Saturday, October 17, 2020

রাজনৈতিক অর্থনীতির ধারণা -- মোঃ হেলাল উদ্দিন


  

রাজনৈতিক অর্থনীতি (Political Economy) হলো সমাজবিজ্ঞানের এমন একটি শাখা যা উৎপাদন, ক্রয়-বিক্রয় এবং এগুলোর সাথে আইন, প্রথা ও সরকারের সম্পর্কের যোগসূত্র আলোচনা করে। সহজ কথায়, এটি রাষ্ট্র ও অর্থনীতির মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্কের বিশ্লেষণ।

নিচে রাজনৈতিক অর্থনীতির ধারণাটি বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:


১. রাজনৈতিক অর্থনীতির সংজ্ঞা

রাজনৈতিক অর্থনীতি শব্দটি গ্রিক শব্দ ‘Polis’ (রাষ্ট্র) এবং ‘Oikonomia’ (গৃহস্থালি ব্যবস্থাপনা) থেকে এসেছে। এটি মূলত আলোচনা করে যে, একটি দেশের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান এবং রাজনৈতিক পরিবেশ কীভাবে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করে এবং বিপরীতভাবে অর্থনৈতিক অবস্থা কীভাবে রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করে।

প্রাচীনকালে একে অর্থনীতির সমার্থক মনে করা হতো, কিন্তু আধুনিককালে এটি একটি বিশেষায়িত ক্ষেত্র হিসেবে স্বীকৃত যেখানে সম্পদ বণ্টন এবং ক্ষমতার রাজনীতি—এই দুটি বিষয়কে একীভূত করা হয়েছে।

২. রাজনৈতিক অর্থনীতির মূল স্তম্ভসমূহ

রাজনৈতিক অর্থনীতি মূলত তিনটি প্রধান উপাদানের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়:

  • রাষ্ট্র (The State): যারা আইন তৈরি করে এবং সম্পদের বণ্টন নিয়ন্ত্রণ করে।

  • বাজার (The Market): যেখানে পণ্য ও সেবার আদান-প্রদান ঘটে।

  • সমাজ (Society): যারা ভোগকারী এবং যাদের স্বার্থে রাষ্ট্র ও বাজার পরিচালিত হওয়ার কথা।

৩. প্রধান তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি (Perspectives)

রাজনৈতিক অর্থনীতিকে তিনটি প্রধান তাত্ত্বিক কাঠামোতে দেখা যায়:

  • উদারতাবাদ (Liberalism): এটি মুক্ত বাজারের ওপর গুরুত্ব দেয়। এখানে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ ন্যূনতম রাখার কথা বলা হয় (Laissez-faire)। অ্যাডাম স্মিথ এই ধারার প্রধান প্রবক্তা।

  • মার্কসবাদ (Marxism): কার্ল মার্কস প্রবর্তিত এই তত্ত্ব অনুযায়ী, রাজনৈতিক অর্থনীতি হলো শ্রেণিশোষণের হাতিয়ার। এখানে উৎপাদন উপায়ের ওপর মালিকানার ভিত্তিতে শ্রেণিদ্বন্দ্বের আলোচনা করা হয়।

  • জাতীয়তাবাদ/বাণিজ্যবাদ (Mercantilism): এই মতবাদ মনে করে, রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করার জন্য অর্থনীতিকে ব্যবহার করতে হবে। জাতীয় স্বার্থ রক্ষার জন্য রাষ্ট্র অর্থনীতির ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ রাখবে।

৪. রাজনৈতিক অর্থনীতির গুরুত্ব

বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় এই বিষয়টির অধ্যয়ন অত্যন্ত প্রয়োজনীয়:

১. সম্পদ বণ্টন: সম্পদ কার কাছে যাবে এবং রাষ্ট্র কীভাবে কর (Tax) নির্ধারণ করবে, তা বোঝার জন্য এটি প্রয়োজন।

২. নীতি নির্ধারণ: কেন একটি সরকার নির্দিষ্ট অর্থনৈতিক নীতি (যেমন: ভর্তুকি দেওয়া বা বিরাষ্ট্রীয়করণ) গ্রহণ করে, তা রাজনৈতিক অর্থনীতির মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যায়।

৩. বৈশ্বিক প্রভাব: আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বৈদেশিক সাহায্য এবং বহুজাতিক সংস্থাগুলোর (MNCs) প্রভাব বিশ্লেষণ করতে এই শাখাটি সহায়ক।

৪. উন্নয়ন ও বৈষম্য: কেন কিছু রাষ্ট্র উন্নত আর কিছু রাষ্ট্র অনুন্নত, কিংবা সমাজের ভেতর কেন আকাশচুম্বী বৈষম্য তৈরি হয়—তার মূল কারণ এই রাজনৈতিক কাঠামোতে নিহিত থাকে।

৫. আধুনিক প্রেক্ষাপট

বর্তমানে রাজনৈতিক অর্থনীতি কেবল রাষ্ট্রীয় সীমানায় সীমাবদ্ধ নেই। এটি এখন আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অর্থনীতি (IPE) হিসেবে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ (IMF), এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (WTO) মতো প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা ও বিশ্বায়নের প্রভাব নিয়ে আলোচনা করে।


উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, অর্থনীতি ও রাজনীতিকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। রাষ্ট্র যখন কোনো অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নেয়, তার পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকে; আবার অর্থনৈতিক সংকট যখন দেখা দেয়, তখন রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটে। এই দ্বান্দ্বিক ও পারস্পরিক সম্পর্কই হলো রাজনৈতিক অর্থনীতির মূল নির্যাস।

 




No comments:

Post a Comment