ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসনের ফলে হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে সাম্প্রদায়িক চেতনার বিকাশ ঘটে। উপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে বহু সাম্প্রদায়িক ঘটনা দেখা যায়, যা অনেক সময় স্বাধীনতা সংগ্রামের আদর্শের সাথেই সাংঘর্ষিক হয়ে ওঠে। ভারতীয় জাতীয়তাবাদের বিকাশের পাশাপাশি সাম্প্রদায়িকতারও উদ্ভব ঘটে। এর ফলশ্রুতিতে হিন্দু-মুসলিম বিভেদের ভিত্তিতে ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ দুটি পৃথক রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়।
ঔপনিবেশিক শাসনামলে সাম্প্রদায়িকতার উদ্ভব :
ঔপনিবেশিক আমলে বিভিন্ন কারণ সাম্প্রদায়িকতার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এগুলো হলো—
১. ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ :
বঙ্গভঙ্গ হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভাজনকে তীব্র করে তোলে। হিন্দুরা এর বিরোধিতা এবং মুসলমানরা সমর্থন করায় পারস্পরিক দূরত্ব বৃদ্ধি পায়। এর ফলে স্বদেশী ও বয়কট আন্দোলনের সূচনা হয়, যা সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বাড়িয়ে তোলে।
২. ‘ভাগ কর ও শাসন কর’ নীতি :
ব্রিটিশ শাসকরা সচেতনভাবে হিন্দু-মুসলিম বিভেদ সৃষ্টি করে নিজেদের শাসন দীর্ঘায়িত করতে চেয়েছিল। তারা এই বিভেদ নিরসনের পরিবর্তে আরও উসকে দিয়েছে, যা সাম্প্রদায়িকতার অন্যতম প্রধান কারণ।
৩. মুসলমানদের চাকরির সুযোগ বৃদ্ধি :
মুসলমানদের জন্য চাকরির বিশেষ সুযোগ সৃষ্টি করা হলে শিক্ষিত হিন্দু সমাজ এর বিরোধিতা করে। এতে মুসলমানদের মধ্যে ধারণা জন্মায় যে, হিন্দুরা তাদের উন্নতি চায় না—যা পারস্পরিক অবিশ্বাস বাড়ায়।
৪. বস্তুগত স্বার্থ :
সাম্প্রদায়িকতা শুধু ধর্মীয় কারণে নয়, বরং অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বার্থের কারণেও গড়ে ওঠে। শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণি নিজেদের স্বার্থে ধর্মকে ব্যবহার করে গ্রামীণ সমাজে সাম্প্রদায়িকতা ছড়িয়ে দেয়।
৫. হিন্দু মহাসভার ভূমিকা :
হিন্দু মহাসভার কিছু বক্তব্য, যেমন মুসলমানদের ‘ধর্মান্তরিত হিন্দু’ হিসেবে উল্লেখ করা, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বাড়িয়ে তোলে এবং বিভেদ গভীর করে।
৬. সাম্প্রদায়িক সংগঠনের সৃষ্টি :
হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ই আলাদা আলাদা সংগঠন গড়ে তোলে। এসব সংগঠন নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করলেও পরোক্ষভাবে সাম্প্রদায়িক বিভাজনকে তীব্র করে।
৭. লাহোর প্রস্তাব ও কংগ্রেসের বিরোধিতা :
লাহোর প্রস্তাব মুসলমানদের মধ্যে পৃথক রাষ্ট্রের আকাঙ্ক্ষা জাগায়। কংগ্রেস এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ বৃদ্ধি পায়।
৮. দ্বিজাতি তত্ত্ব :
মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ দ্বিজাতি তত্ত্ব উপস্থাপন করে বলেন, হিন্দু ও মুসলমান দুটি পৃথক জাতি। এই তত্ত্ব সাম্প্রদায়িক বিভাজনকে চূড়ান্ত রূপ দেয় এবং পৃথক রাষ্ট্রের দাবি জোরালো করে।
সাম্প্রদায়িকতার ফলাফল :
১. সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা :
বিভিন্ন সময়ে উপমহাদেশের বিভিন্ন স্থানে দাঙ্গা সংঘটিত হয়, যেমন ময়মনসিংহ, কলকাতা, ঢাকা, চট্টগ্রাম প্রভৃতি অঞ্চলে। ১৯৪৬ সালের কলকাতা দাঙ্গা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
২. দ্বিজাতি তত্ত্বের প্রসার :
১৯৩৭ সালের নির্বাচনের পর কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মধ্যে দ্বন্দ্ব বৃদ্ধি পায়। কংগ্রেসের একক শাসন ও কিছু সাম্প্রদায়িক আচরণ মুসলিমদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করে, যা দ্বিজাতি তত্ত্বকে শক্তিশালী করে।
৩. ১৯৪৬ সালের কলকাতা দাঙ্গা :
প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবসকে কেন্দ্র করে হিন্দু-মুসলিম সংঘর্ষে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে। এটি ছিল সাম্প্রদায়িকতার এক ভয়াবহ প্রকাশ।
৪. নেতৃত্বের মধ্যে সমঝোতা :
দাঙ্গার পর মহাত্মা গান্ধী ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর উদ্যোগে শান্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হয়, যা সাময়িকভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
৫. পাকিস্তানের সৃষ্টি :
সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে পাকিস্তান রাষ্ট্রের উদ্ভব হয় এবং জিন্নাহ তার প্রতিষ্ঠাতা নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন।
৬. সংখ্যালঘুদের অনিরাপত্তা :
দেশভাগের ফলে সংখ্যালঘুরা নিজ দেশেই পরবাসীর মতো জীবনযাপন করতে বাধ্য হয় এবং নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে।
সার্বিকভাবে বলা যায়, ঔপনিবেশিক শাসনামলে নানা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক কারণে সাম্প্রদায়িকতার উদ্ভব ঘটে। ব্রিটিশ শাসকদের বিভাজননীতি এবং কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের পারস্পরিক বিরোধ এই প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে। এর চূড়ান্ত ফল ছিল ১৯৪৭ সালের দেশভাগ। সাম্প্রদায়িকতার প্রভাব আজও উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিদ্যমান, যা ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হিসেবে বিবেচিত।
ঔপনিবেশিক শাসনামলে উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িকতার উদ্ভব, বিকাশ ও ফলাফল -- মোঃ হেলাল উদ্দিন
No comments:
Post a Comment