Showing posts with label প্রাচ্যের রাষ্ট্রচিন্তা. Show all posts
Showing posts with label প্রাচ্যের রাষ্ট্রচিন্তা. Show all posts

Thursday, July 3, 2025

কৌটিল্য এর ‘অর্থশাস্ত্র’-এ রাষ্ট্রনীতি -- মোঃ হেলাল উদ্দিন


ভূমিকা

প্রাচীন ভারতের রাষ্ট্রনীতি সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বহু মূল্যবান গ্রন্থ হল কৌটিল্যের ‘অর্থশাস্ত্র’। ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে ড. শ্যাম শাস্ত্রী সংস্কৃত ভাষায় লেখা এই গ্রন্থটি আবিষ্কার করেন। এই গ্রন্থটির রচয়িতা সম্পর্কে বিতর্ক থাকলেও অধিকাংশ পণ্ডিত মৌর্য সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের প্রধানমন্ত্রী কৌটিল্য বা চাণক্যকেই অর্থশাস্ত্রের রচয়িতা বলে স্বীকার করেছেন। তবে পণ্ডিতদের অনুমান বিভিন্ন যুগে গ্রন্থটি নানাভাবে পরিমার্জিত হয়েছে। অর্থশাস্ত্রের মূল বিষয়বস্তু রাষ্ট্রনীতি হলেও এই গ্রন্থটিতে মৌর্য যুগ তথা প্রাচীন ভারতের সমাজ, অর্থনীতি প্রভৃতি অন্যান্য বিষয়ও আলোচিত হয়েছে।

অর্থশাস্ত্রে রাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে ধারণা

অর্থশাস্ত্রে উল্লেখিত রাষ্ট্রনীতির বিভিন্ন দিকগুলি হল-দীপাশা

(1) শক্তিশালী ও বংশানুক্রমিক রাজতন্ত্র: অর্থশাস্ত্রে স্পষ্টভাবে উল্লেখ না-থাকলেও কৌটিল্য মূলত শক্তিশালী ও বংশানুক্রমিক রাজতন্ত্রকেই সমর্থন করেছেন। তাঁর মতে, রাজা উচ্চবংশজাত হওয়াই ব্যঞ্ছনীয়। কেন-না বংশকৌলীন্যের কারণে সহজেই তিনি প্রজাসাধারণের আনুগত্য ও ভক্তিশ্রদ্ধা অর্জন করতে সক্ষম হবেন।

(2) রাষ্ট্রের সপ্তাঙ্গ তত্ত্ব: কৌটিল্যের ‘অর্থশাস্ত্র‘-এ বলা হয়েছে যে, মানবদেহের ন্যায় রাষ্ট্রেরও বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আছে। কৌটিল্যের মতে, রাষ্ট্র মূলত সাতটি অঙ্গ দ্বারা গঠিত। এগুলি হল- (i) স্বামী (রাজা), (ii) অমাত্য (আমলা গোষ্ঠী), (iii) জনপদ (রাষ্ট্র), (iv) দুর্গ (পুর-নগর), (v) কোশ (অর্থভাণ্ডার), (vi) দণ্ড (শাস্তিবিধান), এবং (vii) মিত্র (বন্ধু রাজা বা রাষ্ট্র)। এই সাতটি অঙ্গ রাষ্ট্রের ‘সপ্তাঙ্গতত্ত্ব’ নামে পরিচিত।

(3) রাজার ক্ষমতা: কৌটিল্যের মতে, রাজা হলেন রাষ্ট্রের সর্বেসর্বা। অর্থাৎ তিনিই রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বা চূড়ান্ত ক্ষমতার অধিকারী। তাঁর কর্তৃত্ব ও আদেশকে উপেক্ষা বা অমান্য করার ক্ষমতা কারও নেই। তিনি রাষ্ট্রের সামরিক ও বেসামরিক শাসন এবং বিচারব্যবস্থার প্রধান। তবে অর্থশাস্ত্রে তাঁর অবাধ ও স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতাকে অবশ্য স্বীকার করা হয়নি। অর্থশাস্ত্রে, তাঁর সীমাহীন ক্ষমতার ওপর কিছু নিয়ন্ত্রণ আরোপের কথাও বলা হয়েছে। কৌটিল্যের মতে, রাজাই রাষ্ট্র নয়, তিনি এর অংশমাত্র।

(4) রাজার কার্যাবলি : কৌটিল্য অর্থশাস্ত্রে রাজার গুরুত্বপূর্ণ কার্যাবলি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। যথা- (ⅰ) কৌটিল্যের মতে, রাজার প্রধান কর্তব্য হল প্রজাদের জীবন ও সম্পত্তি রক্ষা করা। (ii) বহিঃশত্রুর আক্রমণ, নানা প্রাকৃতিক বিপর্যয়, রোগ-ব্যাধি, দস্যু-দুষ্কৃতীদের হাত থেকে প্রজাদের নিরাপত্তা বিধান করা। (iii) রাজার অন্যতম কাজ হল একটি সৎ ও দক্ষ প্রশাসন গড়ে তোলা। (iv) শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধে রাজাকেই নেতৃত্ব দিতে হবে। (v) বৈদেশিক আক্রমণ ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার স্বার্থে দুর্গ ও নগর নির্মাণ করা।

(5) রাজার গুণাবলি: কৌটিল্যের মতে, রাজাকে হতে হবে কূটনীতিপরায়ণ। সব ধরনের কাজের ক্ষেত্রেই রাজার মধ্যে থাকতে হবে উৎসাহ, উদ্দীপনা ও কর্মপ্রেরণা। রাজাকে হতে হবে সাহসী, ন্যায়পরায়ণ, ধর্মপরায়ণ, দৃঢ়চেতা, বিচক্ষণ ও সংযমী।

(6) সুদক্ষ আমলাতন্ত্র গঠন: কৌটিল্যের মতে, রাজার একার পক্ষে রাষ্ট্রশাসন পরিচালনা করা সম্ভব নয়। এজন্য তিনি বিভিন্ন মন্ত্রী, অমাত্য ও অন্যান্য রাজকর্মচারীদের নিয়োগ করবেন এবং আমলাতন্ত্রের সাহায্যে রাজা শাসন পরিচালনা করবেন।

(7) প্রজাকল্যাণকর রাষ্ট্র: কৌটিল্য তাঁর ‘অর্থশাস্ত্র’-এ প্রজাকল্যাণকর রাষ্ট্রব্যবস্থাকেই সমর্থন করেছেন। তাঁর মতে, রাজাকে হতে হবে প্রজাদরদি। প্রজাসাধারণের মঙ্গলসাধন করাই তাঁর অন্যতম প্রধান কর্তব্য। নিজের সুখের থেকেও প্রজার সুখ রাজার কাছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেছেন, “প্রজার সুখেই রাজার সুখ, প্রজার হিতে (মঙ্গল) রাজার হিত” (প্রজাসুখে সুখং রাজ্ঞঃ প্রজানাং চ হিতে হিতম্)।

(8) বিচার ও আইনব্যবস্থা: রাজাই হলেন রাষ্ট্রে বিচার বিভাগের সর্বেসর্বা। রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং অপরাধীকে দণ্ড বা শাস্তিদান করা রাজার অন্যতম কর্তব্য বলে কৌটিল্য অর্থশাস্ত্রে উল্লেখ করেছেন। রাষ্ট্রের প্রয়োজনে কঠোর আইন প্রণয়ন ও দণ্ডদানের পক্ষেই তিনি মত দিয়েছেন।

(9) রাজস্বব্যবস্থা : কৌটিল্য অর্থশাস্ত্রে বলেছেন যে, সুষ্ঠুভাবে শাসন পরিচালনার জন্য রাজকোশ সমৃদ্ধ হওয়া দরকার। কেন-না, দুর্বল বা শূন্য রাজকোশ রাজা ও প্রজার উভয়েরই দুর্গতির অন্যতম মূল কারণ। তাই রাজস্ব নির্ধারণ, রাজস্ব সংগ্রহ ও বৃদ্ধির ব্যাপারে রাজাকে সর্বদাই নজর রাখতে হবে। রাষ্ট্রের রাজস্ব বৃদ্ধির জন্য রাজাকে কৃষি, শিল্প ও ব্যাবসাবাণিজ্যের উন্নতির ব্যাপারে উদ্যোগী হতে হবে। অর্থশাস্ত্রে তিনি সীতা, ভাগ ও বলি নামে তিনপ্রকার করের কথা উল্লেখ করেছেন।

(10) গুপ্তচর ব্যবস্থা: মৌর্য শাসনব্যবস্থা আলোচনা প্রসঙ্গে কৌটিল্য গুপ্তচর ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করেছেন। কৌটিল্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে ও বাইরে নানা খবরাখবর সংগ্রহের জন্য রাজাকে গুপ্তচর নিয়োগের পরামর্শ দিয়েছেন।

(11) ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থা: কৌটিল্য রাষ্ট্রের আধ্যাত্মিক বা ধর্মীয় বিষয়ে পুরোহিতের কর্তৃত্বকে কৌটিল্য মেনে নিলেও রাজার ক্ষমতাকে প্রভাবিত বা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা পুরোহিতের নেই। এমনকি পুরোহিত অপরাধ করলে তিনি তাঁদের চরম শাস্তির বিধান দিয়েছেন। বিচারক ও রাজকর্মচারীদের নিয়োগের আগে তাদের ধর্মনিরপেক্ষতাকে যাচাই-এর পরামর্শ দিয়েছেন।

উপসংহার

সবশেষে বলা যায় যে, মৌর্য যুগ তথা প্রাচীন ভারতের রাষ্ট্রনীতি চর্চার সর্বাপেক্ষা নির্ভরযোগ্য এবং অন্যতম শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ হল কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র। এই গ্রন্থে প্রাচীন ভারতের রাষ্ট্রনীতি সংক্রান্ত নানা বিধিব্যবস্থা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে। ঐতিহাসিক আলতেকর বলেছেন যে, কৌটিল্য রাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে একটি নতুন ধারার প্রবর্তন করেছিলেন। আবার অনেকে মনে করেন, আধুনিক রাষ্ট্রনীতি চর্চায় ম্যাকিয়াভেলির যে স্থান, প্রাচীন যুগের রাষ্ট্রনীতি চর্চায় কৌটিল্যের স্থানও অনুরূপ। তাই কৌটিল্যকে অনেকেই ‘ভারতের ম্যাকিয়াভেলি’ বলে অভিহিত করেন। 

আল ফারাবীর রাষ্ট্রের উৎপত্তি মতবাদ -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

আল-ফারাবীর রাষ্ট্রের উৎপত্তি বিষয়ক মতবাদ, যা প্লেটো ও এরিস্টটলের দর্শনের দ্বারা প্রভাবিত, তাতে রাষ্ট্রকে একটি সমবায় ব্যবস্থা হিসেবে দেখা হয়। তিনি মনে করতেন, রাষ্ট্র হলো সকল সমবায়ের সেরা সংগঠন। রাষ্ট্রের উৎপত্তি প্রাকৃতিক এবং এটি মানুষের সামাজিক প্রকৃতির ফল। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষ স্বভাবতই রাজনৈতিক জীব এবং সমাজে বসবাসের জন্য রাষ্ট্রের প্রয়োজন। আল-ফারাবী রাষ্ট্রের কার্যাবলী এবং একটি আদর্শ রাষ্ট্রের ধারণা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। 

আল-ফারাবীর রাষ্ট্রের উৎপত্তি বিষয়ক মতবাদের মূল বিষয়গুলো হলো:

স্বাভাবিক উৎপত্তি:

আল-ফারাবী মনে করতেন, রাষ্ট্র একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া এবং মানুষের সামাজিক প্রকৃতির কারণে এর উদ্ভব হয়েছে। তিনি রাষ্ট্রকে মানুষের একটি প্রয়োজনীয় সামাজিক সংগঠন হিসেবে দেখেন। 

সমবায় ধারণা:

তিনি রাষ্ট্রকে একটি সমবায় ব্যবস্থা হিসেবে বর্ণনা করেন এবং এরিস্টটলের মতের সাথে একমত হয়ে বলেন যে, রাষ্ট্র হলো সকল সমবায়ের শ্রেষ্ঠ সংগঠন। 

আদর্শ রাষ্ট্র: 

আল-ফারাবী একটি আদর্শ রাষ্ট্রের ধারণা দেন, যেখানে ন্যায়বিচার, সহযোগিতা ও পারস্পরিক সহানুভূতির ভিত্তিতে মানুষ বসবাস করবে। তিনি প্লেটোর "রিপাবলিক" দ্বারা প্রভাবিত হয়ে একটি আদর্শ রাষ্ট্রের কল্পনা করেন। 

দার্শনিক রাজার ধারণা: 

আল-ফারাবী বিশ্বাস করতেন, একটি আদর্শ রাষ্ট্র পরিচালনাকারী রাজা হবেন একজন জ্ঞানী ও ন্যায়পরায়ণ দার্শনিক, যিনি জনগণের মঙ্গলের জন্য কাজ করবেন। 

রাষ্ট্রের কার্যাবলী:

রাষ্ট্রের কার্যাবলী সম্পর্কে আল-ফারাবী বলেন, রাষ্ট্রের প্রধান কাজ হলো জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করা এবং তাদের প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা। 

ইনসাফ বা ন্যায়বিচার: 

আল-ফারাবী রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে ইনসাফ বা ন্যায়বিচারকে চিহ্নিত করেন। তার মতে, রাষ্ট্রের প্রতিটি কাজে ন্যায়বিচার থাকা উচিত।

আল-ফারাবীর এই মতবাদ সে সময়কার রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ ছিল এবং আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার ক্ষেত্রেও এটি প্রাসঙ্গিক। 

 

 

আল ফারাবীর রাষ্ট্রের উৎপত্তি মতবাদ -- মোঃ হেলাল উদ্দিন 

Tuesday, June 17, 2025

আল-ফারাবীর আদর্শ রাষ্ট্রের শাসকের গুণাবলি -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

আল-ফারাবী ছিলেন একজন প্রসিদ্ধ ইসলামী দার্শনিক যিনি রাজনীতি, নৈতিকতা এবং রাষ্ট্রচিন্তার ওপর ব্যাপকভাবে লিখেছেন। তাঁর রচিত "আল-মাদীনাতুল ফাদিলা" (আদর্শ রাষ্ট্র) গ্রন্থে তিনি আদর্শ রাষ্ট্র ও তার শাসকের বৈশিষ্ট্য নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন। তাঁর মতে, একটি আদর্শ রাষ্ট্রের নেতৃত্বে এমন একজন শাসক থাকা উচিত যিনি শুধু রাজনৈতিক দক্ষতাসম্পন্ন নন, বরং জ্ঞান, ন্যায়বিচার এবং নৈতিক গুণে সমৃদ্ধ।


আল-ফারাবীর আদর্শ রাষ্ট্রের শাসকের গুণাবলি:

১. জ্ঞানী ও দার্শনিক:

শাসককে অবশ্যই জ্ঞানী হতে হবে। আল-ফারাবীর মতে, একজন আদর্শ শাসক হতে হলে দার্শনিক হতে হবে, যিনি সত্য, ন্যায় ও বাস্তবতা সম্পর্কে গভীর উপলব্ধি রাখেন। তিনি প্লেটোর "ফিলোসফার কিং"-এর ধারণা থেকে প্রভাবিত।


২. নৈতিক গুণসম্পন্ন:

শাসকের মধ্যে উচ্চ নৈতিক গুণ থাকতে হবে, যেমন সত্যবাদিতা, ন্যায়পরায়ণতা, আত্মসংযম, ধৈর্য এবং সদিচ্ছা।


৩. দূরদর্শী ও প্রজ্ঞাবান:

তিনি ভবিষ্যতের কল্যাণ বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হবেন এবং সমাজের সামগ্রিক উন্নতির জন্য কাজ করবেন।


৪. সাহসী ও দৃঢ়চেতা:

আদর্শ শাসকের সাহস থাকতে হবে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে। তিনি ভয় বা প্রলোভনে পা দেবেন না।


৫. শ্রেষ্ঠ চরিত্রের অধিকারী:

শাসকের ব্যক্তিত্ব হতে হবে অনুকরণীয়। তিনি প্রজাদের মধ্যে নৈতিকতা ও আদর্শ ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হবেন।


৬. শ্রবণযোগ্য ও বুদ্ধিমান:

জনগণের কথা শুনতে এবং তাদের সমস্যা উপলব্ধি করতে সক্ষম হবেন। পাশাপাশি সিদ্ধান্ত গ্রহণে যুক্তিবাদী হবেন।


৭. শিক্ষা ও দীক্ষায় পরিপূর্ণ:

শাসককে বৈজ্ঞানিক, ধর্মীয় এবং দার্শনিক জ্ঞানসম্পন্ন হতে হবে, যাতে তিনি জ্ঞানের আলোকে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে পারেন।


৮. মানবকল্যাণে উৎসর্গিত:

তিনি নিজের স্বার্থ নয়, জনগণের স্বার্থকে প্রাধান্য দেবেন এবং ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনে নিবেদিত থাকবেন।


উপসংহার:

আল-ফারাবীর আদর্শ রাষ্ট্রের শাসক কেবলমাত্র রাজনীতিক নয়, তিনি একজন পূর্ণাঙ্গ মানব, যিনি নৈতিকতা, প্রজ্ঞা, জ্ঞান ও মানবিকতাকে একত্রিত করে সমাজকে একটি ন্যায়ের ভিত্তিতে পরিচালনা করেন। তাঁর এই আদর্শ শাসকচিন্তা পরবর্তীকালে ইসলামী ও পাশ্চাত্য রাজনীতিবিদ্যায় গভীর প্রভাব ফেলেছে।

Friday, August 16, 2024

মধ্যযুগের রাষ্ট্রচিন্তায় ইবনে খালদুনের অবদানসমূহ -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

 

ভূমিকা : বিশ্বের অন্যতম অমর প্রতিভা ইবনে খালদুনের রাষ্ট্রচিন্তা সম্পর্কিত আলোচনা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। রাষ্ট্রদর্শনের যেসব ক্ষেত্রে তার মৌলিক অবদান প্রাচ্য প্রতীচ্যের সকল সমাজে অবিসংবাদিতভাবে স্বীকৃতি লাভ করেছে তা হলো তাঁর 'আসাবিয়া তত্ত্ব।' 

এক্ষেত্রে ঐতিহাসিক যুক্তিবাদ, ইতিহাসের সমাজবিজ্ঞানের গুরুত্ব এবং রাষ্ট্রীয় ও সমাজজীবনে অর্থনীতির প্রভাব লক্ষণীয় ।

মধ্যযুগের রাষ্ট্রচিন্তায় ইবনে খালদুনের অবদানসমূহ :

১. আসাবিয়াত বা গোষ্ঠী সংহতি : 

ইবনে খালদুনের মতে, রাষ্ট্রে মৌল ভিত্তি আসাবিয়াত বা গোষ্ঠী সংহতি। পারস্পরিক নির্ভরশীলতা থেকে এই গোষ্ঠী সংহতির উৎপত্তি। রাষ্ট্রচিন্তায় ইবনে খালদুনের অবদান

তাঁর মতে, মানুষ সামাজিক ও রাজনৈতিক জীব। আর সামাজিক জীবনের জন্যই রাষ্ট্রের উৎপত্তি। তবে রাষ্ট্রের উৎপত্তি, বিকাশ, চরম উন্নতি ও অবনতির মূলে রয়েছে গোষ্ঠী সংহতি। 

২. শক্তিশালী শাসক : 

আসাবিয়াত বা গোষ্ঠী সংহতির ফলে রাষ্ট্রের উৎপত্তি হয়। আর সেই রাষ্ট্রের শাসন সংক্রান্ত কাজ একজন শক্তিশালী শাসকের হাতে ন্যস্ত হওয়াই উত্তম। কেননা মানুষের পাশবিক প্রবৃত্তির কারণেই সমাজে কলহ ও দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। 

ফলে সামাজিক সংহতি বিনষ্ট হয়। তাই পশুবৃত্তি দমনের লক্ষ্যে একজন সৎ ও শক্তিশালী শাসকের প্রয়োজন যার হাতে সার্বভৌম ক্ষমতা থাকবে। রাষ্ট্রচিন্তায় ইবনে খালদুনের অবদ

৩. রক্তের সম্পর্ক : 

ইবনে খালদুনের মতে, রক্তের সম্পর্ক রাষ্ট্রীক সংহতি সুদৃঢ়করণে সহায়তা করে। এটি পারস্পরিকসহযোগিতা বৃদ্ধিতে যথেষ্ট সহায়ক ভূমিকা পালন করে। 

যেমন- আরব বেদুঈনরা রক্তের সম্পর্কের ভিত্তিতে সংঘবদ্ধভাবে বসবাস করছে এবং বহিঃশত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য তৎপর রয়েছে। রাষ্ট্রচিন্তায় ইবনে খালদুন

৪. ঐক্যবদ্ধ ধর্মবিশ্বাস : 

ইবনে খালদুন রাষ্ট্র ও সংহতির ভিত্তি হিসেবে ধর্মবিশ্বাসকে সমর্থন দিয়েছেন। বিভিন্ন ধর্মের প্রভাবে মানুষ রাষ্ট্র গঠন করে ও সংহতি প্রকাশ করে থাকে। রাষ্ট্রিক সংহতির মূলে ধর্ম বিশ্বাসকে স্বীকার করা হয়েছে। 

ঐক্যবদ্ধ ধর্মবিশ্বাস জাতি ও সম্প্রদায়ের মানসিকতা ও সাহসিকতা মজবুত করে ও শক্তিশালী জাতি গঠনে সহায়তা করে। রাষ্ট্রচিন্তায় ইবনে খালদুনের অবদান

৫. বৈজ্ঞানিক ও যুক্তিবাদী ধারণা : 

ইতিহাসের বৈজ্ঞানিক ও যুক্তিবাদী ব্যাখ্যা ইবনে খালদুনকে রাষ্ট্রচিন্তায় স্থায়ী আসন দিয়েছে। তিনি প্রাচীন ও মধ্যযুগের দেবদেবী ও বাইবেল নির্ভর ইতিহাসকে বৈজ্ঞানিক ও যুক্তিবাদী ব্যাখ্যা দিয়ে বিশ্বজনীন মর্যাদা দান করেন। 

ইতিহাসকে শাশ্বত ও সার্বজনীন মানবতার প্রেক্ষিতে বিচার করেছেন। অর্থাৎ বৈজ্ঞানিক ও যুক্তিবাদী ব্যাখ্যা দিয়ে ইতিহাস সম্পর্কে পূর্বের ধারণার আমূল পরিবর্তন ঘটান।

৬. রাষ্ট্রনীতি ও অর্থনীতি সম্পর্কযুক্ত : 

ইবনে খালদুন রাষ্ট্রনীতির সাথে অর্থনীতির সম্পর্ক নির্ণয় করেছেন। তাঁর মতে, কোনো দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নির্ভর করে মজবুত অর্থনীতির উপর। 

তিনি রাষ্ট্রের রাজস্ব সংগ্রহের জন্য যাকাত, খারাজ, জিজিয়া ইত্যাদি স্বাভাবিক করের উপর গুরুত্বারোপ করেন। তাঁর মতে, সুষম বাজেট স্থিতিশীল রাজনীতির মেরুদণ্ড। রাষ্ট্রচিন্তায়দুনের

৭. রাষ্ট্র ও সমাজের সম্পর্ক : 

ইবনে খালদুন তার প্রথমদিকে রাষ্ট্র ও সমাজের মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ করলেও শেষদিকে েেস রাষ্ট্র ও সমাজের মধ্যকার সম্পর্ককে স্বীকার করেছেন। 

একটি ব্যতিক্রম হলে অন্যটিও ক্ষতিগ্রস্থ হবে। অর্থাৎ, বস্তুর সাথে বস্তুর আকারের যে সম্পর্ক রাষ্ট্রের সাথে সমাজেরও সেই সম্পর্ক।

৮. সমাজবিজ্ঞানের সাথে ইতিহাসের সম্পর্ক : 

ইবনে খালদুন সমাজবিজ্ঞানের সাথে ইতিহাসের মধ্যে সম্পর্ক নির্ণয় করতে গিয়ে গভীর পাণ্ডিত্যের পরিচয় দেন। বিজ্ঞানভিত্তিক ইতিহাস রচনা করতে হলে সমাজবিজ্ঞানের জ্ঞান থাকা আবশ্যক। 

যে ঐতিহাসিক ইতিহাসকে সমাজবিজ্ঞানের তত্ত্ব ও তথ্যের উপর প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়, তার পক্ষে সঠিক ইতিহাস রচনা করা সম্ভব নয়।

৯. সমাজ ও মানুষের উপর জলবায়ুর প্রভাব : 

সমাজের মানুষের চরিত্র গঠন, রাষ্ট্রীয় সংগঠন এবং কৃষ্টি ও সংস্কৃতির উপর ভৌগোলিক অবস্থা ও জলবায়ুর প্রচ্ছন্ন প্রভাব রয়েছে। 

আবহাওয়া ও জলবায়ুর তারতম্যের সাথে অঞ্চলভেদে মানুষের আচার-আচরণ, রীতিনীতি ও শাসনব্যবস্থায় ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। রাষ্ট্রচিন্তায় ইবনে খালদুনের অবদান

উপসংহার :

উপর্যুক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে, বেশকিছু মৌলিক অবদানের জন্য ইবনে খালদুন মধ্যযুগের রাষ্ট্রচিন্তার ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে। 

তার চিন্তাধারায় গ্রিক দার্শনিক এরিস্টটলের প্রভাব থাকায় তাকে প্রাচ্যের এরিস্টটলও বলা হয়। রাষ্ট্রচিন্তায় বিশেষ অবদানের জন্য দার্শনিক হবস, মন্টেস্কু, ভলটেয়ার, গীবন প্রমুখ ইবনে খালদুনের কাছে ঋণী।

 

 মধ্যযুগের রাষ্ট্রচিন্তায় ইবনে খালদুনের অবদানসমূহ -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

 

Friday, July 12, 2024

বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক চিন্তাধারা -- রওনক জাহান

আমাদের প্রজন্ম, যারা বাংলাদেশকে স্বাধীনভাবে আবির্ভূত হতে দেখেছে এবং তার পেছনে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের যে অসামান্য অবদান তা প্রত্যক্ষ করেছে, তাদের পক্ষে বঙ্গবন্ধুর কর্মকাণ্ড এবং রাজনৈতিক চিন্তাধারার মূল্যায়ন সহজ ভাষায় ব্যক্ত করা অত্যন্ত কঠিন। আমি নিজে যখনই বঙ্গবন্ধুর কথা ভাবি, তখনই আমার প্রথমে মনে পড়ে ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের সেই উত্তাল দিনগুলোর কথা। আমি তখন ঢাকাতেই ছিলাম। বিদেশে উচ্চশিক্ষা শেষ করে ১৯৭০-এর ডিসেম্বর মাসে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষকতা শুরু করেছি। ১৯৭০ সালের ডিসেম্বর মাসেই সেই ঐতিহাসিক নির্বাচন হয়, যাতে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ অভূতপূর্ব বিজয় লাভ করে। আওয়ামী লীগ জাতীয় পরিষদের ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭ আসনে এবং প্রাদেশিক পরিষদের ৩০০ আসনের মধ্যে ২৮৮টিতে জয়লাভ করে। ছয় দফা এবং এগারো দফার ভিত্তিতে নির্বাচনী ইশতেহার রচিত হয় এবং নির্বাচনী প্রচারণা চালানো হয়। সমগ্র জনসাধারণকে অভূতপূর্বভাবে ঐক্যবদ্ধ করা হয় বাঙালির অধিকার আদায়ের সংগ্রামে।

১৯৭০ সালের নির্বাচনের এই বিশাল সাফল্যের পর থেকেই আমরা বিপুল আশা-উদ্দীপনার মধ্যে ছিলাম। বাংলাদেশ যে সৃষ্টি হতে যাচ্ছে, তা নিয়ে আমাদের মনে আর কোনো সন্দেহ ছিল না। তখন একমাত্র প্রশ্ন ছিল আমরা কি শান্তিপূর্ণভাবে আলোচনার মাধ্যমে এই স্বাধীন দেশ সৃষ্টি করতে পারব, নাকি আমাদের একটা বিরাট রক্তাক্ত সংঘাতের পথে যেতে হবে।

আমার মনে পড়ে, ১ মার্চে যখন জেনারেল ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের বৈঠক স্থগিত করলেন এবং তার পরে যখন বঙ্গবন্ধু ৩ মার্চ থেকে অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিলেন, বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষই তখন স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই আন্দোলনে যোগ দিয়েছিল। প্রশাসন, বিচার বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যবর্গ, ব্যবসায়ী সম্প্রদায় সবাই পাকিস্তান সরকারের পক্ষ ত্যাগ করে বঙ্গবন্ধুর প্রতি তাঁদের আনুগত্য প্রকাশ করলেন। পৃথিবীর আর কোনো দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে সংশ্লিষ্ট দেশটির জাতীয় স্বাধীনতার স্বীকৃতি না পাওয়া পর্যন্ত প্রশাসনকে এভাবে তাদের আনুগত্য পরিবর্তন করতে দেখা যায়নি। এর একটি প্রধান কারণ হলো বঙ্গবন্ধু আহূত অসহযোগ আন্দোলন এমনই ব্যাপক ও সর্বজনগ্রাহ্য ব্যাপার হয়ে পড়েছিল যে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সচল রাখার প্রয়োজনে অসহযোগ আন্দোলন চলাকালেই বঙ্গবন্ধুকে সারা দেশের শাসনভার পরিচালনার দায়িত্ব নিতে হয়।

মার্চ মাসের ২ তারিখের পর থেকেই প্রতিদিন আমি ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াতাম। দেখতাম রাস্তায় হাজার হাজার লোক, কিন্তু সবাই ছিল শান্তিপূর্ণ। সবারই মনে এবং মুখে একই কথা, যা ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু রেসকোর্স ময়দানের (আজকের সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) দেওয়া বক্তৃতায় বললেন। তিনি বললেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। আমি নিজে সেদিন রেসকোর্স ময়দানে উপস্থিত ছিলাম, দেখেছিলাম লাখো মানুষের ঢল, সবার মনে একই আশা এবং উদ্দীপনা।

আমার মনে আছে, আমি তখন একটি কথা খুবই ভাবতাম। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে আমার কাছে ফরাসি দার্শনিক রুশোর ‘সামাজিক চুক্তি’ (social contract) বইটি খুব প্রিয় ছিল, বিশেষ করে রুশোর একটি তাত্ত্বিক ধারণা ‘‘general will” যখন পড়তাম এবং পরবর্তীকালে ক্লাসে আমি এটা পড়াতাম, তখন ভাবতাম general will কেমন হতে পারে। ১৯৭১ সালের ২ মার্চের পর যখন আমি অসহযোগ আন্দোলনে হাজার হাজার জনতার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ দেখলাম এবং সবার মুখে মুখে শুধু স্বাধীনতার কথা শুনতাম তখন বুঝতে পারলাম রুশোর general will কথাটির অর্থ কী। আমি স্পষ্টই দেখতে পেলাম আমাদের স্বাধীনতার পক্ষে general will সৃষ্টি হয়েছে। সারা দেশের মানুষ এখন ঐক্যবদ্ধ স্বাধীনতার দাবির ডাকে। এই general will, এই ঐক্যবদ্ধ জনমত গঠিত হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর বহু বছরের সাধনা, ত্যাগ এবং কর্মকাণ্ডের ফলে।

আমি নিজেকে খুবই ভাগ্যবান মনে করি যে আমি নিজের চোখে ১৯৭১ সালের মার্চ মাসকে এবং বঙ্গবন্ধুর সেদিনের ভূমিকাকে প্রত্যক্ষ করেছি। খুব কম লোকেরই ভাগ্য হয় ইতিহাস সৃষ্টি হতে দেখা। আমি ইতিহাস সৃষ্টি হতে দেখেছি। স্বাধিকার আন্দোলনকে স্বাধীনতার আন্দোলনে রূপান্তরিত হতে দেখেছি। এসব ঐতিহাসিক ঘটনার মূল নায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে অসম্ভব সম্ভব করতে দেখেছি।

আমি আগেই বলেছি, সে সময়ের আমাদের অনুভূতি যাঁরা তখন উপস্থিত ছিলেন না, যাঁরা চোখে দেখেননি এবং সেই অনুভূতি যাঁদের হৃদয়ে তখন স্পর্শ করেনি, তাঁদের ঠিক ভাষায় বলে বোঝানো কষ্টকর। পৃথিবীর অনেক দেশেই অনেক সময়ে অনেক নেতা নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন। দেশ পরিচালনা করতে পারেন। কিন্তু খুব অল্পসংখ্যক নেতাই ইতিহাস রচনা করতে পেরেছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন তেমনই একজন অনন্য কালজয়ী ইতিহাসের মহানায়ক।

যদিও আমাদের স্বাধীনতা অর্জনের পর ৪৮ বছর এবং বঙ্গবন্ধু হত্যার পর ৪৩ বছর অতিবাহিত হয়েছে, তবু এখন পর্যন্ত সর্বাঙ্গীণভাবে গবেষণালব্ধ বঙ্গবন্ধুর কোনো আত্মজীবনী লেখা হয়নি। আমার মনে হয় বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে কিছু জানতে হলে, বিশেষ করে তাঁর রাজনৈতিক চিন্তাধারা এবং কর্মকাণ্ডের উৎস খুঁজতে হলে তাঁর নিজের লেখা ডায়েরি যার ওপর ভিত্তি করে দুটি বই প্রকাশিত হয়েছে, ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ (২০১২) এবং ‘কারাগারের রোজনামচা’ (২০১৭) তাই হলো সবচেয়ে মূল্যবান সূত্র। অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে তিনি তাঁর ছোটবেলা, যৌবনের জীবনদর্শন এবং রাজনীতি সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন। অসমাপ্ত হলেও এই বইটি থেকে তাঁর রাজনৈতিক ধ্যানধারণা খুবই পরিষ্কারভাবে বোঝা যায়। অন্য বইটি, ‘কারাগারের রোজনামচা’ও তাঁর ডায়েরিভিত্তিক। এই বইটিতে ১৯৬৬ সালের ঐতিহাসিক ছয় দফা আন্দোলনের সময়ের তাঁর কারাগারের দিনগুলোর বিশদ বিবরণ আছে। এখানেও তাঁর রাজনৈতিক চিন্তাধারা সুস্পষ্ট। বিশেষ করে স্বৈরাচারী রাষ্ট্র জনগণের আন্দোলনকে দমন করার জন্য কত রকমের নিপীড়ন চালাতে পারে, তার বর্ণনা তিনি দিয়েছেন। এ ছাড়া গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় ব্যক্তিস্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কত প্রয়োজনীয়, তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা বইটির বিভিন্ন স্থানে আমরা পাই।

আমার আজকের এই প্রবন্ধ প্রধানত এই দুটি বই এবং বঙ্গবন্ধুর অন্যান্য ভাষণের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করেছি, যাতে যতটা সম্ভব আমরা বঙ্গবন্ধুর নিজের ভাষা শুনতে পাই। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক চিন্তাধারা বুঝতে হলে প্রথমেই আমাদের মনে রাখা দরকার বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের বেশির ভাগ অংশই কেটেছে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বাইরে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর খুবই অল্প সময়ের জন্য—সাড়ে তিন বছর—তিনি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ছিলেন। জীবনের বেশির ভাগ সময়ই তিনি ব্যয় করেছেন ঔপনিবেশিক ও অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে। প্রথমে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক এবং তারপর পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে তিনি বহুদিন সংগ্রাম করেছেন বাংলার মানুষের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার আদায়ের জন্য।

রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন একজন সাধারণ কর্মী হিসেবে কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যে বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠেন কোটি কোটি মানুষের অবিসংবাদিত নেতা। একদিকে তাঁর ছিল অসাধারণ সাংগঠনিক ক্ষমতা, অন্যদিকে অতুলনীয় বাগ্মিতা। সাধারণত একই ব্যক্তির মধ্যে আমরা এই দুই গুণের সমাহার দেখি না। তিনি নিজেই লিখেছেন যে তাত্ত্বিক আলোচনার চেয়ে দল সংঘটনের কাজে তাঁর বেশি উৎসাহ ছিল। তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে তিনি লিখেছেন যে যখন তিনি কলকাতায় ছাত্র ছিলেন, তখন আবুল হাশিম সাহেব, মওলানা আজাদ সোবহানী, যিনি একজন দার্শনিক ছিলেন, তাঁকে আমন্ত্রণ করে এনেছিলেন ছাত্রদের ক্লাস নেওয়ার জন্য। বঙ্গবন্ধু লিখেছেন:
‘আমার সহকর্মীরা অধিক রাত পর্যন্ত তাঁর আলোচনা শুনতেন। আমার পক্ষে ধৈর্য ধরে বসে থাকা কষ্টকর। কিছু সময় যোগদান করেই ভাগতাম। আমি আমার বন্ধুদের বলতাম, ‘‘তোমরা পণ্ডিত হও, আমার অনেক কাজ। আগে পাকিস্তান আনতে দাও, তারপর বসে বসে আলোচনা করা যাবে।” ... কাজ তো থাকতই ছাত্রদের সাথে, দল তো ঠিক রাখতে হবে।”’১

তবে তাত্ত্বিক না হলেও বঙ্গবন্ধুর সুনির্দিষ্ট কিছু আদর্শ ছিল, মূল্যবোধ ছিল, লক্ষ্য ছিল এবং সেই লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য তিনি একনিষ্ঠভাবে এবং নিরলস কাজ করেছেন। তাঁর কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়েই আমরা তাঁর রাজনৈতিক চিন্তাধারা উপলব্ধি করতে পারি। মাত্র তিনটি বাক্যেই বঙ্গবন্ধু তাঁর আত্মপরিচিতি ও মূল্যবোধ অত্যন্ত পরিষ্কার করেছেন। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র প্রথমেই বঙ্গবন্ধুর একটি উদ্ধৃতি রয়েছে, যা তিনি ১৯৭৩ সালের মে মাসের ৩ তারিখে লিখেছেন। তিনি লিখেছেন:
‘একজন মানুষ হিসাবে সমগ্র মানবজাতি নিয়েই আমি ভাবি। একজন বাঙালি হিসাবে যা কিছু বাঙালিদের সঙ্গে সম্পর্কিত তাই আমাকে গভীরভাবে ভাবায়। এই নিরন্তর সম্প্রীতির উৎস ভালোবাসা, অক্ষয় ভালোবাসা যে ভালোবাসা আমার রাজনীতি এবং অস্তিত্বকে অর্থবহ করে তোলে’।২

এই উদ্ধৃতি থেকে এটা স্পষ্ট যে বঙ্গবন্ধু নিজেকে একাধারে মানুষ এবং তার সঙ্গে বাঙালি হিসেবে আত্মপরিচয় স্বীকৃতি দিচ্ছেন। তাঁর কর্মপ্রেরণার উৎস হিসেবে চিহ্নিত করছেন বাঙালি এবং মানবসম্প্রদায়ের জন্য তাঁর ভালোবাসা। এই আত্মপরিচয় থেকেই আমরা উপলব্ধি করতে পারি তাঁর রাজনৈতিক চিন্তাধারার চারটি বৈশিষ্ট্য: বাঙালি জাতিসত্তা, জনসম্প্রীতি, অসাম্প্রদায়িকতা এবং সমাজতন্ত্র।

তাঁর রাজনৈতিক চিন্তাধারার অবশ্যই আরও অনেক বৈশিষ্ট্য ছিল। কিন্তু আজকের এই প্রবন্ধের আলোচনা আমি এই চারটি বৈশিষ্ট্যেই সীমাবদ্ধ রাখব।

বাঙালি জাতিসত্তা: স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও মুক্তি
রাজনৈতিক জীবনের প্রথম থেকেই বঙ্গবন্ধুর বাঙালি আত্মপরিচয়, স্বকীয়তা এবং তা নিয়ে গর্ববোধের পরিচয় পাই। তিনি পাকিস্তান আন্দোলনের সঙ্গে সংযুক্ত ছিলেন, কিন্তু আত্মজীবনীতে তিনি লিখেছেন সে সময় জনসভায় পাকিস্তান আন্দোলনকে তিনি উত্থাপিত করতেন লাহোর প্রস্তাবের ধারণায়, দুটি মুসলমান প্রধান সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে:
‘পাকিস্তান দুইটা হবে, লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে। একটা বাংলা ও আসাম নিয়ে পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র; আর একটা পশ্চিম পাকিস্তান স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হবে—পাঞ্জাব, বেলুচিস্তান, সীমান্ত ও সিন্দু প্রদেশ নিয়ে।’৩

বাঙালি জাতিসত্তা সম্পর্কে সচেতনতার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল দরিদ্র, নির্যাতিত ও বঞ্চিত মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। তিনি পাকিস্তান আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন এই ভেবে যে এই নতুন রাষ্ট্রে দরিদ্র মুসলমান কৃষক জমিদার শ্রেণির নির্যাতন থেকে মুক্তি পাবে। তিনি সব সময় স্বাধীনতার আন্দোলনকে শুধু ঔপনিবেশিক শাসন থেকে স্বাধীন হওয়ার সংগ্রাম হিসেবে দেখেননি, তিনি এটাকে দেখেছেন নির্যাতিত দরিদ্র মানুষের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মুক্তির সংগ্রাম হিসেবে। তাঁর জাতীয়তাবাদের ধ্যানধারণার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও সুষম সমাজব্যবস্থার চিন্তা। বাঙালির জাতিসত্তার স্বীকৃতির আন্দোলনকে তিনি সব সময় দেখেছেন একটি গণতান্ত্রিক আন্দোলন হিসেবে, শোষিত–বঞ্চিত মানুষের মুক্তির আন্দোলন হিসেবে। তাই ৭ মার্চ ১৯৭১-এ তিনি একই সঙ্গে ডাক দেন স্বাধীনতা ও মুক্তির সংগ্রামের জন্য।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আগে কলকাতায় ছাত্র থাকাকালে যখন তিনি মুসলিম লীগে যোগ দেন, তখন বঙ্গবন্ধু ছিলেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং আবুল হাশিমের দলে, যাঁরা প্রগতিশীল বলে পরিচিত ছিলেন। আত্মজীবনীতে বঙ্গবন্ধু লিখছেন:
‘শহীদ সাহেবের নেতৃত্বে আমরা বাংলার মধ্যবিত্ত শ্রেণির লোকেরা মুসলিম লীগকে জনগণের লীগে পরিণত করতে চাই। মুসলিম লীগ তখন পর্যন্ত জনগণের প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয় নাই। জমিদার, জোতদার ও খান বাহাদুর নবাবদের প্রতিষ্ঠান ছিল।’ ৪

মুসলিম লীগের এই পুনর্গঠনের কাজে বঙ্গবন্ধু নিবেদিতপ্রাণ হয়ে কাজ করেন। আত্মজীবনীতে তিনি লিখছেন:
‘মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠান পূর্বে ছিল খান সাহেব, খান বাহাদুর ও ব্রিটিশ খেতাবধারীদের হাতে, আর এদের সাথে ছিল জমিদার, জোতদার শ্রেণির লোকেরা। এদের দ্বারা কোনো দিন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা হতো না। শহীদ সাহেব ও হাশিম সাহেব যদি বাংলার যুবক ও ছাত্রদের মধ্যে মুসলিম লীগকে জনপ্রিয় না করতে পারতেন এবং বুদ্ধিজীবী শ্রেণিতে টেনে আনতে না পারতেন, তা হলে কোনো দিনও পাকিস্তান আন্দোলন বাংলার কৃষকদের মধ্যে জনপ্রিয়তা লাভ করতে পারত না।’৫
লাহোর প্রস্তাব যখন ১৯৪৬ সালের মুসলিম লীগ কনভেনশনে পরিবর্তন করা হলো এবং দুটি পাকিস্তান রাষ্ট্রের বদলে শুধু একটি রাষ্ট্রের কথা প্রস্তাবিত হলো, সেই পরিবর্তন সম্বন্ধে বঙ্গবন্ধু আত্মজীবনীতে লিখছেন যে তখন তাদের বলা হয়েছিল যে কাউন্সিলের প্রস্তাব পরিবর্তন করা হয় নাই, এটা কনভেনশনের প্রস্তাব। এরপর ১৯৪৭ সালে সোহরাওয়ার্দী এবং শরৎবসুর উদ্যোগে বাংলাকে ভাগ না করে যুক্ত বাংলার উদ্যোগ নেওয়া হয়, তখন সেই উদ্যোগের সঙ্গেও বঙ্গবন্ধু যুক্ত ছিলেন। এক পাকিস্তান সৃষ্টি নিয়ে তাঁর মনে যে প্রশ্ন এবং পরবর্তীতে যুক্ত বাংলার উদ্যোগের সঙ্গে তাঁর যুক্ত হওয়ার প্রচেষ্টা থেকে বোঝা যায় যে বঙ্গবন্ধু ছাত্র অবস্থা থেকেই বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর বঙ্গবন্ধু ঢাকায় ফিরে প্রগতিশীল সংগঠন ও বাঙালির বিভিন্ন অধিকার আদায়ের আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৪৮ সালে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে আন্দোলনে অংশগ্রহণের জন্য তিনি কারাবরণ করেন। তবে সে সময় তিনি যে শুধু ভাষার অধিকার নিয়েই সংগ্রাম করেছেন তা নয়, গরিব এবং নির্যাতিত মানুষের পাশে থেকে অন্যায়–অবিচারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রতিবাদী আন্দোলনে যোগ দেন, যেমন কর্ডন প্রথার বিরুদ্ধে, জিন্নাহ ফান্ডের বিরুদ্ধে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিম্ন বেতনভোগী কর্মচারীদের সমর্থনে।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার কয়েক বছরের মধ্যেই তিনি গণতন্ত্রের স্বার্থে একটি শক্তিশালী বিরোধী দল গঠনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন। আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার সপক্ষে যে যুক্তি তাঁর আত্মজীবনীতে তিনি লিখেছেন তা হলো:
‘আর মুসলিম লীগের পিছনে ঘুরে লাভ নেই, এ প্রতিষ্ঠান এখন গণবিচ্ছিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে...বিরোধী দল সৃষ্টি করতে না পারলে এ দেশে একনায়কত্ব চলবে।’৬

এরপর ১৯৪৯ সালে আওয়ামী লীগের (প্রথমে আওয়ামী মুসলিম লীগ) প্রতিষ্ঠালগ্নে তিনি আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন যদিও তিনি তখন কারাগারে ছিলেন। ১৯৫৩ সালে তিনি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হন। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনী জোটের একজন সদস্য হিসেবে বঙ্গবন্ধু প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা নির্বাচনী ইশতেহারের অন্যতম দফা ছিল পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসন এবং বাংলা ভাষার রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেওয়া। ১৯৫৫ সালের মে মাসে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। গণপরিষদের এক বক্তৃতায় তিনি বাঙালির স্বকীয়তা এবং বাঙালিদের বিভিন্ন দাবিদাওয়া জোরালোভাবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন:
‘ওরা পূর্ব বাংলা নামের পরিবর্তে পূর্ব পাকিস্তান নাম রাখতে চায়। আমরা বহুবার দাবি জানিয়েছি আপনারা এটাকে বাংলা নামে ডাকেন। বাংলা শব্দটার একটা নিজস্ব ইতিহাস আছে, আছে এর একটা ঐতিহ্য।...বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে কি হবে? যুক্ত নির্বাচনী এলাকা গঠনের প্রশ্নটারই কি সমাধান? আমাদের স্বায়ত্তশাসন সম্পর্কেই বা কি ভাবছেন?...আমার ঐ অংশের [পশ্চিম পাকিস্তান] বন্ধুদের কাছে আবেদন জানাব যে আমাদের জনগণের রেফারেন্ডাম অথবা গণভোটের মাধ্যমে দেওয়া রায়কে মেনে নেন।’৭

অবশ্য বাংলার ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতি রক্ষার পাশাপাশি তাঁর বৃহত্তর সংগ্রাম ছিল বাঙালি জাতিকে বিভিন্ন শোষণের হাত থেকে মুক্ত করা এবং তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। আত্মজীবনীতে তিনি লিখেছেন:
‘পূর্ব বাংলার সম্পদ কেড়ে নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানকে কত তাড়াতাড়ি গড়া যায় একদল পশ্চিমা নেতা ও বড় বড় সরকারি কর্মচারীরা গোপনে সে কাজ করে চলেছিল।...শ্রমিক কৃষক মেহনতি মানুষ যে আশা নিয়ে স্বাধীনতা আন্দোলন, যে পাকিস্তান আন্দোলনে শরিক হয়ে অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছে তাদের অর্থনৈতিক মুক্তির দিকে কোনো নজর দেওয়াই তারা দরকার মনে করল না।’ ৮

১৯৫৫ সালে কাউন্সিল সেশনে আওয়ামী লীগের নাম থেকে মুসলিম শব্দটি অপসারণ করা হয় এবং বঙ্গবন্ধু আবারও দলের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৬৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে লাহোরে বঙ্গবন্ধু তাঁর ঐতিহাসিক ছয় দফা দাবি উত্থাপন করেন, যার মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে অত্যন্ত সীমিত ক্ষমতা ন্যস্ত করার প্রস্তাব করা হয়। সেই বছর মার্চ মাসে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন এবং ছয় দফার পক্ষে জনমত সৃষ্টির লক্ষ্যে সারা বাংলায় গণসংযোগ সফর শুরু করেন। ১৯৬৬ সালের পর থেকে বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতীয়তাবাদের অ্যাজেন্ডাকে একমাত্র দাবি হিসেবে উপস্থাপন করেন। ছয় দফা আন্দোলন শুরু করার পর বঙ্গবন্ধু পুনরায় কারাবরণ করেন এবং কারাগারে থাকা অবস্থায় পাকিস্তান সরকার তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা করে (আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা)। ১৯৬৯ সালে প্রচণ্ড ছাত্র আন্দোলনের মুখে আইয়ুব সরকারের পতন হয় এবং বঙ্গবন্ধু কারামুক্ত হন। কারামুক্তির পর ছাত্রসমাজ তাঁকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনী প্রচারণায় বঙ্গবন্ধু ‘বাংলাদেশ’ ও ‘জয় বাংলা’ এই দুটি স্লোগান ব্যবহার করতে আরম্ভ করেন। ১৯৬৬ থেকে ১৯৭০—মাত্র চার বছরের মধ্যে বঙ্গবন্ধু সমগ্র জাতিকে স্বাধীনতার পক্ষে ঐকমত্যে আনতে পারেন। এত অল্প সময়ের মধ্যে পৃথিবীতে অন্য কোনো স্থানে জনগণকে এমন সংঘবদ্ধ করা সম্ভব হয়েছে বলে আমার জানা নেই।

বঙ্গবন্ধু সারা জীবন আন্দোলনের রাজনীতি করেছেন ও দল গঠন করেছেন, মুক্তির কথা বলেছেন। তিনি লাখ লাখ জনতাকে সংঘবদ্ধ করতেন আন্দোলনে, কিন্তু তাঁর লক্ষ্য ছিল অহিংস এবং শান্তিপূর্ণ আন্দোলন, যাতে গণতান্ত্রিক পন্থার মধ্য দিয়ে জনমত সৃষ্টি করে অধিকার আদায় করা যায় এবং অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পরিবর্তন আনা যায়।

‘কারাগারের রোজনামচা’য় বিভিন্ন জায়গায় তিনি অগণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার কুফল সম্পর্কে বিস্তারিত লিখেছেন। গণতান্ত্রিক উপায়ে বিরোধী রাজনীতি না করতে পারলে যে দেশ সন্ত্রাসী রাজনীতির দিকে অগ্রসর হতে পারে, তার আশঙ্কাও তিনি প্রকাশ করেছেন। ছয় দফা আন্দোলনের সময় পাকিস্তানি সরকার যখন আওয়ামী লীগ কর্মীদের নির্বিচারে জেল–জুলুমের সম্মুখীন করে এবং গণমাধ্যমে খবর প্রচারের বিরুদ্ধে নির্দেশনা দেয়, তখন গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর দুর্ভাবনার কথা তিনি ব্যক্ত করেছেন। তিনি লিখছেন:
‘খবরের কাগজ এসে গেল। দেখে আমি শিহরিয়া উঠলাম, এ দেশ থেকে গণতান্ত্রিক রাজনীতির পথ চিরদিনের জন্য এরা বন্ধ করে দিতে যাচ্ছে। জাতীয় পরিষদে “সরকারী গোপন তথ্য আইন সংশোধনী বিল” আনা হয়েছে। কেউ সমালোচনামূলক যে কোনো কথা বলুন না কেন মামলা দায়ের হবে। ... বক্তৃতা করার জন্য ১২৪ ধারা ৭(৩)...এবং ডিপি আর রুল দিয়ে আমার বিরুদ্ধে মোটমাট পাঁচটি মামলা আর অন্যান্য আরও তিনটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।...আমার ভয় হচ্ছে এরা পাকিস্তানকে সন্ত্রাসবাদী রাজনীতির দিকে নিয়ে যেতেছে। আমরা এ পথে বিশ্বাস করি না।...আমরা যারা গণতন্ত্রের পথে দেশের মঙ্গল করতে চাই, আমাদের পথ বন্ধ হতে চলেছে।’৯

১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৭০—এই ২৩ বছরে তাঁর নেতৃত্বে বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ক্রমাগত বেগবান হয়েছে, কিন্তু তিনি সব সময় গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্যেই ছিলেন। যখনই পাকিস্তানি শাসকেরা নির্বাচনের সুযোগ দিয়েছে, তিনি তাতে অংশগ্রহণ করেছেন, যদিও বারবার শাসকশ্রেণি নির্বাচনের ফলাফলকে বানচাল করার চেষ্টা করেছে। তাঁর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু অত্যন্ত সুন্দরভাবে বাঙালি জাতীয়তাবাদের আন্দোলনকে একই সঙ্গে গণতান্ত্রিক ও মুক্তির আন্দোলন হিসেবে জনগণের সামনে তুলে ধরেছিলেন। তিনি বলেছিলেন:
‘আজ বাংলার মানুষ মুক্তি চায়, বাংলার মানুষ বাঁচতে চায়, বাংলার মানুষ তার অধিকার চায়।... নির্বাচনে বাংলাদেশের মানুষ সম্পূর্ণভাবে আমাকে, আওয়ামী লীগকে ভোট দেন। আমাদের ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি বসবে, আমরা সেখানে শাসনতন্ত্র তৈয়ার করব এবং এই দেশকে আমরা গড়ে তুলব, এ দেশের মানুষ অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তি পাবে।...আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব চাই না। আমরা এ দেশের মানুষের অধিকার চাই।’১০

জনসম্প্রীতি: জনগণের রাজনীতি
অনেক সময়ই যাঁরা বড়মাপের নেতা হন, তাঁরা জনগণের সঙ্গে তেমন সম্পৃক্ত হন না। তাঁরা জনগণকে কোনো মহৎ উদ্দেশ্যে পরিচালনার কথা বলেন। তাঁরা অনেক সময় থেকে যান জনগণের ঊর্ধ্বে। বঙ্গবন্ধু এর ব্যতিক্রম। তিনি সব সময় বাংলাদেশের জনসাধারণের সঙ্গে নিজেকে এক করে দেখতেন। এবং তাই তিনি বারবার একদিকে তাঁর জনগণের জন্য ভালোবাসা এবং অন্যদিকে জনগণের তাঁর জন্য ভালোবাসার কথা উল্লেখ করতেন।

পৃথিবীর বিভিন্ন নেতার ভাষণ আমি যখন পড়ি এবং তাঁদের ভাষণের সঙ্গে যখন আমি বঙ্গবন্ধুর ভাষণের তুলনা করি, তখন আমার কাছে তাঁর একটি অভিব্যক্তি, ‘জনগণের প্রতি ভালোবাসা’, তা অনন্য বলে মনে হয়েছে। বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণের জন্য তাঁর যে ভালোবাসা এবং প্রতিদানে জনগণের যে ভালোবাসা তিনি পেয়েছেন, তার কথা তিনি নানা ভাষণে বারবার ব্যক্ত করেছেন।

বঙ্গবন্ধু জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, অসাম্প্রদায়িকতা, সমাজতন্ত্র—এসব নানা রকমের আদর্শের কথা বলতেন, তবে সাধারণ মানুষের দুঃখ–কষ্টে তাদের পাশে দাঁড়ানো, জনসাধারণ কোন কোন ইস্যুকে প্রাধান্য দিচ্ছে তার দিকেও তাঁর দৃষ্টি ছিল। জনসাধারণের ইস্যু নিয়েই তিনি কথা বলতেন, রাজনীতি করতেন। আমরা দেখতে পাই যখন তিনি পাকিস্তান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত, তখন তিনি দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের জন্য লঙ্গরখানা খুলে কাজ করেছেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর যখন দেশে খাদ্যের অভাব, তখন তিনি সুষম খাদ্যবণ্টনের আন্দোলন, ভুখা মানুষের মিছিলে অংশগ্রহণ করেন। তিনি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রতিরোধে কাজ করেন। দাঙ্গাকবলিত মানুষকে উদ্ধারের জন্য কাজ করেন। তাঁর রাজনৈতিক চিন্তাধারা শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতাকেন্দ্রিক ছিল না, সাধারণ মানুষের সমস্যার সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে তিনি তাঁর রাজনৈতিক চিন্তা গড়ে তুলেছিলেন।

তাঁর লেখায় আমরা দেখতে পাই দেশে বন্যা কিংবা খাদ্যাভাব অথবা দ্রব্যমূল্য বা কর বৃদ্ধি হলে তাঁর কত দুশ্চিন্তা হতো। জনসাধারণের ওপর যেসব ইস্যু প্রভাব ফেলে, তার সবই তার রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডার মধ্যে ছিল। যেমন ‘কারাগারের রোজনামচা’য় তিনি লিখছেন:
‘খবরের কাগজ এসেছে...সিলেটের বন্যায় দেড় লক্ষ লোক গৃহহীন, ১০ জন মারা গেছে। কত যে গবাদিপশু ভাসাইয়া নিয়া গেছে তার কি কোনো সীমা আছে। কি করে এ দেশের লোক বাঁচবে তা ভাবতেও পারি না।...কত কর মানুষ দিবে। কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী শোয়েব সাহেব বলেছেন জনসাধারণ অধিকতর সচ্ছল হইয়াছে তাই কর ধার্য করেছেন। তিনি যাদের মুখপাত্র এবং যাদের স্বার্থে কাজ করেছেন তারা সচ্ছল হয়েছে। তাদের করের বোঝা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। শিল্পপতি ও বড় ব্যবসায়ীরা আনন্দিতই শুধু হন নাই, প্রকাশ্যে মন্ত্রীকে মোবারকবাদ দিয়ে চলেছেন। আর জনগণ এই গণবিরোধী বাজেট যে গরিব মারার বাজেট বলে চিৎকার করতে শুরু করেছে।’১১

যারা সমাজে অনাদৃত ও বঞ্চিত, তাদের প্রতি তার বিশেষ সহমর্মিতা ছিল। ‘কারাগারের রোজনামচা’ বইটিতে তিনি বিভিন্ন কয়েদির জীবনবৃত্তান্ত, দুঃখ–কষ্ট বর্ণনা করেছেন। বিশেষ করে পাগল কয়েদিদের প্রতি তাঁর মমতাবোধ আমরা লক্ষ করি। জেলের কর্মচারীদের সঙ্গেও তাঁর সম্প্রীতি গড়ে ওঠে। তিনি জেলে নিজ হাতে রান্না করেছেন, বাগান করেছেন এবং তার সঙ্গে ডায়েরিও লিখেছেন। আওয়ামী লীগের অগণিত কর্মীর ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখেরও তিনি খবর রাখতেন। তাঁর দুটি বইয়েই আমরা তাঁর বহু সহকর্মীর এবং আওয়ামী লীগের নাম জানা-অজানা বহু কর্মীর ত্যাগ–তিতিক্ষার বর্ণনা পাই।

বঙ্গবন্ধু একদিকে ছিলেন সাধারণ মানুষের লোক, মানুষের কাছ থেকে তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষার কথা তিনি জেনেছেন, শিখেছেন। অন্যদিকে তিনি ছিলেন জনতার নেতা। সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষাকেই তিনি সামনের দিকে, প্রগতির দিকে নিতে চেয়েছেন। সব বিষয়ে তিনি শেষ ভরসা করতেন মানুষের ওপরে। তাই ১৯৭১ সালের ৭ মার্চে তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণে তিনি জনগণকে আহ্বান করেন, বলেন ‘যার যা আছে তাই নিয়ে’ স্বাধীনতাসংগ্রামে যুক্ত হওয়ার জন্য। জাগ্রত জনতার ওপর তাঁর বিশ্বাস ছিল বলেই তিনি সেদিন বলতে পেরেছিলেন, ‘সাত কোটি মানুষকে দাবায়ে রাখতে পারবা না। আমরা যখন মরতে শিখেছি, তখন কেউ আমাদের দাবাতে পারবা না।...রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেব, এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশা আল্লাহ।’১২

অসাম্প্রদায়িকতা: সকল নাগরিকের সম–অধিকার
যদিও বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে সুসংহত করেছিলেন, কিন্তু তিনি কখনো বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে ঘৃণা সৃষ্টি ও সংঘাতের রাজনীতি করেননি। বহু জাতীয়তাবাদী আন্দোলন এক জাতিকে অন্য জাতির বিরুদ্ধে সহিংস আচরণের দিকে ঠেলে দেয়। কিন্তু বঙ্গবন্ধু শোষকদের হাত থেকে বাঙালির মুক্তি কামনার লক্ষ্যে কাজ করেছেন। বাঙালিকে অন্য কোনো জাতির বিরুদ্ধে সহিংস আচরণে প্ররোচনা দেননি। সম্প্রতি আমরা পশ্চিমের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক দেশে উগ্র জাতীয়তাবাদের উত্থান দেখছি, যেখানে বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে তিক্ততা এবং সংখ্যাগুরুদের সংখ্যালঘুদের প্রতি অসহিষ্ণু মনোভাব লক্ষ করছি। বঙ্গবন্ধুর জাতীয়তাবাদের চিন্তা ছিল এর বিপরীত। তিনি সব গোষ্ঠীর সহাবস্থান এবং সব নাগরিকের সমান অধিকারে বিশ্বাস করতেন। তাঁর আত্মজীবনীতে তিনি নিজেকে একাধারে বাঙালি এবং মানুষ হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। তিনি কোনো অমানবিক কাজের সমর্থন কখনো করেননি। তিনি সব সময় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এবং সহিংসতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন।

বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের প্রথম থেকেই আমরা দেখি তাঁকে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে। ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট কলকাতার প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস ও কলকাতার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন তিনি। সোহরাওয়ার্দী তাঁদেরকে এই দিবসটি শান্তিপূর্ণভাবে পালনের নির্দেশ দিয়েছিলেন যেন সোহরাওয়ার্দী সরকারকে কেউই দোষারোপ করতে না পারে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে কলকাতায় এবং পরে নোয়াখালীতে। কলকাতায় তিনি হিন্দু, মুসলমান দুই সম্প্রদায়ের লোককেই দাঙ্গা দেখে উদ্ধার করার চেষ্টা করেন। এরপর যখন মহাত্মা গান্ধীর সাথে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ফিরিয়ে আনার জন্য সোহরাওয়ার্দী যুক্ত হয়েছিলেন, তখন বঙ্গবন্ধুও সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে সেই প্রচেষ্টায় যুক্ত হন।

১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির পর বঙ্গবন্ধু যখন কলকাতা থেকে চলে আসেন, তখন সোহরাওয়ার্দী তাঁকে বলেন তিনি যেন পূর্ববঙ্গে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার জন্য কাজ করেন, যাতে হিন্দুরা পূর্ববঙ্গ ত্যাগ করে পশ্চিমবঙ্গে চলে আসতে বাধ্য না হয়। সোহরাওয়ার্দী তাঁকে বলেছিলেন:
‘চেষ্টা করো যাতে হিন্দুরা চলে না আসে। ওরা এদিকে এলেই গোলমাল করবে, তাতে মুসলমানরা বাধ্য হয়ে পূর্ব বাংলায় ছুটবে। যদি পশ্চিম বাংলা, বিহার ও আসামের মুসলমান একবার পূর্ব বাংলার দিকে রওনা হয়, তবে...এত লোকের জায়গাটা তোমরা কোথায় দিবা...’১৩

ঢাকায় ফিরে এসে গণতান্ত্রিক যুবলীগে যোগ দিয়ে তিনি সাম্প্রদায়িক মিলনকে একমাত্র কর্মসূচি হিসেবে নেওয়ার ওপর জোর দেন। পূর্ব বাংলায় যাতে দাঙ্গা না হয়, তার জন্য তিনি সব সময়ই সতর্ক ছিলেন। দাঙ্গা বলতে যে শুধু হিন্দু-মুসলমানের দাঙ্গা তাই নয়, সব রকমের দাঙ্গারই তিনি বিরোধী ছিলেন। তাঁর আত্মজীবনীতে লাহোরে ১৯৫৩ সালের কাদিয়ানিদের বিরুদ্ধে দাঙ্গার তিনি নিন্দা করেছেন। ধর্ম নিয়ে রাজনীতির বিপক্ষে ছিলেন তিনি। ১৯৫৪ সালে নারায়ণগঞ্জের আদমজী পাটকলে বাঙালি-অবাঙালি দাঙ্গা যাতে বিস্তৃতি লাভ না করে, তার জন্য তিনি কাজ করেন। ১৯৬৪ সালে ভারতে হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গার পর তিনি সারা বাংলাদেশে দাঙ্গা প্রতিরোধ কমিটি গঠন করেন এবং ‘পূর্ব পাকিস্তান রুখিয়া দাঁড়াও’ শিরোনামে প্রচারপত্র প্রকাশ করেন। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ভাষণেও তিনি জনগণকে সতর্ক করে বলেন:
‘মনে রাখবেন, শত্রুবাহিনী ঢুকেছে, নিজেদের মধ্যে আত্মকলহ সৃষ্টি করবে, লুটপাট করবে। এই বাংলায় হিন্দু-মুসলমান, বাঙালি-অবাঙালি যাঁরা আছেন, তাঁরা আমাদের ভাই, তাঁদের রক্ষার দায়িত্ব আমাদের ওপরে, আমাদের যেন বদনাম না হয়।’ ১৪

ব্যক্তিগত জীবনে বঙ্গবন্ধু নামাজ পড়তেন, রোজা রাখতেন, কোরআন শরিফ পড়তেন। তিনি সব নাগরিকের নিজ নিজ ধর্ম পালনের অধিকারে বিশ্বাসী ছিলেন। তবে তিনি রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহারের বিরোধী ছিলেন।

সমাজতন্ত্র: শোষণমুক্তি ও বৈষম্যহীনতা
তাঁর আত্মজীবনীতে বঙ্গবন্ধু লিখছেন:
‘আমি নিজে কমিউনিস্ট নই, তবে সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করি এবং পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে বিশ্বাস করি না। একে আমি শোষণের যন্ত্র হিসাবে মনে করি। এই পুঁজিপতি সৃষ্টির অর্থনীতি যত দিন দুনিয়ায় থাকবে, তত দিন দুনিয়ার মানুষের উপর থেকে শোষণ বন্ধ হতে পারে না।’ ১৫
সমাজতন্ত্র বলতে তিনি প্রাধানত শোষণমুক্ত এবং বৈষম্যহীন একটা ব্যবস্থার কথা ভাবতেন। ১৯৫২ সালে চীন যাবার পর চীন এবং পাকিস্তানের মধ্যে যে পার্থক্য তিনি দেখেছেন, তা তাঁর মনে গভীর দাগ কেটেছে। এই দুই দেশের পার্থক্য সম্বন্ধে তিনি লিখছেন:
‘তাদের সঙ্গে আমাদের পার্থক্য হল তাদের জনগণ জানতে পারল ও অনুভব করতে পারল এই দেশ ও এ দেশের সম্পদ তাদের। আর আমাদের জনগণ বুঝতে আরম্ভ করল, জাতীয় সম্পদ বিশেষ গোষ্ঠীর আর তারা যেন কেউই নন।’১৬

শোষণমুক্তি এবং বৈষম্য দূরীকরণে সরকারের যে দায়িত্ব আছে, তা তিনি বিশ্বাস করতেন। চীনে গিয়ে তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন চীন সরকার জনসাধারণের জন্য কী কী কাজ করছে, সে দেশে প্রাধান্য পাচ্ছে শিল্পকারখানার উন্নতি, শৌখিন দ্রব্য নয়।
তিনি লিখছেন:
‘ভূমিহীন কৃষক জমির মালিক হয়েছে। আজ চীন দেশ কৃষক–মজুরের দেশ। শোষক শ্রেণি শেষ হয়ে গেছে।’১৭
‘নতুন নতুন স্কুল, কলেজ গড়ে উঠেছে চারিদিকে। ছোট্ট ছোট্ট ছেলেমেয়েদের শিক্ষার ভার সরকার নিয়েছে।’ ১৮
‘কারাগারের রোজনামচা’য়ও তিনি লিখেছেন বৈষম্যহীনতার কথা। তিনি লিখেছেন যে কারাগারে তিনি সবার সঙ্গে একসঙ্গে খেতেন, যেমন ব্যবস্থা ছিল তাঁর নিজ বাড়িতে:
‘আমি যাহা খাই ওদের না দিয়ে খাই না। আমার বাড়িতেও একই নিয়ম।...আজ নতুন নতুন শিল্পপতিদের ও ব্যবসায়ীদের বাড়িতেও দুই পাক হয়। সাহেবদের জন্য আলাদা, চাকরদের জন্য আলাদা। আমাদের দেশে যখন একচেটিয়া সামন্তবাদ ছিল, তখন জমিদার, তালুকদারদের বাড়িতেও এই ব্যবস্থা ছিল না। আজ সামন্ততন্ত্রের কবরের উপর শিল্প ও বাণিজ্য সভ্যতার সৌধ গড়ে উঠতে শুরু করেছে, তখনই এই রকম মানসিক পরিবর্তনও শুরু হয়েছে। সামন্ততন্ত্রের শোষণের চেয়েও এই শোষণ ভয়াবহ।’১৯
স্বাধীনতার পর তাঁর স্বপ্নের সোনার বাংলায় তিনি কোনো বৈষম্য দেখতে চাননি। ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে তিনি বলেন:
‘বাংলাদেশে মানুষে মানুষে, ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে বৈষম্য থাকবে না। সম্পদের বণ্টনব্যবস্থায় সমতা আনতে হবে এবং উচ্চতর আয় ও নিম্নতম উপার্জনের ক্ষেত্রে যে আকাশচুম্বী বৈষম্য এত দিন ধরে বিরাজ করছিল, সেটা দূর করতে হবে।’

বঙ্গবন্ধুর চিন্তাধারা ও সংবিধানের চার মূলনীতি
বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক চিন্তাধারার যে চারটি বৈশিষ্ট্য নিয়ে আমি আলোচনা করেছি, তার প্রতিফলন আমরা আমাদের সংবিধানের চার মূলনীতিতে দেখতে পাই। তাঁর কর্মকাণ্ডের লক্ষ্য তিনি খুব সহজ দুটি শব্দে প্রায়ই ব্যক্ত করতেন। তিনি প্রায়ই বলতেন তাঁর লক্ষ্য হচ্ছে ‘সোনার বাংলা গড়ে তোলা’, কিংবা তিনি বলতেন ‘দুঃখী মানুষের মুখে তিনি হাসি ফোটাতে চান’। বঙ্গবন্ধু তাঁর জনসভায় খুবই সরল ভাষায় বক্তৃতা করতেন। তাই তাঁর বক্তব্য ছিল সুস্পষ্ট। যেমন বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরপরই ১৯৭২ সালে এক জনসভায় তিনি বলেন:

‘আমি কী চাই? আমি চাই বাংলার মানুষ পেট ভরে ভাত খাক। আমি কী চাই? আমার বাংলার মানুষ সুখী হোক। আমি কী চাই? আমার বাংলার মানুষ হেসেখেলে বেড়াক। আমি কী চাই? আমার সোনার বাংলার মানুষ আবার প্রাণভরে হাসুক।’
তাঁর বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার কিংবা অন্য তাত্ত্বিক বিষয় নিয়ে মাথা ঘামাতেন না। তিনি ঠিকই জানতেন জীবনে একটি হাসি কত অমূল্য এবং সেই অমূল্য সম্পদই অর্জন করাটা ছিল তাঁর লক্ষ্য।

তথ্যনির্দেশ
১. শেখ মুজিবুর রহমান, অসমাপ্ত আত্মজীবনী, ঢাকা, দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, ২০১২, পৃ ৪১
২. অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃ i
৩. আত্মজীবনী, পৃ ২২
৪. আত্মজীবনী, পৃ ১৭
৫. আত্মজীবনী, পৃ ৩৫
৬. আত্মজীবনী, পৃ ১২০
৭. আত্মজীবনী, পৃ ২৯৪
৮. আত্মজীবনী, পৃ ২৪০-২৪১
৯. শেখ মুজিবুর রহমান, কারাগারের রোজনামচা, ঢাকা, বাংলা একাডেমি, ২০১৭, পৃ ৬১-৬২
১০. https://bn.wikipedia.org/wiki/ সাতই মার্চের ভাষণ
১১. কারাগারের রোজনামচা। পৃ ৮৭
১২. https://bn.wikipedia.org/wiki/ সাতই মার্চের ভাষণ
১৩. আত্মজীবনী, প ৮২
১৪. https://bn.wikipedia.org/wiki/ সাতই মার্চের ভাষণ
১৫. আত্মজীবনী, পৃ ২৩৪
১৬. আত্মজীবনী, পৃ ২৩৪
১৭. আত্মজীবনী, পৃ ২৩০
১৮. আত্মজীবনী, পৃ ২৩৩
১৯. কারাগারের রোজনামচা, পৃ ১১


 

রওনক জাহান: সম্মানীয় ফেলো, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)

Thursday, April 1, 2021

প্রাচ্যের রাষ্ট্রচিন্তার অর্থ, প্রকৃতি, পরিধি ও বৈশিষ্ট্য

 প্রাচ্যের রাষ্ট্রচিন্তাঃ

ভৌগোলিক অবস্থানের ভিত্তিতে রাষ্ট্রচিন্তাকে দুইভাগে ভাগ করে আলোচনা করা হয়। যথা- পাশ্চাত্যের রাষ্ট্রচিন্তা এবং প্রাচ্যের রাষ্ট্রচিন্তা। ইউরোপীয় দেশসমূহের চিন্তাবিদদের বিপরীতে প্রাচ্যের তথা মিশর, পারস্য, চীন ও ভারতের চিন্তাবিদদের যে রাজনৈতিক চিন্তাধারা তাই প্রাচ্যের রাষ্ট্রচিন্তা নামে পরিচিত। প্রাচ্যের রাষ্ট্রচিন্তায় মুসলিম রাষ্ট্রচিন্তাবিদদের পদচারণাই মুখ্য।

অন্যভাবে বলা যায়, প্রাচ্যের যে সকল মনীষী ইসলামের বিধিবিধানের আলোকে রাষ্ট্রীয় কাঠামো বিনির্মাণের লক্ষ্যে তাদের চিন্তাধারা ব্যক্ত করতে গিয়ে ইসলাম ভিত্তিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার উপর গুরুত্বারোপ করেন তাই প্রাচ্যের রাষ্ট্রচিন্তা। প্রাচ্যের রাষ্ট্রচিন্তায় আরব, আফ্রিকা, পারস্য, চীন ও ভারতের চিন্তাবিদদের চিন্তাধারাও অন্তর্ভুক্ত।

প্রাচ্যের রাষ্ট্রচিন্তার বৈশিষ্ট্যঃ

১। ধর্মের প্রাধান্যঃ রাষ্ট্রচিন্তার মধ্যযুগে যেমন খ্রিস্টধর্মের প্রভাব বিদ্যমান ছিল তেমনি প্রাচ্যের রাষ্ট্রচিন্তায় ধর্মের প্রাধান্য লক্ষণীয়। যেমন- মিশর, চীন, ভারতের রাষ্ট্রচিন্তা ধর্মের ভিত্তিতেই বিকশিত হয়েছে। আল-ফারাবী, আল-গাজ্জালী, ইবনে সিনা, ইবনে খালদুন প্রমুখ রাষ্ট্রচিন্তাকে ইসলামি ভাবধারার সাথে সামঞ্জস্য বিধান করেই আলোচনা করেছেন।

২। নৈতিকতার প্রাধান্যঃ প্রাচ্যের রাষ্ট্রচিন্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো নৈতিক বিধিবিধানের প্রাধান্য। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রের আলোচনায়, কনফুসিয়াসের জীবন ব্যবস্থায়, মাওবাদের বৈশিষ্ট্যও নৈতিকতাপূর্ণ। আর ইসলামি রাষ্ট্রচিন্তার উৎস যেহেতু ধর্ম, সুতরাং সেখানে নৈতিকতাই মূখ্য।
৩। ইসলামি আইনঃ ইসলামি আইনের মূল উৎস কুরআন, সুন্নাহ্, ইজমা ও কিয়াস। যা প্রাচ্যের রাষ্ট্রচিন্তায়ও বিশেষ অবদান রেখেছে।
৪। খিলাফতঃ প্রাচ্যের রাষ্ট্রচিন্তায় এক বিশেষ স্থান দখল করে আছে খিলাফত তথা ইসলামি সরকার ও প্রশাসন ব্যবস্থা।
৫। মৌলিক ধারণায় ইসলামের প্রাধান্যঃ প্রাচ্যের রাষ্ট্রচিন্তার মৌলিক ধারণা যেমন- রাষ্ট্র, সরকার, সামজিক ন্যায় বিচার, মৌলিক মানবাধিকার, স্বাধীনতা, সাম্য, সন্ত্রাসবাদ, মৌলবাদ, সার্বভৌমত্ব প্রভৃতিতে ইসলামের প্রাধান্য বিদ্যমান।
৬। ইসলামি ধর্মতত্ত্বের সাথে গ্রিকদর্শনের সমন্বয়সাধনঃ প্রাচ্যের রাষ্ট্রচিন্তার আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো ইসলামি ধর্মতত্ত্বের সাথে গ্রিক সাহিত্য ও দর্শনের সমন্বয় সাধনের প্রচেষ্টা। আল-ফারাবী, ইমাম গাজ্জালী, ইবনে রুশদ্, ইবনে সিনা প্রমুখ মুসলিম চিন্তাবিদ এই প্রচেষ্টায় ভূমিকা রেখেছেন।
৭। রক্ষণশীলতাঃ প্রাচ্যের রাষ্ট্রচিন্তায় রক্ষণশীলতার বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। যেমন- কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র, কনফুসিয়াসের দর্শন এমনকি গান্ধীর দর্শনেও রক্ষণশীলতার আভাস পাওয়া যায়। তবে মাওবাদ, এম এন রায়ের দর্শনে বৈপ্লবিক চিন্তার আভাস পাওয়া যায়।
 

প্রাচ্যের রাষ্ট্রচিন্তার প্রকৃতি ও পরিধিঃ

১। ইসলাম সম্পর্কে আলোচনাঃ ইসলাম কি, এর উৎসমূল, বিকাশধারা, বৈশিষ্ট্য, ইসলাম সম্পর্কে পাশ্চাত্যের ধারণা, ইসলাম কিভাবে মানুষের ব্যক্তিগত, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জীবনের নিশ্চয়তা বিধান করে ইত্যাদি বিষয় প্রাচ্যের রাষ্ট্রচিন্তার কেন্দ্রবিন্দু।
২।ইসলামি রাজনৈতিক ব্যবস্থাঃ ইসলামি রাজনৈতিক ব্যবস্থা কি, ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মূলনীতি, ইসলামি রাষ্ট্র ব্যবস্থার সাথে পাশ্চাত্যের আধুনিক গণতান্ত্রিক, পুঁজিবাদী ও সমাজতাত্ত্বিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার তুলনা, ইসলামি আইনসভা, রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব-কর্তব্য, নির্বাচন পদ্ধতি, নাগরিকদের অধিকার, দায়িত্ব-কর্তব্য, মুসলিম রাষ্ট্রে অমুসলিমদের অধিকার ও কর্তব্য প্রভৃতি বিষয় প্রাচ্যের রাষ্ট্রচিন্তার আলোচনার ক্ষেত্র।
৩।ইসলামি অর্থব্যবস্থাঃ ইসলামি অর্থব্যবস্থার পরিচয়, এর বৈশিষ্ট্য, ইসলামি রাষ্ট্রে আয়ের উৎস ও ব্যয়ের খাত, ব্যবসা-বাণিজ্য, যাকাত, ব্যাংকিং ব্যবস্থা, সুদ-মুনাফা এবং পাশ্চাত্যের প্রচলিত অর্থব্যবস্থার সাথে ইসলামি অর্থব্যবস্থার তুলনামূলক আলোচনা করে প্রাচ্যের রাষ্ট্রচিন্তা।
৪। ইসলামি রাষ্ট্রচিন্তারর মৌল ধারণাঃ
৫। নৈতিক বিধানাবলি নিয়ে আলোচনাঃ প্রাচ্যের রাষ্ট্রচিন্তায় নৈতিক বিধানের উপর গুরুত্বারোপ করে। কেননা উন্নত সমাজের জন্য উন্নত মানব মনের দরকার। UNESCO তার সংবিধানে বলেছে, এ পৃথিবী থেকে যুদ্ধের সম্ভাবনা দূর করতে হলে মানব মনকে উন্নত করতে হবে।
৬। ইসলামি আইন সম্পর্কে আলোকপাতঃ
৭। যুদ্ধ, শান্তি ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গিঃ সারা বিশ্ব থেকে অন্যায়-অসংগত যুদ্ধ থেকে মুক্ত রাখার জন্য ইসলামের দিকনির্দেশনা, বিশ্বকে বিশ্ব মানবের জন্য সুখী, সমৃদ্ধশালী, শান্তিময় আবাসভূমি হিসাবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও ইসলামের সুস্পষ্ট নীতি ও দিকনির্দেশনা রয়েছে। এসকল বিষয় নিয়ে প্রাচ্যের রাষ্ট্রচিন্তায় আলোচনা রয়েছে।
৮। আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাঃ ইসলামের দৃষ্টিতে আন্তর্জাতিকতা, বিশ্বভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা, বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় মুসলিম উম্মাহের ভূমিকা, রাষ্ট্রে-রাষ্ট্রে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠায় ইসলাম ইত্যাদি বিষয় নিয়েও প্রাচ্যের রাষ্ট্রচিন্তা আলোকপাত করে থাকে।
 
আন্ত-পরিচিতি ও আত্নশুদ্ধি থেকে শুরু করে পারলৌকিক মুক্তি তথা ব্যক্তিগত, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সকল বিষয়ই প্রাচ্যের রাষ্ট্রচিন্তায় অন্তর্ভুক্ত।
 
 
   (মোঃ হেলাল উদ্দিন, ৩৩ তম বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা)