত সংবাদ আমরা গণমাধ্যমে দেখি, বিশেষজ্ঞরা বলেন, প্রকৃত ঘটনা তার চেয়েও বেশি। সব ঘটনা গণমাধ্যমে আসে না। সব ঘটনার ন্যায্য প্রতিবিধানও হয় না।

গত এপ্রিলে সোনাগাজীতে মাদ্রাসা অধ্যক্ষের হয়রানির বিরুদ্ধে অভিযোগ করায় পরীক্ষা চলা অবস্থায়ই অভিযোগকারী শিক্ষার্থী নুসরাতকে মাদ্রাসার ছাদে কেরোসিন দিয়ে পুড়িয়ে মারা হয়। এ ঘটনায় দেশব্যাপী যে আলোড়ন ওঠে তাতে বিচারের উদ্যোগ আশানুরূপ গতি পায়।

আমরা লক্ষ করি, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর (মাউশি) তখন নড়েচড়ে বসে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় যৌন হয়রানি প্রতিরোধে জরুরি ভিত্তিতে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠনের নির্দেশ দেয়া হয়।

প্রশ্ন হল, ২০০৯-এ দেয়া হাইকোর্টের স্পষ্ট নির্দেশনা সত্ত্বেও এ বিষয়টির গুরুত্ব বুঝতে শিক্ষা প্রশাসনের ১০ বছর লাগল কেন? বিষয়টি অতিশয় লজ্জাজনক শুধু নয়, অপরাধমূলকও। সরকারি প্রশাসনের নিজেরই যদি হাইকোর্টকে হাইকোর্ট দেখানোর অভ্যাস তৈরি হয়ে যায়, তাহলে অন্যরা উপেক্ষা করলে দোষ দেয়া যায় না।

শিক্ষা থেকে মাঝপথে কিশোরীদের ঝরে পড়ার আরেক কারণ স্কুল-মাদ্রাসায় মাসিক ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও সুবিধা না থাকা। ২০১৪ সালে প্রকাশিত বাংলাদেশ ন্যাশনাল হাইজিন বেজলাইন জরিপ অনুযায়ী, স্কুলগুলোয় প্রতি ১৮৭ জন শিক্ষার্থীর জন্য আছে মাত্র একটি টয়লেট।

অথচ সরকারি পরিপত্র অনুযায়ী প্রতি ৫০ জনের জন্য একটি টয়লেট থাকার কথা। জরিপ অনুসারে গ্রামীণ এলাকায় মাত্র ৪৩ শতাংশ স্কুলে উন্নত ও কার্যকর টয়লেট রয়েছে, শহর এলাকায় যা ৬৩ শতাংশ।

এ অব্যবস্থাপনার কারণে ৪০ শতাংশ মেয়ে শিক্ষার্থী তাদের মাসিককালে স্কুলে অনুপস্থিত থাকে। এতে তারা একদিকে যেমন ক্লাসে পিছিয়ে পড়ে, অন্যদিকে পরীক্ষায় ফলও খারাপ করে, যার চূড়ান্ত পরিণতি শিক্ষা থেকে ঝরে পড়া এবং বাল্যবিয়ের শিকার হওয়া।

এ ছাড়াও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন সুবিধার অপর্যাপ্ততার কারণে কিশোরীরা প্রজননতন্ত্রের নানা সংক্রমণেও ভোগে, যা তাদের শারীরিক-মানসিক বিকাশে এবং ক্ষমতায়নে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

গোটা বিশ্বেই অন্য মাধ্যমের পাশাপাশি তথ্যের জন্য আজকাল নারী-পুরুষ উভয়েরই অনলাইন মাধ্যমের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে বাংলা ভাষার অনলাইন কনটেন্ট বাংলাদেশের সমাজের মতোই নারীবিদ্বেষী ও নারীবিরোধী।

ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউবসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোয় এ চিত্র আরও ভয়াবহ। উন্মুক্ত মাধ্যম বলে যে কেউ যখন-তখন স্বনামে ও বেনামে অ্যাকাউন্ট খুলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে।

এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ব্যবহারকারীদের একটা বড় অংশ নারীর প্রতি অবমাননাকর তথ্য, শব্দ, ছবি, প্রতীক পোস্ট করে থাকে। যখন নারী ব্যবহারকারীরা কোনো কিছু পোস্ট করে, তখন সেখানে অধিকাংশ সময় যেসব মন্তব্য করা হয়, তার সিংহভাগ হয় আক্রমণাত্মক, অশ্লীল গালিপূর্ণ এবং অসংবেদনশীল, যা এখানে উল্লেখ করার মতো নয়।

নারী-পুরুষ যারাই এসবের প্রতিবাদ করেন, তারা আরও কঠিন আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হন। ফেসবুকের ইনবক্সগুলো প্রায়ই নারী ব্যবহারকারীদের জন্য একটা আতঙ্কের নাম। প্রেম ও শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের আবদার তো আছেই, এমনকি হামেশা তারা নারী ও পুরুষের যৌনাঙ্গের ছবি, পর্ন ক্লিপও পাঠিয়ে থাকে। সব মিলিয়ে সেখানে নিপীড়নমূলক যৌনতাভিত্তিক একটা সমাজের প্রতিচ্ছবিই যেন ফুটে ওঠে।

সাধারণ ব্যবহারকারীদের পাশাপাশি অনলাইনে ব্যবসা পরিচালনাকারী ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা নারীর ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি একই। তবে আশার কথা এই, বিরূপতার সঙ্গে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে দিন দিন নারী অনলাইনেও নিজেদের একটা পরিসর তৈরি করে নিতে পেরেছেন।

তারা সমানাধিকার ও সমমর্যাদার পক্ষে লড়াই-সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন, নানা মিথস্ক্রিয়ায় অংশ নিচ্ছেন। এক্ষেত্রে দৃঢ়চেতা ও অধিকারসচেতন নারী নিজেরা এবং নারীসহায়ক কিছু পুরুষই মাত্র সার্বিক অবদান রেখে চলেছেন, যেখানে কর্তৃপক্ষের কোনো ভূমিকা আদৌ আছে কিনা, এ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

বাংলাদেশে রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ কম নয়, তবে এই অংশগ্রহণের বেশিরভাগটাই কর্মী-সমর্থক পর্যায়ে। দলের সব পর্যায়ের কমিটিতে ৩৩ শতাংশ নারী অন্তর্ভুক্ত করার ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনের গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে শর্ত অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর ৯ বছর অতিক্রান্ত হলেও তেমন কোনো সুফল আসেনি।

এমনকি জাতীয় নির্বাচনে মনোনয়ন দেয়ার ক্ষেত্রেও নারী প্রার্থীদের উপেক্ষা করা হয় নির্বাচিত হতে পারবেন না এই অজুহাতে। যদিও গত নির্বাচনে প্রার্থীসংখ্যার তুলনায় বিজয়ী নারীর শতকরা হার বিজয়ী পুরুষের চেয়ে বেশি। ভবিষ্যতে আরও বেশি নারীকে যাতে মনোনয়ন দেয়া যায়, সেজন্য সমাজের পাওয়ার করিডোরে নারীর অভিগম্যতা বাড়াতে হবে। নারীর অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা অর্জনে অনুকূলতা তৈরি করতে হবে।

আর্থিক উপার্জনমূলক খাতে নারীর পদচারণা আনুষ্ঠানিক-অনানুষ্ঠানিক দুই ধরনের কর্মক্ষেত্রেই বাড়লেও বেশি বেড়েছে অনানুষ্ঠানিক খাতে। আনুষ্ঠানিক কর্মক্ষেত্রে নারীর উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ খুব বেশিদিনের কথা নয়। যেহেতু দেশে শিক্ষায় নারীর ব্যাপকভাবে এগিয়ে আসার ইতিহাসটিই মাত্র কয়েক দশকের, এর আগে পর্যন্ত এ খাতে নারীর অংশগ্রহণ খুবই কম ছিল।

সাম্প্রতিক দশকগুলোয় যারা উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করেছেন, তাদের একটা অংশ কোনো না কোনো আনুষ্ঠানিক কর্মক্ষেত্রে নিয়োজিত আছেন। এদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।

এক গবেষণায় জানা যায়, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত নারীর সংখ্যা মোট কর্মীর প্রায় ৬০ ভাগ, অর্থাৎ পুরুষের চেয়েও বেশি। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এ কথা খাটে।

যেহেতু অধিকাংশ নারীই এখানে প্রয়োজনীয় শিক্ষা গ্রহণ করার সুযোগ পান না এবং দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করেন, সেহেতু তাদের উপার্জনের প্রয়োজনে বাধ্য হয়েই অনানুষ্ঠানিক খাতে যুক্ত হতে হয়।

এ খাতে সাধারণত পড়াশোনা জানা থাকা বাধ্যতামূলক নয়। যেখানে দরকার হয়, সেখানেও কম থাকলেই চলে। ফলে এ খাতে কর্মরতদের মজুরিও খুব কম ও অনিয়মিত। কৃষিসহ অধিকাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে মজুরিবৈষম্যও চালু আছে।

প্রায়ই এখানে কোনো নিয়োগপত্র থাকে না, থাকে না নিয়মিত কাজ করার নিশ্চয়তাও। কাজ করতে হয় আট ঘণ্টার চেয়েও বেশি। এ খাতের কাজ চাকরি হিসেবে মর্যাদা পায় না। ফলে মজুরি ছাড়া শ্রম আইনের অন্য কোনো শর্ত, যেমন- ছুটি, শ্রমঘণ্টা, উৎসব ভাতা, চিকিৎসা ভাতা, অবসর ভাতা, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ইত্যাদির এখানে কোনো বালাই নেই। অ

নেক কর্মক্ষেত্রে, বিশেষ করে অনানুষ্ঠানিক কর্মক্ষেত্রে রয়েছে পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন সুবিধার অপর্যাপ্ততা, যা তাদের জন্য অস্বাস্থ্যকর। এদিকে আনুষ্ঠানিক-অনানুষ্ঠানিক নির্বিশেষে উভয় ধরনের কর্মক্ষেত্রেই যৌন নির্যাতনের আশঙ্কা এখনও একটি সমস্যা হিসেবে টিকে আছে। এই বাস্তবতা নারীকে বাড়ির বাইরে কাজ করতে আসার ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

অতি সম্প্রতি বিশেষ করে কলকারখানাভিত্তিক কাজে স্বয়ংক্রিয় মেশিনের ব্যবহার বাড়ছে, যা নারী কর্মীদের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে এসেছে। এটি অদক্ষ শ্রমিকদের ছাঁটাইয়ের আশঙ্কার সামনে ফেলছে। তাছাড়া দক্ষতার অভাবে নবাগতরাও এসব কাজে যুক্ত হতে পারছেন না।

পেশাজীবী নারীদের সিংহভাগকেই বাসস্থান ও কর্মস্থলে যাতায়াত করতে হয় গণপরিবহনে, যেখানে নিয়মিতভাবে তাদের যৌন হয়রানির শিকার হতে হয়। এসব অপরাধে যুক্ত থাকে একইসঙ্গে পুরুষ যাত্রী এবং পরিবহন শ্রমিকরা।

নারী যাতে নির্বিঘ্নে বাসে চলাচল করতে পারে, সেজন্য বিধি মোতাবেক কিছু আসন সংরক্ষণ করা হলেও প্রায়ই ওসব আসন দখল করে রাখে পুরুষ যাত্রীরা। তাছাড়া অধিকাংশ যাত্রী ও হেলপারের ধারণা, কেবল সংরক্ষিত আসনগুলোই নারী যাত্রীদের, এর বাইরে নারী বসতে পারবেন না। ফলে অনেক সময়ই নারী যাত্রীদের ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে গন্তব্যে পৌঁছতে হয়। তাতে তাদের হয়রানিমূলক মন্তব্য তো শুনতে হয়ই, এমনকি শরীরে হাত দেয়া, গায়ে ঠেস দিয়ে দাঁড়ানো, ইচ্ছাকৃতভাবে ধাক্কা দেয়া, চিমটি কাটা, কাঁধে হাত রাখার মতো ঘটনা

রও মুখোমুখি হতে হয়। হেলপাররাও প্রায়ই নারী যাত্রীদের বাসে উঠানো-নামানোর সময় সাহায্য করার ছলে সুকৌশলে শরীরে হাত দেয়, বিশেষ করে চলন্ত অবস্থায় যখন যাত্রী উঠানো হয়।

সম্প্রতি অ্যাকশনএইড বাংলাদেশ এবং ব্র্যাকের দুটি গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের শতকরা ৮৮ জন নারী রাস্তায় চলার পথে যৌন হয়রানিমূলক মন্তব্যের শিকার হন, যেখানে সিংহভাগ পারপেট্রেটরই গণপরিবহনের চালক ও হেলপাররা।

সম্প্রতি চালক ও হেলপারের দ্বারা বাসে দলগতভাবে ধর্ষণ ও হত্যার একাধিক ঘটনা ঘটেছে। এই সমস্যার স্থায়ী সমাধানে আজও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।

আমাদের দেশে নারীর উপার্জনমূলক কাজে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা হল গৃহকর্মের দায়িত্বের ন্যায্য বণ্টন না হওয়া। যেখানে স্বামী-স্ত্রী দু’জনই চাকরি করেন, সেখানেও বাড়িতে ফিরে নারীকেই সব দায়িত্ব সামলাতে হয়, যেটি অনেক সময় অমানবিক পর্যায়ে চলে যায়।

এতে তারা প্রয়োজনীয় বিশ্রাম ও বিনোদনের সুযোগ পান না। নিজেকে আরও যোগ্য করে তুলতে পড়াশোনা কিংবা সুকুমারবৃত্তির চর্চা করতে পারেন না।

দেশে কাজের স্বল্পতা ও স্বল্প পারিশ্রমিকের কারণে তরুণ বয়সী অনেক নারী অপেক্ষাকৃত ভালো জীবনের আশায় কাজের সন্ধানে প্রতি বছরই দেশের বাইরে যান। তারা যান প্রধানত গৃহকর্মী হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে।

২০ এপ্রিল প্রথম আলোতে প্রকাশিত এক সংবাদ সূত্রে জানা যায়, রিয়াদে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রম উইং থেকে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে সম্প্রতি পাঠানো এক চিঠিতে বলা হয়েছে, ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে এ বছরের মার্চ পর্যন্ত দেশে ফিরে এসেছেন মোট ২ হাজার ২২২ জন নারী গৃহকর্মী। চিঠিতে জানানো হয়, আরও অনেকেই দেশে ফেরার জন্য সেফহোমে অবস্থান করছেন এবং নতুন করে অনেকেই সেফহোমে আসছেন।

ফেরত আসাদের প্রায় প্রত্যেকেই ধর্ষণসহ নানা ধরনের শারীরিক-মানসিক নির্যাতনের শিকার, যাদের অনেকে ফিরেছেন অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায়। এই বিবরণ থেকে বোঝা যায় ২০১৫ থেকে এ পর্যন্ত গৃহকর্মী হিসেবে সৌদি আরবে যাওয়া মোট ২ লাখ ৩ হাজার নারী শ্রমিক কী অমানবিক পরিস্থিতিতে ওখানে ছিলেন এবং আছেন।

২০১৮ সালের ২৪ জুলাই বিবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত গোলাম মসীহ জানিয়েছেন, ‘সৌদি আরবে কাজ করতে গিয়ে ধর্ষণসহ নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার নারীর বেশিরভাগই নির্যাতনকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে আগ্রহী থাকেন না।

ফলে সৌদি সরকার কিংবা সেদেশে বাংলাদেশ দূতাবাসের কিছু করার থাকে না।’ এটা খুবই স্বাভাবিক যে, ভিনদেশে ধর্ষণের মতো ঘটনা ঘটার পর আশাভঙ্গের বেদনা নিয়ে অনিরাপদ অবস্থায় বিচারের আশায় কেউই দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে রাজি হবেন না।

কিন্তু এখনও যারা রয়ে গেছেন, তারা যাতে নির্যাতিত না হন, সে ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে কিনা, রাষ্ট্রদূত তা নিয়ে কিছুই বলেননি। তার এই দায়সারা মন্তব্যে এতজন নারীর ভবিষ্যৎ বিষয়ে আমাদের যথেষ্ট উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ থাকে। যতদূর জানি, রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ সৌদি আরব থেকে ফেরত আসা বিপর্যস্ত নারীদের কোনোই খোঁজ নেয়নি, যেটা খুবই আপত্তিকর।

আমরা মনে করি, নারী শ্রমিকদের বিদেশে পাঠানোর আগে তাদের যৌন ও শারীরিক নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা যাবে, সে ব্যাপারে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে কার্যকর কৌশল প্রণীত হওয়া দরকার। তাছাড়া, যে দেশে পাঠানো হবে,

সেদেশের ভাষা শিক্ষা থেকে শুরু করে নির্দিষ্ট কাজ বিষয়ে মৌলিক শিক্ষা, স্থানীয় সংস্কৃতি সম্পর্কে ধারণা প্রদান এবং কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলে কোথায়-কীভাবে সাহায্য চাইতে হবে সে ব্যাপারে প্রশিক্ষণ দেয়া আবশ্যক। আমরা যদি নারী কর্মীদের মাধ্যমে রেমিটেন্স আশা করি, তাহলে তাদের কল্যাণে প্রয়োজনীয় দায়িত্বও আমাদেরই নিতে হবে।

বাংলাদেশে এখনও নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক আইন, আইনের বিভিন্ন ধারা ও উপধারা বিদ্যমান। জাতিসংঘ কর্তৃক প্রণীত সিডও সনদের গুরুত্বপূর্ণ দুটি ধারা থেকে বাংলাদেশ এখনও সংরক্ষণ প্রত্যাহার করেনি, যে কারণে অভিভাবকত্ব ও উত্তরাধিকারের বিষয়গুলো এখনও বৈষম্যমূলক ধর্মভিত্তিক আইন দ্বারাই নিষ্পন্ন হয়।

নারীর মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য বৈষম্যমূলক এসব আইনের সংস্কার করা প্রয়োজন। এখন পর্যন্ত ধর্মভিত্তিক পারিবারিক আইন দিয়েই নির্ধারিত হচ্ছে অভিভাবক ও সন্তানের মধ্যে সম্পর্ক এবং উত্তরাধিকারসহ বিভিন্ন পারিবারিক বিষয়।

নারী-পুরুষ, ছেলে-মেয়ের মধ্যে কে বেশি অগ্রাধিকার পাবে, তা নির্ধারণ করে এসব আইন, যা স্পষ্টতই সংবিধান ও সর্বজনীন মানবাধিকার সনদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। শুধু তাই নয়, এসব আইনের প্রভাবে নারীকে জন্মলগ্ন থেকেই দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে বিবেচনা করা হয়; অধিকারে বৈষম্য ইত্যাদি ক্ষেত্রে।

বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়নের একটা বড় প্রতিবন্ধকতা উগ্রবাদী ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর নারীবিরোধী প্রচারণা। এই গোষ্ঠী ওয়াজ মাহফিল থেকে শুরু করে মসজিদের খুতবায়, ধর্মীয় তালিমে নারী ও ভিন্নধর্মাবলম্বীদের ব্যাপারে বিষোদ্গার প্রকাশে অক্লান্ত হলেও দেশে ঘটে চলা অব্যাহত নারী নির্যাতন, সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিরুদ্ধে কখনও টুঁ শব্দটিও উচ্চারণ করে না।

সম্প্রতি এরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও প্রভাব বিস্তার করেছে। ইউটিউবে ছেড়েছে অজস্র নারীবিরোধী ঘৃণ্য উক্তিতে ভরা ওয়াজের ক্লিপ, যেগুলো প্রায়ই ফেসবুকে শেয়ারও করা হয়। প্রতিনিয়ত এসব হেইটস্পিচ বা ঘৃণ্য প্রচারণার ফলে নারীবিরোধী পুরুষতান্ত্রিক মূল্যবোধ আরও জোরদার হচ্ছে। তাদের এসব প্রচারণা নারীর শিক্ষা ও চাকরির বিপক্ষে এবং বাল্যবিয়ের পক্ষে মানুষকে প্রভাবিত করে, যা সংবিধানের মূল চেতনাবিরোধী।

এমনকি এসব প্রচারণা পারিবারিক নির্যাতনকেও ইন্ধন দেয়। এই তৎপরতার ফলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থী পরিবেশ সৃষ্টিকারীরা ক্রমশ আরও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে। তাছাড়া গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যাল্প জনগোষ্ঠীর অধিকার, বৈচিত্র্যময়তা ও বহুত্ববাদী সংস্কৃতি এবং মুক্তচিন্তাবিরোধী এই শক্তিকে শক্ত হাতে প্রতিরোধ করা না গেলে ভবিষ্যতে আমাদের অনেক বিপর্যয়ের মোকাবেলা করতে হতে পারে।

নারীর ক্ষমতায়নের আরেক প্রতিবন্ধকতা প্রচারমাধ্যমে তাদের স্বল্প ও নেতিবাচক উপস্থাপন। একজন নবীন নারী যখন প্রতিনিয়ত এ ধরনের প্রচারণার সামনে পড়ে, তখন নিজেকে তার ভাইটির তুলনায় হেয় ভাবতে শুরু করে, যা তার ভবিষ্যৎ বিকাশের জন্য ক্ষতিকর।

২০১৪ সালে বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘকৃত এক গবেষণার আওতায় জাতীয় ও আঞ্চলিক মিলিয়ে ১০টি সংবাদপত্র, পাঁচটি টেলিভিশন চ্যানেল এবং একটি বেতার কেন্দ্রের ১৪ দিনের প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ থেকে মোট ৩,৩৬১টি সংবাদ প্রতিবেদন পরিবীক্ষণ করে দেখা যায়, মোট প্রচারিত সংবাদের মাত্র ১৪ শতাংশে নারীকে কাভার করা হয়েছে। আর সংবাদের বিষয় হিসেবে গ্রাম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের উপস্থিতি পাওয়া গেছে মাত্র ৭.২৩ শতাংশ। এতে নারীর কৃতিত্বের চেয়ে দুরবস্থার চিত্রই প্রধান হয়ে উঠেছে।

এখন পর্যন্ত আমাদের নারীদের সিংহভাগই গ্রামে বসবাস করে। কিন্তু গ্রামের উপস্থিতি গণমাধ্যমে কম থাকা মানে সিংহভাগ নারীর সমস্যা ও সম্ভাবনা উপেক্ষিত হওয়া। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী গ্রাম-শহরের বৈষম্য দূরীকরণে উদ্যোগ নেয়ার কথা বলেছেন, যা খুবই প্রশংসনীয়।

সেজন্য গ্রামকে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসতে হবে, যেখানে গণমাধ্যম বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। আমরা জানি, গ্রামাঞ্চলে এখনও আধুনিক জীবনযাপনের সুবিধা নেই।

সেখানে রাস্তাঘাট ও যানবাহনের সংকট রয়েছে, নারীর চলাচলের ওপর যার প্রভাব পড়ে। আজকাল পানির প্রাকৃতিক উৎসগুলো দূষিত হয়ে গেছে। পুকুর ও নদী থেকে আর নিরাপদ পানি পাওয়া যায় না।

এদিকে নলকূপের পানিতেও আর্সেনিকের উপস্থিতি। যেহেতু প্রয়োজনীয় পানি আহরণের দায়িত্ব নারীকেই পালন করতে হয়, সেহেতু এই বিরূপ পরিস্থিতি নারীকে আরও শ্রমঘন ও ক্লান্তিকর কাজে বাধ্য করে তাদের অধিকতর পশ্চাৎপদতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

আমরা জানি, প্রচেষ্টা চলমান থাকলেও অধিকাংশ গ্রামেই এখনও বিদ্যুৎ সুবিধা পৌঁছেনি। ফলে তারা টিভি-ফ্রিজ-ফ্যান চালাতে পারে না। এমনকি গ্রামাঞ্চলে গ্যাসের সরবরাহও নেই। কষ্ট করে লাকড়ি আহরণ করে রান্নার ভোগান্তি কমাতে গ্রামীণ নারীর রান্নাঘরে সুলভমূল্যে গ্যাস সরবরাহের কথাও আমাদের ভাবতে হবে।

অনেক সময় প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কমিউনিটি ক্লিনিক কাছাকাছি থাকলেও উচ্চবিদ্যালয়গুলো বাড়ি থেকে দূরবর্তী স্থানে অবস্থিত হয়, ফলে তারা তাদের মেয়েদের নির্বিঘ্নে স্কুলে পাঠাতে পারে না। গ্রামের অনেক নারীই কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত।

কিন্তু জমির মালিকানা না থাকায় তারা কৃষক হিসেবে স্বীকৃত হন না। ফলে কৃষকের জন্য সরকারি প্রণোদনামূলক সুবিধা থেকেও তারা বঞ্চিত হন। গ্রামীণ নারীর এসব সমস্যা দূর করায় আমাদের উদ্যোগ নিতে হবে।

গ্রামে নাগরিক সুবিধা পৌঁছানো গেলে গ্রামীণ নারী-পুরুষ যেমন অপেক্ষাকৃত ভালো জীবনযাপন করতে পারবে, তেমনি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও গ্রামে থাকতে রাজি হবেন। বর্তমান অবস্থায় যেটা সম্ভব হচ্ছে না।

মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা ছিল একটি বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণ। বাংলাদেশের সংবিধানেও এর প্রতিফলন আছে। কিন্তু ৪৮ বছরেও আমরা বৈষম্যহীন সমাজ নির্মাণে ব্যর্থ হয়েছি। সিডও সনদের শর্ত বাস্তবায়ন করতে হলেও নারী-পুরুষ বৈষম্য দূর করার কোনো বিকল্প নেই।

এদিকে ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জন করতে হলে অবশ্যই এর ৫ নম্বর লক্ষ্য (জেন্ডার সমতা এবং সব নারী ও কিশোরীর ক্ষমতায়ন) অর্জনে সাফল্য দেখাতে হবে। তা না হলে এসডিজির অন্য লক্ষ্যগুলোর অর্জন ব্যাহত হবে, যেহেতু দেশের ৫০ শতাংশ জনগোষ্ঠীই নারী। আশা করি, আমরা আমাদের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারগুলোর প্রতি যত্নবান হব।

তবে এ পর্যায়ে মনে রাখতে হবে, নারীর ক্ষমতায়নের জন্য কেবল নারীর নিজের যোগ্যতা, দক্ষতা, মানসিক শক্তি, ইত্যাদি বৃদ্ধি করাই যথেষ্ট নয়, পাশাপাশি অর্জিত যোগ্যতা, দক্ষতা ও শক্তি কাজে লাগানোর পরিবেশও তৈরি করতে হবে।

সেজন্য আইনগত, সামাজিক, রাজনৈতিকসহ সব ক্ষেত্রের প্রতিকূল পরিবেশকে অনুকূল পরিবেশে পরিণত করতে হবে। তাহলেই কেবল নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে আমরা অর্থপূর্ণ অগ্রগতি আশা করতে পারব।

 

jugantor

রোকেয়া কবীর : মুক্তিযোদ্ধা; নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘ