Saturday, October 17, 2020

আন্তর্জাতিক রাজনীতি অধ্যয়নের পদ্ধতি -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

আন্তর্জাতিক রাজনীতি অধ্যয়নের পদ্ধতিগুলো মূলত বিবর্তিত হয়েছে সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে। বিশ্বরাজনীতির জটিল সমীকরণগুলো বোঝার জন্য রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি বা পদ্ধতি (Approaches) ব্যবহার করেন।

নিচে আন্তর্জাতিক রাজনীতি অধ্যয়নের প্রধান পদ্ধতিগুলো আলোচনা করা হলো:


১. আদর্শবাদ (Idealism)

আদর্শবাদ পদ্ধতিটি মূলত 'কী হওয়া উচিত' তার ওপর জোর দেয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর এই পদ্ধতির ব্যাপক প্রচলন ঘটে।

  • মূল বিশ্বাস: এই পদ্ধতি বিশ্বাস করে যে, মানুষের প্রকৃতি ভালো এবং যুদ্ধের বদলে সহযোগিতা ও আন্তর্জাতিক আইনের মাধ্যমে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব।

  • লক্ষ্য: নৈতিকতা, গণতন্ত্র এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা (যেমন: জাতিসংঘ) শক্তিশালী করার মাধ্যমে যুদ্ধমুক্ত পৃথিবী গড়া।

২. বাস্তববাদ (Realism)

বাস্তববাদ আন্তর্জাতিক রাজনীতির সবচেয়ে প্রভাবশালী পদ্ধতি। এটি 'কী হচ্ছে' তার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে।

  • মূল বিশ্বাস: আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় কোনো কেন্দ্রীয় শাসন নেই (Anarchy)। এখানে প্রতিটি রাষ্ট্র তার নিজের স্বার্থ (National Interest) এবং ক্ষমতা (Power) বৃদ্ধির চেষ্টা করে।

  • বৈশিষ্ট্য: ক্ষমতার ভারসাম্য (Balance of Power), সামরিক শক্তি এবং জাতীয় নিরাপত্তাই এখানে মুখ্য। হ্যান্স জে. মর্গেনথু এই পদ্ধতির অন্যতম প্রধান প্রবক্তা।

৩. নব্য-বাস্তববাদ (Neo-realism)

কেনেথ ওয়াল্টজ এই পদ্ধতির প্রবর্তক। এটি কেবল রাষ্ট্রের আচরণের ওপর নয়, বরং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার কাঠামোর (Structure) ওপর গুরুত্ব দেয়।

  • মূল বিশ্বাস: রাষ্ট্রের আচরণ মূলত আন্তর্জাতিক কাঠামোর দ্বারা নির্ধারিত হয়। রাষ্ট্রগুলো টিকে থাকার জন্যই একে অপরের সাথে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়।

৪. উদারতাবাদ (Liberalism)

উদারতাবাদ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে রাষ্ট্রের পাশাপাশি অন্যান্য শক্তির (Non-state actors) ভূমিকার কথা বলে।

  • মূল বিশ্বাস: মুক্ত বাণিজ্য, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং পারস্পরিক অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা (Interdependence) যুদ্ধের সম্ভাবনা কমিয়ে দেয়।

  • বৈশিষ্ট্য: বহুপাক্ষিকতাবাদ এবং গণতন্ত্রের প্রসার।

৫. মার্কসীয় পদ্ধতি (Marxist Approach)

এই পদ্ধতি আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে অর্থনৈতিক ও শ্রেণিবৈষম্যের প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করে।

  • মূল বিশ্বাস: বিশ্বরাজনীতি মূলত পুঁজিপতি রাষ্ট্র এবং শোষিত রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে একটি সংঘাত। ধনী দেশগুলো (Center/Core) দরিদ্র দেশগুলোকে (Periphery) শোষণের মাধ্যমে নিজেদের সম্পদ বৃদ্ধি করে।

  • লক্ষ্য: পুঁজিবাদের অবসান এবং বৈশ্বিক সাম্য প্রতিষ্ঠা।

৬. আচরণবাদী পদ্ধতি (Behavioral Approach)

১৯৫০ ও ৬০-এর দশকে এই পদ্ধতির উদ্ভব হয়। এটি রাজনীতিকে বৈজ্ঞানিক ও গাণিতিক উপায়ে পর্যালোচনার চেষ্টা করে।

  • মূল বিশ্বাস: এটি কেবল তাত্ত্বিক আলোচনার পরিবর্তে তথ্য-উপাত্ত (Data), পরিসংখ্যান এবং মানুষের আচরণের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের ওপর গুরুত্ব দেয়।

৭. নারীবাদী পদ্ধতি (Feminist Approach)

এই পদ্ধতি মনে করে, আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রচলিত তত্ত্বগুলো মূলত পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তৈরি।

  • মূল বিশ্বাস: নিরাপত্তা, যুদ্ধ এবং ক্ষমতার সংজ্ঞায় নারীর অবস্থান ও অভিজ্ঞতাকে উপেক্ষা করা হয়েছে। এটি বৈশ্বিক রাজনীতিতে লিঙ্গীয় সমতা ও মানবিক নিরাপত্তার দাবি তোলে।

৮. গঠনবাদ (Constructivism)

এটি অপেক্ষাকৃত আধুনিক পদ্ধতি। এটি মনে করে যে, আন্তর্জাতিক রাজনীতির বাস্তবতা কেবল বস্তুগত নয়, বরং এটি সামাজিক ধারণা ও পরিচয়ের মাধ্যমে নির্মিত।

  • মূল বিশ্বাস: "শত্রু" বা "বন্ধু" কোনোটিই স্থায়ী নয়; বরং রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া ও বিশ্বাসের মাধ্যমে এই সম্পর্কগুলো তৈরি হয়।


উপসংহার

আন্তর্জাতিক রাজনীতি অধ্যয়নের কোনো একক পদ্ধতি স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। বিশ্ব পরিস্থিতির পরিবর্তনের সাথে সাথে বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন পদ্ধতির সমন্বয়ে আন্তর্জাতিক ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করেন। বর্তমানের জটিল বিশ্বব্যবস্থা বুঝতে বাস্তববাদ যেমন প্রয়োজন, তেমনি উদারতাবাদ ও গঠনবাদের গুরুত্বও অনস্বীকার্য।



 


 মোঃ হেলাল উদ্দিন

৩৩ তম বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা

No comments:

Post a Comment