Showing posts with label পৌরনীতি ও সুশাসন ২য় পত্র. Show all posts
Showing posts with label পৌরনীতি ও সুশাসন ২য় পত্র. Show all posts

Friday, December 9, 2022

সরকার কি? সরকারের শ্রেণি বিভাগ -- মোঃ হেলাল উদ্দিন


A government ia a spokesman to the state. ---- Laski.

রাষ্ট্র একটি তত্ত্বগত বা বিমূর্ত ধারনা। কেননা এর কোন বাস্তব রুপ নেই। সরকার হলো রাষ্ট্রের রুপকার। সরকারের মাধ্যমে রাষ্ট্র তার ইচ্ছাকে প্রকাশ করে এবং উদ্দেশ্যকে কার্যকর করে। সরকারই রাষ্ট্রের ইচ্ছাকে আইনে পরিনত করে এবং আইনের সাহায্যে শান্তি শৃঙ্খলা রক্ষা করে।
 

সরকারের সংজ্ঞাঃ
যার মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালিত হয় তাকে সরকার বলে। অন্যভাবে বলা যায়, আইন বিভাগ, শাসন বিভাগ ও বিচার বিভাগের সকল কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সমষ্টিকে সরকার বলে।
উইলোবি বলেছেন, সরকার হলো একটি প্রতিষ্ঠান, যার মাধ্যমে রাষ্ট্র তার ইচ্ছাকে গঠন ও কার্যকর করে।
মোটকথা, রাষ্ট্রের ইচ্ছা, অনিচ্ছা, বিধি-নিষেধ সমূহ যে প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রকাশিত হয় তাকে সরকার বলে।
 
সরকারের শ্রেণি বিভাগঃ
প্রাচীনকাল থেকে সরকারকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়ে থাকে। যেমন- হেরোডোটাসের মতে সরকারের তিনটি ধরন হলোঃ রাজতন্ত্র, ধনিকতন্ত্র এবং গণতন্ত্র।
প্লেটো তার রিপাবলিক গ্রন্থে তিনটি উত্তম এবং তিনটি বিকৃত রুপ সরকারের কথা বলেছেন। সরকারের উত্তম তিনটি রুপ হলোঃ রাজতন্ত্র, অভিজাততন্ত্র এবং স্বাভাবিক গণতন্ত্র। আর সরকারের বিকৃত রুপ তিনটি হলোঃ স্বেচ্ছাচারতন্ত্র, ধনিকতন্ত্র এবং উগ্র গণতন্ত্র
এরিস্টটল সংখ্যানীতি ও উদ্দেশ্যনীতির ভিত্তিতে সরকারকে বিভিন্ন শ্রেণিতে বিভক্ত করেছেন। সংখ্যানীতিতে সরকার হলো একজনের শাসন, কয়েক জনের শাসন এবং অনেকের শাসন।
উদ্দেশ্যনীতির ভিত্তিতে সরকারের স্বাভাবিক এবং বিকৃত এই দুই রুপে সরকারকে ছয় ভাগে ভাগ করেছেন। স্বাভাবিক রুপে সরকার হলোঃ রাজতন্ত্র, অভিজাততন্ত্র এবং মধ্যতন্ত্র। আর বিকৃত রুপে সরকার হলোঃ স্বৈরতন্ত্র, ধনীকতন্ত্র এবং গণতন্ত্র।
 
আধুনিক যুগেও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা সরকারকে বিভিন্ন শ্রেণিতে বিভক্ত করেছেন। তারা সরকারকে প্রথমত তিন ভাগে ভাগ করেছেন। যথাঃ স্বৈরতন্ত্র, একনায়কতন্ত্র এবং গণতন্ত্র।
স্বৈরতন্ত্রকে আবার তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে। যেমনঃ রাজতন্ত্র, সামরিকতন্ত্র এবং অভিজাততন্ত্র।
একনায়কতন্ত্রকেও তিনটি ভাগে বিভক্ত করেছেন। যথাঃ ব্যক্তিগত, দলগত এবং শ্রেণিগত।
গণতন্ত্রও আবার দুই ধরনের। যথাঃ নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্র এবং প্রজাতন্ত্র।
 
মোঃ হেলাল উদ্দিন
৩৩তম বিসিএস (নাধারণ শিক্ষা) ক্যাডার কর্মকর্তা

Friday, April 2, 2021

বাংলাদেশ সংবিধানের প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্য

সংবিধান প্রণয়নের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

একটি রাষ্ট্র পরিচালনা করতে যে সকল নিয়ম নীতির দরকার হয় তার লিখিত রুপই হলো সংবিধান। এই সংবিধান প্রণয়নের জন্য ১৯৭২ সালের ২৩ মার্চ 'বাংলাদেশ গণপরিষদ আদেশ' জারি হয়। যার সদস্য সংখ্যা ছিল ৪০৩ জন। এদের মধ্যে ৪০০ জন আওয়ামী লীগ দলীয়, ১ জন ছিলেন ন্যাপ এবং বাকি ২ জন ছিলেন স্বতন্ত্র। ১০ এপ্রিল ১৯৭২ গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন বসে এবং ১১ এপ্রিল ড. কামাল হোসেনকে সভাপতি করে ৩৪ সদস্য বিশিষ্ট সংবিধান প্রণয়ন কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির একমাত্র বিরোধী দলীয় সদস্য ছিলেন সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত। কমিটি ৪৭ টি বৈঠক করে ১০ জুন ১৯৭২ সালে প্রাথমিক খসড়া প্রণয়ন করেন। ১১ অক্টোবর ১৯৭২ কমিটির শেষ বৈঠকে খসড়া সংবিধানের চূড়ান্ত রুপ গৃহীত হয়। ১৯ অক্টোবর সংবিধানের উপর প্রথম পাঠ এবং ৩১ অক্টোবর দ্বিতীয় পাঠ শুরু হয়। যা চলে ৩ নভেম্বর পর্যন্ত। ৪ নভেম্বর সংবিধানের উপর ৩য় ও সর্বশেষ পাঠ শুরু হয় এবং মাত্র দুই ঘন্টার মধ্যে তা শেষ হলে ঐ দিনই বাংলাদেশ সংবিধান গণপরিষদে গৃহীত হয়। এই সংবিধান ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর, প্রথম বিজয় দিবসের দিন থেকে কার্যকর হয়।

বাংলাদেশ সংবিধানের বৈশিষ্ট্য সমূহঃ

১) লিখিত সংবিধানঃ বাংলাদেশ সংবিধান লিখিত। ১৫৩ অনুচ্ছেদ বিশিষ্ট ৮২ পৃষ্ঠার এ সংবিধান ১১ টি ভাগে বিভক্ত ১ টি প্রস্তাবনাসহ ৪ টি তফসিল ছিল।
২) দুষ্পরিবর্তনীয় সংবিধানঃ বাংলাদেশের সংবিধান দুষ্পরিবর্তনীয়। সাধারণত সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে সংবিধানে প্রয়োজনীয় সংশোধনী প্রস্তাব পাস করানো যায়।
৩) রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিঃ সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি সম্পর্কে বলা হয়েছে। জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা এই চারটি বাংলাদেশ সংবিধানের মূলনীতি।
৪) মৌলিক অধিকারঃ সংবিধানের তৃতীয় ভাগে মৌলিক অধিকারের কথা বলা হয়েছে। যা আদালত কর্তৃক বলবৎ যোগ্য।
৫) এককেন্দ্রিক সরকারঃ সংবিধানের বাংলাদেশকে একটি এককেন্দ্রিক রাষ্ট্র হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারই সকল ক্ষমতার অধিকারী।
৬) প্রজানন্ত্রঃ বাংলাদেশ একটি প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র। রাষ্ট্রপতি হবেন রাষ্ট্রপ্রধান। তার নামেই রাষ্ট্রের শাসনকার্য পরিচালিত হবে।
৭) সংবিধানের প্রাধান্যঃ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন হলো সংবিধান। বাংলাদেশ সংবিধানের ৭ নং অনুচ্ছেদে আইনের ক্ষেত্রে সংবিধানের প্রাধান্য দেয়া হয়েছে এবং ৭ক অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে সংবিধান বাতিল, স্থগিতককরণ ইত্যাদি অপরাধ।
৮) সংসদীয় গণতন্ত্রঃ বাংলাদেশ সংবিধানে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রবর্তন করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে মন্ত্রীসভার হাতে দেশ পরিচালনার ভার অর্পণ করা হয়। জাতীয় সংসদ সকল ক্ষমতার উৎস এবং মন্ত্রীসভা সংসদের নিকট দায়ী।
৯) ন্যায়পালঃ সংবিধানে ন্যায়পালের কথা বলা হয়েছে। ন্যায়পাল সুপ্রিম কোর্টের একজন বিচারপতির সমান ক্ষমতার অধিকারি হবেন। তিনি বাংলাদেশ সরকারের যেকোন কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ শুনবেন এবং যেকোন কর্তৃপক্ষকে তার নিকট জবাবদিহি করতে বাধ্য করতে পারবেন।
১০) মালিকানার নীতিঃ বাংলাদেশ সংবিধানে তিন ধরনের মালিকানার কথা বলা হয়েছে- রাষ্ট্রীয়, সমবয় ও ব্যক্তিগত মালিকানা।
১১) প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালঃ সাধারণ বিচার বিভাগ ছাড়াও সংবিধানে প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালের কথা বলা হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তা ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানসমূহের কর্মকর্তাদের বিভিন্ন কার্যক্রম এর এখতিয়ারভুক্ত।
১২) সর্বজনীন ভোটাধিকারঃ সংবিধানে জাতি, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ১৮ বছর বয়স্ক যেকোন নাগরিকের ভোটাধিকারের কথা বলা হয়েছে।
১৩) জনগণের সার্বভৌমত্বঃ সংবিধানে বলা হয়েছে, জনগণই সকল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার উৎস। জনগণ প্রত্যক্ষ বা প্রতিনিধি নির্বাচনের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা পরিচালনা করবে।
১৪) এককক্ষবিশিষ্ট আইনসভাঃ বাংলাদেশ সংবিধানে 'জাতীয় সংসদ' নামে এককক্ষবিশিষ্ট আইনসভার ব্যবস্থা করা হয়। যার সদস্য সংখ্যা হবে ৩০০ জন প্রত্যক্ষভাবে নির্বাচিত এবং ১৫ জন সংরক্ষিত মহিলা, যা বর্তমানে ৫০ জন।
১৫) বিচার বিভাগঃ বিচার সংক্রান্ত দায়িত্ব বিচার বিভাগের উপর ন্যস্ত থাকবে। বিচার বিভাগের শীর্ষে থাকবে সুপ্রিম কোর্ট। আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগ নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট গঠিত হবে।
 
বাংলাদেশ সংবিধানের আরো বৈশিষ্ট্যের মধ্যে রয়েছে, সংবিধানের মৌলিক বিধানাবলি সংশোধন অযোগ্য, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ন্যায়বিচার, দলীয় শৃঙ্খলা, রাষ্ট্রভাষা, জাতীয় সংগীত, প্রতীক ও পতাকা, রাজধানী, নাগরিকত্ব ইত্যাদি।
 


    (মোঃ হেলাল উদ্দিন, ৩৩ তম বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা) 

Wednesday, March 31, 2021

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

 সংক্ষিপ্ত জীবনীঃ

১৭ই মার্চ, ১৯২০ সালে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় শেখ লুৎফুর রহমান এবং সায়রা বেগমের ঘরে জন্ম নেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ছয় ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। গোপালগঞ্জ পাবলিক স্কুল ও কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে পড়াশনা শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক পাশ করেন। ১৮ বছর বয়সে বেগম ফজিলাতুন্নেসার সাথে তাঁর বিয়ে হয়। তাদের ২ মেয়ে - শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা এবং তিন ছেলে- শেখ কামাল, শেখ জামাল ও শেখ রাসেল।
অল্পবয়স থেকেই তাঁর রাজনৈতিক প্রতিভার প্রকাশ ঘটতে থাকে। ১৯৪০ সালে তিনি নিখিল ভারত মুসলিম লীগের ছাত্র সংগঠন নিখিল ভারত মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনে যোগ দেন। কট্টরপন্থী এই সংগঠন ছেড়ে ১৯৪৩ সালে যোগ দেন উদারপন্থী ও প্রগতিশীল সংগঠন বেঙ্গল মুসলিম লীগে। এখানেই সান্নিধ্যে আসেন হুসেইন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালীন সময়ে রক্ষণশীল কট্টরপন্থী নিখিল ভারত মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনের কর্তৃত্ব খর্ব করতে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্র লীগ।
ভাষা আন্দোলনের সময় রাজনৈতিক নেতা হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন শেখ মুজিব। ১৯৪৮ সালে ভাষার প্রশ্নে তাঁর নেতৃত্বেই প্রথম প্রতিবাদ এবং ছাত্র ধর্মঘট শুরু হয় যা চূড়ান্ত রূপ নেয় ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে।
পঞ্চাশের দশক তাঁর রাজনৈতিক উত্থানের কাল। ধীরে ধীরে তিনি হয়ে উঠেন দূরদর্শীতা এবং প্রজ্ঞাসম্পন্ন এক কুশলী রাজনৈতিক নেতা। এসময় শেখ মুজিব মুসলিম লীগ ছেড়ে দেন এবং হোসেন সোহরাওয়ার্দী এবং মাওলানা ভাসানীর সাথে মিলে গঠন করেন আওয়ামী মুসলিম লীগ। তিনি দলের প্রথম যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৫৩ সালে তিনি দলের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান। ১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হয়ে যুক্তফ্রন্ট সরকারের কৃষি মন্ত্রী হন মুজিব। ১৯৫৬ সালে কোয়ালিশন সরকারের মন্ত্রিসভায় শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান তিনি।
১৯৬৩ সালে হোসেন সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর পর আওয়ামী মুসলিম লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন শেখ মুজিব। ১৯৬৬ সালে লাহোরে অনুষ্ঠিত বিরোধী দলগুলোর জাতীয় সম্মেলনে শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক ৬ দফা দাবি উত্থাপন করেন। এই ছয় দফা ছিল পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্ত্বশাসনের রূপরেখা।
মুজিবের ৬ দফার প্রতি জনগণের ব্যাপক সমর্থনে ভীত হয়ে তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় গ্রেপ্তার শেখ মুজিবকে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে বাংলার সমস্ত জনগণ। জনরোষের কাছে নতি স্বীকার করে এক পর্যায়ে শোষকগোষ্ঠী তাঁকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয় । ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে শেখ মুজিবুর রহমানকে গণসম্বর্ধনা দেওয়া হয়৷সেখানেই উত্থাপিত হয় এগার দফা দাবি যার মধ্যে ছয় দফার সবগুলোই দফাই অন্তর্ভুক্ত ছিল। লাখো মানুষের এই জমায়েতে শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়৷
১৯৬৯ সালের ৫ ডিসেম্বর আয়োজিত এক জনসভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব পূর্ব বাংলার নামকরণ করেন ‘বাংলাদেশ’। তিনি বলেন, “জনগণের পক্ষ হইতে আমি ঘোষণা করিতেছি- আজ হইতে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশটির নাম পূর্ব পাকিস্তানের পরিবর্তে শুধুমাত্র বাংলাদেশ”।
১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বরে সাধারণ নির্বাচনে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে জাতীয় পরিষদের ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসন এবং প্রাদেশিক পরিষদের ৩১০টি আসনের মধ্যে ৩০৫টি আসন লাভ করে। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী মুজিবের স্বায়ত্বশাসনের নীতির পুরোপুরি বিপক্ষে ছিলো। আওয়ামী লীগের সরকার গঠন ঠেকাতে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান সংসদের অধিবেশন ডাকা নিয়ে টালবাহানা শুরু করেন। শেখ মুজিব তখনই বুঝে যান যে, পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের দুঃশাসনের অবসান ঘটাতে লড়াইয়ের কোনো বিকল্প নেই।
১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে এক ঐতিহাসিক ভাষণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ডাক দেন। রেসকোর্সের জনসমুদ্রে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম”। ঐতিহাসিক এ ভাষণে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতিকে শৃংখল মুক্তির আহ্বান জানিয়ে ঘোষণা করেন, “রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেবো। এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ্। ... প্রত্যেকে ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তোলো। যার যা কিছু আছে তাই নিয়েই শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে”।
বঙ্গবন্ধুর ডাকে উত্তাল হয়ে ওঠে সারা বাংলা। মুজিবের নেতৃত্বে বাঙ্গালি জাতির এই জাগরণে ভীত ইয়াহিয়া খান সামরিক আইন জারি করেন, নিষিদ্ধ করেন আওয়ামী লীগকে এবং শেখ মুজিবকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেন।
এরপর আসে ২৫ মার্চ, ১৯৭১। রাতের অন্ধকারে নিরীহ নিরস্ত্র বাঙালীর ওপর শকুনের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে পাকিস্তানি সেনারা; শুরু করে অপারেশন সার্চলাইট নামে ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাকান্ড।অশীতিপর বৃদ্ধ থেকে কোলের শিশু- কেউ রক্ষা পায়না পাক হায়েনাদের নারকীয়তা থেকে। মুজিবকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়া হয় পশ্চিম পাকিস্তানে। অবশ্য তার আগেই, পাক বাহিনীর অভিযান শুরু হলে ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন এবং জনগণকে সর্বাত্মক আন্দোলনে সামিল হতে আহ্বান জানান।
১৯৭১ সালের ১৭ই এপ্রিল গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রথম সরকার গঠিত হয় এবং শেখ মুজিবকে রাষ্ট্রপতি করা হয়। তাঁর অনুপস্থিতিতে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম। এ সরকারের অধীনেই গঠিত হয় মুক্তিবাহিনী এবং শুরু হয় পাক সেনাদের প্রতিহত করার পালা। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের পর, ৩০ লক্ষ বাঙ্গালীর প্রাণের বিনিময়ে অবশেষে আসে বিজয়। ১৬ ডিসেম্বর সেই সোহরাওয়ার্দী উদ্যান যেখান থেকে স্বাধীনতা সংগ্রামের ডাক দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু, সেখানেই বাংলাদেশ-ভারত মিত্রবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পন করে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী। পৃথিবীর মানচিত্রে জন্ম নেয় বাংলাদেশ নামের নতুন একটি দেশ।
১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু ফিরে আসেন তাঁর প্রিয় মাতৃভূমিতে, তাঁর স্বপ্নের স্বাধীন দেশে। স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্টা, জাতির জনককে বরণ করতে লাখো মানুষের ঢল নামে বিমানবন্দরে। দেশে ফিরেই যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে ঝাঁপিয়ে পড়েন বঙ্গবন্ধু । মানবিক বিপর্যয় মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সাহায্যের আবেদন জানান বঙ্গবন্ধু এবং খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সাহায্য আসতে শুরু করে। শুরু হয় বাংলাদেশ পুনর্গঠনের এক নতুন যুদ্ধ। এরই মধ্যে সক্রিয় হয়ে ওঠে স্বাধীনতাবিরোধী একটি চক্র। মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতাকারী দেশীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রের প্রত্যক্ষ ইন্ধনে রাজনৈতিক অস্থিতশীলতা সৃষ্টি করতে উঠেপড়ে লাগে এই চক্রটি। এসময় বঙ্গবন্ধু বুঝতে পারেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। ১৯৭৪ সালে তিনি সকল রাজনৈতিক দলকে এক ছাতার নীচে আনতে প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ বা ‘বাকশাল'। এর ফলে দেশে স্থিতিশীলতা আসতে শুরু করে। সমস্ত দেশ যখন ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠে ঘুরে দাঁড়াচ্ছিল, ঠিখ তখনই আসে আরেকটি আঘাত।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট মধ্যরাতে একদল বিপথগামী সেনা কর্মকর্তা হত্যা করে শেখ মুজিব এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের। কেবল তাঁর দুই মেয়ে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা সেই সময় দেশের বাইরে থাকায় বেঁচে যান। সদ্য স্বাধীন জাতির জীবনে এক অপূরণীয় ক্ষতি নিয়ে আসে এই জঘন্য হত্যাকাণ্ড, তৈরি করে রাজনৈতিক শূণ্যতা, ব্যাহত হয় গণতান্ত্রিক উন্নয়নের ধারা।
 

 (মোঃ হেলাল উদ্দিন, ৩৩ তম বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা)
 

বঙ্গভঙ্গ, বঙ্গভঙ্গের কারণ ও ফলাফল

বঙ্গভঙ্গ

বঙ্গভঙ্গ পূর্বে 'বাংলা প্রেসিডেন্সী' নামে যে বৃহৎ আয়তনবিশিষ্ট বঙ্গ প্রদেশ ছিল তার পূর্বাঞ্চলের ৩টি বিভাগ_ঢাকা, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম ছিল পশ্চিমাঞ্চলের পশ্চাদভূমি। পূর্ববাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম সমাজ বহুদিন ধরে এর বিভক্তি কামনা করে আসছিল। লর্ড কার্জনের নিকট নবাব স্যার সলিমুলস্নাহ ভারতের মুসলিম নেতাদের নিয়ে এর বিভক্তি দাবি করেন। তদানীনত্মন রাজনৈতিক প্রেৰাপটে সুচতুর ইংরেজ সরকার এ দাবি বাসত্মবায়নে মনোযোগ দেয়। ইংরেজ সরকার কয়েকটি কারণের ওপর ভিত্তি করে ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর ঢাকা, রাজশাহী এবং চট্টগ্রামের সাথে আসামকে যুক্ত করে 'পূর্ববঙ্গ ও আসাম' নামে একটি নতুন প্রদেশ গঠন করে ঢাকাকে এর রাজধানী ঘোষণা করে। এটাই বঙ্গভঙ্গ।

বঙ্গভঙ্গের কারণ

 বিরাট এলাকা ও বিপুল জনসংখ্যা অধু্যষিত বাংলাকে দুটি প্রদেশে সংগঠিত করার পেছনে নিচের কারণগুলো বিশেষভাবে উলেস্নখযোগ্য :
১। প্রশাসনিক কারণঃ প্রশাসনিক সুবিধা ও দৰতা বৃদ্ধি করা বঙ্গভঙ্গের মূল ও প্রাথমিক কারণ। ব্রি্িটশ সরকারের প্রশাসনিক সুবিধার জন্য বাংলা প্রদেশকে ভাগ করে দুটি আলাদা প্রদেশ করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। ১৮৫৪ সালে বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা, ছোট নাগপুর ও আসাম নিয়ে গঠিত হয়েছিল বাংলা প্রেসিডেন্সি। একজন গবর্নরের পৰে এত বড় প্রদেশ শাসন করা সত্যিই দুরূহ ব্যাপার ছিল। তাই লর্ড কার্জন ১৯০৫ সালে উত্তর ও পূর্ব বাংলাকে আসামের সাথে যুক্ত করে 'পূর্ববঙ্গ ও আসাম' নামে এক নতুন প্রদেশ গঠন করেন। নতুন প্রদেশের রাজধানী হলো ঢাকা। নতুন প্রদেশের প্রথম ছোট লাট হলেন র্যামফিল্ড ফুলার। অপরপৰে পশ্চিমবঙ্গ, বিহার ও উড়িষ্যা নিয়ে 'পশ্চিম বঙ্গ' প্রদেশ গঠিত হয়।
২। রাজনৈতিক কারণঃ পাশ্চাত্যে শিৰার প্রসারের ফলে জনগণের রাজনৈতিক চেতনা বৃদ্ধি পায় এবং জাতীয়তাবাদী আন্দোলন গড়ে উঠতে থাকে। এসব আন্দোলনের কেন্দ্রস্থল ছিল কলকাতা। ঢাকাকে রাজধানী করে সরকার আন্দোলনকে সত্মিমিত করতে সচেষ্ট হয়। এছাড়া ব্রিটিশদের বঙ্গভঙ্গের পেছনে নিম্নোক্ত তিনটি উদ্দেশ্য নিহিত ছিল_
ক) জাতীয়তাবাদী আন্দোলন নস্যাৎ করাঃ ১৮৮৫ সালে 'ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস' নামক একটি রাজনৈতিক দলের জন্ম হয়। কংগ্রেসের নেতৃত্বে সমগ্র ভারতে বিশেষ করে 'বাংলা প্রেসিডেন্সিতে' জাতীয়তাবাদী আন্দোলন শুরম্ন হয়। এ আন্দোলনের কেন্দ্রস্থল ছিল কলকাতা শহর। সুচতুর ইংরেজ সরকার এ জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে নস্যাৎ এবং আন্দোলনকারীদের মেরম্নদ- ভেঙ্গে দেয়ার জন্য বঙ্গভঙ্গ করতে উদ্যোগী হয়। ব্রিটিশ সরকার 'ভাগ কর ও শাসন কর' নীতি অবলম্বন করে।
খ) মুসলমানদের দাবিঃ স্যার সলিমুলস্নাহ বঙ্গভঙ্গের পৰে আন্দোলন শুরম্ন করেন। তিনি জনগণকে বোঝাতে চেষ্টা করেন যে, নতুন প্রদেশ সৃষ্টি হলে পূর্ববাংলার মুসলমানরা নিজেদের ভাগ্যোন্নয়নের সুযোগ পাবে। হিন্দু সম্প্রদায় প্রভাবিত কলকাতার উপর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ৰেত্রে নিভর্রশীলতা হ্রাস পাবে। মুসলমান জনগণ চাকরি ও ব্যবসায়-বাণিজ্যে উন্নতি লাভ করতে পারবে।
গ) আধা-সামনত্মতন্ত্র প্রতিষ্ঠাঃ পূর্ব বাংলায় আধা-সামনত্মতান্ত্রিক রাজনৈতিক কাঠামো প্রতিষ্ঠা প্রয়াসী একটি এলিট শ্রেণী গড়ে ওঠে; তারা বঙ্গভঙ্গের প্রতি সমর্থন জানায়।
৩। অর্থনৈতিক কারণঃ ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের পূর্বে শিল্প, ব্যবসায়-বাণিজ্যি, অফিস-আদালত, কলকারখানা, স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদি প্রায় সব কিছুই কলকাতার কেন্দ্রিভূত ছিল। ফলে পূর্ববঙ্গের মুসলমানরা সর্বৰেত্রেই পিছিয়ে পড়েছিল। অধিকাংশ মুসলমান জনগণ তখন ভাবতে শুরম্ন করে যে, বঙ্গভঙ্গ হলে তারা অর্থনৈতিক উন্নতি অর্জনের সুযোগ পাবে। এ জন্য পূর্ববঙ্গের মুসলমান জনগণ বঙ্গভঙ্গের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন জানায়।
৪। সামাজিক কারণঃ ব্রিটিশ শাসনামলে মুসলমান সম্প্রদায় নির্মমভাবে শোষিত ও বঞ্চিত হতে থাকে। ব্রিটিশ সরকার হিন্দুদের প্রতি উদারনীতি এবং মুসলমানদের প্রতি বৈরী নীতি অনুসরণ করতে থাকে। মুসলমানরা সামাজিক প্রভাব-প্রতিপত্তিহীন একটি দরিদ্র, রিক্ত ও নিঃস্ব সম্প্রদায়ে পরিণত হয়। সুতরাং লর্ড কার্জন কর্তৃক বঙ্গবঙ্গের চিনত্মা-ভাবনা শুরম্ন হলে পূর্ববাংলার মুসলমান সম্প্রদায় স্বভাবতই এর প্রতি সমর্থন জানায়। বঙ্গবঙ্গের মাধ্যমে পূর্ববঙ্গের মুসলমানগণ তাদের হারানো প্রভাব-প্রতিপত্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখতে থাকে।
৫। ধর্মীয় কারণঃ অবিভক্ত বাংলার পূর্ব অংশে মুসলমানগণ ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং পশ্চিম অংশে হিন্দুরা ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ। ফলে এ দৃষ্টিকোণ থেকেও দুই সম্প্রদায়ের জন্য দুটি পৃথক রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়।

বঙ্গভঙ্গের ফলাফল

বঙ্গভঙ্গের ফলাফল সাময়িক হলেও বিশেষ করে পূর্ববঙ্গের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান সম্প্রদায় বেশী লাভবান হয়েছিল।
১) মুসলমান সমাজের প্রতিক্রিয়াঃ বঙ্গভঙ্গের ফলে নতুন প্রদেশ তথা পূর্ববঙ্গ ও আসামের রাজধানী হয় ঢাকা। রাজধানী ঢাকাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। ফলে মুসলমানগণ নানাবিধ সুযোগ-সুবিধা লাভে সৰম হয়। অফিস-আদালত, শিৰাপ্রতিষ্ঠানসহ বড় বড় সুরম্য অট্টালিকা গড়ে ওঠায় ঢাকার শ্রীবৃদ্ধি ঘটে। বঙ্গভঙ্গকে মুসলমানগণ তাদের হৃত গৌরব ও মর্যাদা ফিরে পাবার আনন্দে মেতে ওঠে। নবাব স্যার সলিমুলস্নাহ পরিকল্পনাটি কার্যকর করার দিন ঢাকার এক জনসভায় বলেন, "বঙ্গভঙ্গ আমাদেরকে নিষ্ক্রিয়তার হাত থেকে মুক্তি দিয়েছে। এটা আমাদের উদ্দীপ্ত করেছে কর্ম সাধনায় এবং সংগ্রামে।" অর্থাৎ বঙ্গভঙ্গের ফলে পূর্ব বাংলার গণমানুষের ভাগ্যোন্নয়নের দ্বার উন্মোচিত হয়।
২) হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়াঃ বঙ্গভঙ্গের বিরম্নদ্ধে হিন্দুদের অবস্থান ছিল খুবই কঠিন। বাংলার উচ্চ ও মধ্যবিত্ত হিন্দুরাই এর বিরম্নদ্ধে প্রচ- ঝড় তুলেছিল। তারা প্রচার করেন যে, বঙ্গভঙ্গ 'বঙ্গমাতার অঙ্গচ্ছেদের সমতুল্য।' জাতীয়তাবাদী চিনত্মা-চেতনায় বিকশিত হিন্দু জনসমাজ মনে করেন যে, ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত বাঙালি মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে ধ্বংস করে দেয়ার জন্য বঙ্গভঙ্গ করা হয়েছে। হিন্দু লেখক, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক নেতাগণ বঙ্গভঙ্গকে বাঙালি জাতির বিকাশমান ধারাকে নস্যাৎ করার ষড়যন্ত্র বলে প্রচার করেন। ব্রিটিশ সরকারের এই বিভেদ ও শাসন নীতির বিরম্নদ্ধে তারা প্রচ- গণআন্দোলন গড়ে তোলেন। ফলে ব্রিটিশ পণ্য বর্জনের জন্য স্বদেশী আন্দোলন ও সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেতে থাকে।
৩) ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদী চেতনার বিকাশঃ হিন্দুদের বঙ্গভঙ্গ রদ আন্দোলন মোকাবেলা করার জন্য মুসলিম বুদ্ধিজীবি ও নেতৃবৃন্দ ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ নামক একটি রাজনৈতিক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করে। এভাবে হিন্দু -মুসলিম সম্পর্কে তিক্ততার সৃষ্টি হয়। এবং তা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেতে থাকে। তাই হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদী চেতনার সৃষ্টি হয়।
৪) সন্ত্রাসবাদ ও উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদের উত্থানঃ ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের ফলে ভারতীয় রাজনীতিতে বিশেষ করে বাংলা, পাঞ্জাব ও মহারাষ্ট্রে সন্ত্রাসবাদী ও নাশকতামূলক কার্যকলাপ বৃদ্ধি পায়। সমগ্র ভারতে উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদী চিনত্মা-চেতনা বিসত্মৃত হয়।
৫) ব্রিটিশদের 'ভাগ কর ও শাসন কর' নীতির বিজয়ঃ বঙ্গভঙ্গের রাজনৈতিক প্রভাবে ব্রিটিশ শাসকদের অনুসৃত 'ভাগ কর ও শাসন কর' নীতি জয়যুক্ত হয়। ফলে হিন্দু ও মুসলমান জনগণের মধ্যে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ সৃষ্টি হয়। ভারতের বৃহত্তম দুটি সম্প্রদায় এর ফলে চিনত্মা-চেতনার দিক থেকে বিভক্ত হয়ে পড়ে।
৬) ভারতীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলন নস্যাৎঃ বঙ্গভঙ্গের মাধ্যমে ব্রিটিশ শাসকগণ কৌশলে কলকাতা কেন্দ্রিক সর্বভারতীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলন নস্যাৎ করার সুযোগ লাভ করে। বঙ্গভঙ্গের ফলে সকল পেশাগত শ্রেণী আর্থিকভাবে ৰতিগ্রসত্ম হয়।
 
   

(মোঃ হেলাল উদ্দিন, ৩৩ তম বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা)