ভূমিকাঃ বিজ্ঞানের নব নব আবিষ্কার মানুষের চিন্তা-চেতনা, জীবনযাত্রা, চিকিৎসাশাস্ত্রসহ সকল ক্ষেত্রে নবদিগন্তের উন্মোচন করে চলেছে। বিজ্ঞানকে মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত করার সাধনা থেকে ঘটে প্রযুক্তির বিকাশ। বর্তমান যুগ তথ্য প্রযুক্তির যুগ তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আজ মানুষের জীবনযাত্রার ধরন ও মান পাল্টে দিয়েছে। রাষ্ট্র, সরকার ও প্রশাসনের ওপরও প্রযুক্তির প্রভাব পড়েছে বহুলভাবে। এ প্রেক্ষাপটে তথ্য প্রযুক্তি নির্ভর 'ই-গভর্নেন্স' নামক এক নতুন ধারণার উদ্ভব ঘটেছে। সরকারের কাজকর্মে স্বচ্ছতা, দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য এখন 'ই-গভর্নেন্স'-এর বিকল্প নেই। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির ফলে 'ই-গভর্নেন্স' এখন সময়ের জোরালো দাবিতে পরিণত হয়েছে।
অপরদিকে সুশাসনও একটি আধুনিক ধারণা। 'ই-গভর্নেন্স' রাষ্ট্রের নাগরিকদের শাসন প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের সুযোগ প্রদান করে দিয়ে এবং সেখানে স্বচ্ছতা সৃষ্টি ও দক্ষতা বৃদ্ধি করার মাধ্যমে সুশাসন প্রতিষ্ঠার পথকে সুগম করে দিয়েছে।
ই-গভর্নেন্স-এর পরিচয় (Concept of E-Governance):
'ই-গভর্নেন্স' (E-Governance) শব্দটি Electronic Governance-এর সংক্ষিপ্ত রূপ। এর অর্থ হলো 'ইলেক্ট্রনিক গভর্নেন্স'। অনেক সময় একে 'ডিজিটাল গভর্নেন্স', 'অনলাইন গভর্নেন্স' ও প্রযুক্তিচালিত গভর্ন্যান্স বা শাসন নামেও অভিহিত করা হয়। অনলাইনের মাধ্যমে পাবলিক ডেলিভারি ও সেবা জনগণের কাছে সহজলভ্য করা ই-গভর্নেন্স-এর লক্ষ্য। এ প্রক্রিয়া আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর এবং সরকারের কর্মসম্পাদনে ব্যাপক পরিবর্তন ও সংস্কার আনয়নে সক্ষম। সুশাসন প্রতিষ্ঠায় ই-গভর্নেন্স- এর লক্ষ্য হলো জনগণকে প্রদত্ত সেবার মান উন্নয়ন, সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি, আইনের যথার্থ প্রয়োগ নিশ্চিত ও শক্তিশালীকরণ, জনজীবনে এবং রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন ক্ষেত্রে নাগরিকদের অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রসমূহে অগ্রাধিকার উন্নীতকরণ, বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জীবনমান বৃদ্ধি ইত্যাদি।
ডিজিটাল পদ্ধতিতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মিথস্ক্রিয়া (interaction) সাধিত হলে 'ই-গভর্নেন্স'-এর উদ্ভব ঘটে। এই মিথস্ক্রিয়া ঘটে সরকার ও জনগণের মধ্যে, সরকার ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে, সরকার ও চাকরিজীবীদের মধ্যে এবং এক সরকারের সাথে অন্য সরকারের মধ্যে।
‘ই-গভর্নেন্স'-এর সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলা হয় যে, “ইন্টারনেট-এর মাধ্যমে সরকারি বিভিন্ন তথ্য ও সেবা জনগণের নিকট পৌঁছানকেই 'ই-গভর্নেন্স' বলে”। কেউ কেউ বলেন যে, জনগণের নিকট বিভিন্ন সেবা পৌঁছে দেওয়ার দক্ষতা ও কার্যকারিতা বাড়ানোর জন্য তথ্যপ্রযুক্তি, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি এবং অন্য ইন্টারনেটের ওপর নির্ভরশীল টেলিকমিউনিকেশন প্রযুক্তির ব্যবহারকে ই-গভর্নেন্স বলে।'
বিশ্ব ব্যাংক (World Bank) প্রদত্ত সংজ্ঞায় বলা হয়েছে যে, “ই-গভর্নেন্স বলতে সরকারি তথ্য প্রযুক্তি (নেটওয়ার্ক, ইন্টারনেট, মোবাইল প্রভৃতি) ব্যবহারের মাধ্যমে জনগণ, ব্যবসায়ী এবং সরকারের অন্যান্য শাখার মধ্যে যোগাযোগের সক্ষমতাকে বোঝায়।” (E-Governance refers to the use by Government agencies of information technologies (such as networking internet, mobile etc.) that have the ability to transform relations with citizens, businesses and other arms of government.)
জাতিসংঘ (U.N) ২০০৬ সালে প্রদত্ত এক সংজ্ঞায় বলেছে যে, “সরকারি তথ্য ও সেবা ইন্টারনেট এবং ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েবের মাধ্যমে জনগণের নিকট পৌছানের ব্যবস্থাই হলো ই-গভর্নেন্স।” (E-Governance is defined as the employment of the internet and the worldwide web for delivering government information and service to the citizens.)
আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রের 'ই-গভর্নেন্স আইন-২০০২'-এ বলা হয়েছে যে, “ই-গভর্নেন্স বলতে বোঝায় ওয়েব নির্ভর ইন্টারনেট এবং অন্যান্য তথ্যপ্রযুক্তি।” (The use by the government of web based internet applicatión and other information technologies.)
ইউনেস্কো প্রদত্ত সংজ্ঞায় বলা হয়েছে যে, “সরকার বলতে বোঝায় রাষ্ট্রের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং প্রশাসনিক কর্তৃত্ব যার অন্তর্ভুক্ত হলো নাগরিকের আইনগত অধিকার ও দায়িত্বের প্রশ্ন। অপরদিকে ই-গভর্নেন্স হলো এসব কার্যাবলি সম্পাদনের ক্ষেত্রে ইলেকট্রনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে দক্ষতা, দ্রুততা ও স্বচ্ছতার সাথে জনগণ এবং প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনরত অন্যান্য সংস্থাকে তথ্য সরবরাহ করা।” (Governance refers to the exercise of political, economic and administrative authority in the management of a country's affairs, including citizens articulation of their interests and energies of their legal rights and obligations. e-Governnace may be understood as the performance of this governance via the electronic medium in order to facititate an efficient, speedy and transparent process of disseminating information to the public and other agencies and for performing government administration activities.)
ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি ড. এ.পি.জে আব্দুল কালাম বলেছেন যে, “স্বচ্ছ, নিশ্চিত, গ্রহণযোগ্য ও অবাধ তথ্য প্রবাহ সৃষ্টির মাধ্যমে সরকারের বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং নাগরিকদের স্বচ্ছ, পরিচ্ছন্ন ও অবিকৃত সেবা দেয়ার উৎকৃষ্ট মাধ্যমই হলো ই-গভর্নেন্স।” (A transparent, smart e-Governance with seamless access, secure and authentic flow of information crossing the interdepeartmental barrier and providing a fair and unbiased service to the citizen)
E-Governance বিষয়ে বিশিষ্ট জার্মান তাত্ত্বিক ও গবেষক থমাস এফ. গর্ডন (Thomas F. Gordon)-এর মতে, ‘সহজ অর্থে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি তথা ইন্টারনেট ব্যবহার করে রাষ্ট্রীয় সেবাক্ষেত্রের উন্নয়নের পদ্ধতি হলো ই-গভর্নেন্স' (E-Governance is simply the use of information and communication technology, such as the Internet, to improve the process of government)।
ই-গভর্নেন্স এর পূর্ণরূপ
ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নাইডু B-Governance এর একজন সমর্থক ও সমঝদার রাজনীতিবিদ। তিনি “ই-গভর্ন্যান্সকে' ‘SMART Government' বলে অভিহিত করেছেন। তার মতে SMART শব্দটির পূর্ণরূপ হলো-
S = Simple
M = Moral
A = Accountable
R = Responsive
T = Transparent.
অর্থাৎ যদি কোনো সরকার ব্যবস্থা সহজ সরল (Simple), নৈতিক আদর্শপূর্ণ (Moral), জবাবদিহিমূলক (Accountable), সংবেদনশীল বা দ্রুত সাড়া প্রদানকারী (Responsive) এবং কাজকর্মে স্বচ্ছ হয় তাকেই চন্দ্রবাবু নাইডু ‘SMART Governance' বলতে চেয়েছেন।
পৃথিবীর অনেক রাষ্ট্রেই তথ্যপ্রযুক্তি, যোগাযোগ, ইন্টারনেট খাত, সাবমেরিন কেবল, নেটওয়ার্ক, সরকারি হোমপেজ, ওয়েবসাইট ইত্যাদির প্রচলন শুরু হয়েছে। তবে ই-গভর্নেন্সের ক্ষেত্রে অনলাইন এবং ইন্টারনেটকে প্রধান নিয়ামক হিসেবে বিচেনা করা হয়। তবে অনেক ইলেকট্রনিক প্রযুক্তি এক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয় যা ইন্টারনেটের সাথে সরাসরি যুক্ত নয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় টেলিফোন, ফ্যাক্স, সংক্ষিপ্ত মোবাইল বার্তা, ওয়্যারলেস সুবিধা, সিসি টিভি, ট্র্যাকিং সিস্টেম, মহাসড়কে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, পরিচয়পত্র, ভোটসংক্রান্ত কাজে ব্যবহৃত প্রযুক্তি, টেলিভিশন ও রেডিওর মাধ্যমে সরকারি বিভিন্ন সেবা ইত্যাদি।
ই-গভর্নেন্স-এর উদ্দেশ্য (Aims & Objectives of E-Governance): ই-গভর্নেন্স-এর উদ্দেশ্য নিম্নরূপঃ
১. ই-গভর্নেন্স-এর মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সুশাসন প্রতিষ্ঠা।
২. সরকার পরিচালনা ও প্রশাসনে স্বচ্ছতা আনয়ন করা।
৩. প্রশাসনকে গতিশীল করা।
৪. দ্রুত জনগণের নিকট বিভিন্ন সেবা ও সুযোগ পৌঁছে দেওয়া।
৫. দক্ষ ও সাশ্রয়ী পন্থায় জনগণের নিকট সেবা পৌঁছানো।
৬. সরকারি তথ্য ও সেবা জনগণের মাঝে দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়া।
৭. প্রশাসনের দক্ষতা ও গতিশীলতা বৃদ্ধির জন্য তথ্যপ্রযুক্তি এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিকে কাজে লাগানো।
৮. জনগণের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা সৃষ্টি।
৯. ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান এবং জনগণের নিকট তথ্য প্রাপ্তিকে সহজলভ্য করা।
১০. দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে জনগণের ব্যাপক অংশগ্রহণের.বা সংশ্লিষ্টতার সুযোগ সৃষ্টি ।
১১. নাগরিকদের মধ্যে সেবার মান উন্নীতকরণ।
১২. জনগণকে ঘরে বসেই সেবা ও সুযোগ লাভের সুযোগ করে দেওয়া।
১৩. জবাবদিহিতা নিশ্চত করা।
১৪. তথ্যপ্রবাহে অবাধ স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা।
১৫. গণতন্ত্রের ভিত্তিকে মজবুত করা।
১৬. ই-কমার্সের উন্নয়ন সাধনের মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নয়ন সাধন করা।
১৭. শাসন ব্যবস্থাকে সহজ ও উন্নত করা।
ই-গভর্নেন্স-এর বৈশিষ্ট্য (Characteristics of E-Governance):
ই-গভর্নেন্স
সম্পর্কে আলোচনা করলে এর নিম্নলিখিত বৈশিষ্ট্যগুলো চোখে পড়ে। এগুলো
নিম্নরূপঃ
১. ইলেক্ট্রনিক গভর্নেন্সঃ ই-গভর্নেন্স শব্দটি এসেছে
Electronic Governance থেকে। বাংলায় একে বলা হয় ইলেক্ট্রনিক বা
প্রযুক্তিনির্ভর শাসন। এ শাসন বা সরকার পরিচালনায় ইলেক্ট্রনিক যন্ত্রপাতি
বা কৌশল প্রয়োগই মুখ্য ভূমিকা পালন করে থাকে।
২. অনলাইন গভর্নেন্সঃ অনলাইনের মাধ্যমে পাবলিক ডেলিভারি ও সেবা জনগণের কাছে সহজলভ্য করাই ই-গভর্নেন্স-এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য।
৩.
প্রযুক্তিনির্ভরঃ ই-গভর্নেন্স-এর প্রক্রিয়া আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর।
প্রযুক্তি ব্যবহার করে সরকারের কর্মসম্পাদনে ব্যাপক পরিবর্তন ও সংস্কার
আনয়ন করা হয়।
৪. সেবার মান উন্নয়নঃ ই-গভর্নেন্স-এর লক্ষ্য
হলো জনগণকে প্রদত্ত সেবার মান উন্নয়ন করা। এর মাধ্যমে জনগণকে সার্বক্ষণিক
সুবিধা দেয়া সম্ভব।
৫. সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মদক্ষতা বৃদ্ধিঃ ই-গভর্নেন্স-এর লক্ষ্য হলো সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মদক্ষতা করা। অনলাইনের মাধ্যমে পাবলিক ডেলিভারি ও সেবা সহজে জনগণের নিকট পৌছে দেয়ার ফলে সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মদক্ষতাও বৃদ্ধি পায়।
৬.
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রসমূহে অগ্রাধিকার উন্নয়নঃ ই-গভর্নেন্স প্রতিষ্ঠিত হলে
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রসমূহে অগ্রাধিকারের ক্ষেত্রে উন্নয়ন সাধিত হয়।
৭. স্বচ্ছতাঃ ই-গভর্নেস সরকারের স্বচ্ছতাকে সুনিশ্চিত করে। ফলে জনগণের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা সৃষ্টি হয়।
৮.
দ্বিমুখী যোগাযোগঃ ই-গভর্নেন্স সরকার ও বিভিন্ন ধরনের প্রতিষ্ঠানের মধ্যে
দ্বি-মুখী যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করে। এ প্রক্রিয়ায় কোনো ব্যক্তি যেকোনো
প্রতিষ্ঠানের সাথে ইন্টারনেট সংলাপে বসতে পারে এবং তাদের সমস্যা, মন্তব্য ও
অনুরোধ প্রতিষ্ঠানকে জানাতে পারে।
৯. লেনদেন পরিচালনা, ফরন
জনা দেয়াঃ ই-গভর্নেন্স-এর সহযোগিতায় আয়কর রিটার্ন জমা দেয়া, চাকরির
জন্য আবেদন চাওয়া ও তা জন্য দেয়া, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির জন্য করন জমা
দেয়া এবং অনুদান চাওয়া ও তা প্রদান করাসহ বিভিন্ন ধরনের লেনদেন পরিচালনা
করা সম্ভ।
১০. সরকার পরিচালনায় জন অংশগ্রহণঃ ইলেক্ট্রনিক
ব্যবস্থা তথা তথ্যপ্রযুক্তির সাহায্য গ্রহণ করে জনগণ প্রত্যক্ষভাবে সরকার
পরিচালনায় অংশগ্রহণ করতে পারে।
১১. সুশাসনের সহায়কঃ ই-গভর্নেন্স সুশাসনের সহায়ক। ই-গভর্নেন্স সুশাসন নিশ্চিত করে।
সুশাসন ও ই-গভর্নেন্স-এর সুবিধা (Advantage of Good Governance and E-Governance):
সুশাসন ও ই-গভর্নেন্স-এর পারস্পরিক সম্পর্ক খুবই নিবিড়।
ই-গভর্নেন্স নিম্নলিখিত উপায়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
পালন করে। এগুলো নিম্নরূপঃ
১. সেবা প্রদানকারী কর্মকর্তার সাথে
যোগাযোগ স্থাপনঃ ই-গভর্নেন্স-এর আওতাধীন যেকোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান
ওয়েবসাইটে প্রবেশ করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বা ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের সাথে
দ্রুত যোগাযোগ স্থাপন করতে পারে। সময়, খরচ, শ্রম সবকিছুই এতে বেঁচে যায়
বা কমে যায়।
২. স্বচ্ছতা আনয়নঃ ই-গভর্নেন্সে স্বচ্ছতার
বিষয়টিকে বড় করে দেখা হয়। সরকারের প্রশাসনিক সংগঠনগুলোতে, বিভিন্ন
মন্ত্রণালয়ের কাজকর্মে এবং মাঠপর্যায়ের প্রশাসনে স্বচ্ছতা আনয়ন করা
প্রয়োজন। সরকার কী কী কাজ করছে, কেন করছে, কী কী মূলনীতির ওপর সরকার
সিদ্ধান্ত বা নীতি প্রণয়ন করছে তা জনগণের জানা প্রয়োজন। ই-গর্ভনেন্স তা
জানতে সাহায্য করে।
৩. দক্ষ ও সাশ্রয়ী পন্থাঃ ই-গভর্নেন্স-এর
চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো একটি দক্ষ ও সাশ্রয়ী পন্থায় জনগণের নিকট সেবা
পৌঁছানো। ধরা যাক সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা পরিবর্তনের
ব্যাপারগুলো জনগণের জানানো প্রয়োজন। এজন্য বিপুল সংখ্যক কাগজ-কলম ও সময়ের
প্রয়োজন হয়। এ ব্যাপারটি যদি ইলেকট্রনিক ব্যবস্থার সাহায্যে করা হয় তবে
তা অনেক সহজে ও কম খরচে করা যেতে পারে। সময়, শ্রম ও অর্থের অপচয় কমিয়ে
দেয় বলে এ ব্যবস্থা ব্যবসায়ীদের জন্য সুবিধাজনক ও সাশ্রয়ী।
৪. রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরিঃ রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরির ক্ষেত্রে ই-গভর্নেন্স
বা ই-সরকার কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে। ভোটদানের ক্ষেত্রে এ ব্যবস্থা
জনগণের সংশ্লিষ্টতা ও আগ্রহ বাড়াতে সাহায্য করে।
৫. তথ্যের
সহজলভ্যতাঃ ই-গভর্নেন্স যেকোনো প্রক্রিয়াকে সহজ করে দিতে পারে। এছাড়া
ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান এবং জনগণের নিকট তথ্য প্রাপ্তি অনেক সহজলভ্য
করতে পারে। আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাষ্ট্র ইন্ডিয়ানাই সর্বপ্রথম
সরকারি তথ্য ডিজিটাল প্রক্রিয়ায় শনাক্তকরণ করে আইনগতভাবে তা
প্রত্যয়নপূর্বক সরবরাহ করেছে। এর ফলে খরচও অনেক কমেছে। বর্তমানে সমগ্র
বিশ্বেই এই অনলাইন সেবা ছড়িয়ে পড়েছে।
৬. জনগণের ব্যাপক
অংশগ্রহণঃ ই-গভর্নেন্সের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো জনগণের ব্যাপক অংশগ্রহণ।
ইন্টারনেটের মাধ্যমে সারাদেশের মানুষ রাজনীতিবিদ ও সরকারি চাকরিজীবীদের
সাথে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারে এবং তাদের বক্তব্য সকল ব্যক্তির নিকট পৌছাতে
পারে। এছাড়াও রাজনীতিবিদ ও সরকারি চাকরিজীবীরা ব্লগারদের বক্তব্য থেকে
জনগণের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে একটি ধারণা করতে পারে। চ্যাটরুমে প্রবেশ করে
জনগণ নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারে। ভোটাররা এ
সুবিধার মাধ্যমে সরকারের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। এতে জনগণ বুঝতে
পারে ভবিষ্যতে কাকে ভোট দেওয়া যেতে পারে এবং কীভাবে সহায়তা প্রদান করলে
সরকারি কর্মচারীরা আরো উৎপাদনশীল কাজে নিজেদেরকে নিয়োজিত করতে পারবে।
৭. প্রকৃত গণতন্ত্রের দিকে অগ্রসরঃ ই-গভর্নেন্সের যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে
যে কোনো সরকার প্রকৃত বা যথার্থ · গণতন্ত্রের দিকে অগ্রসর হতে পারে।
কীভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হয় এবং কীভাবে সরকারি কর্মচারীদের নিকট থেকে
জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হয় তা জনগণ বুঝতে পারে।
৮. পরিবেশগত
সুবিধাঃ পরিবেশবিদ, সংবাদ মাধ্যম ও সচেতন জনগণের চাপে অনেক দেশের সরকার
ইন্টারনেট ব্যবহার করতে শুরু করেছেন। এর ফলে বিপুল সংখ্যক কাগজের ব্যবহার
কমে গেছে। এর ফলে পরিবেশ দূষণের ভয়াবহতা কমে যাচ্ছে।
৯.
দ্রুততা ও সুবিধা বৃদ্ধিঃ বিভিন্ন সরকারি অফিসে না গিয়ে কম্পিউটারের সামনে
বসে জনগণ সরকারি কাজকর্ম সম্পাদন এবং খুব সহজেই যেকোনো হিসাব সংরক্ষণ করতে
পারে। চাকরিজীবী ও ছাত্রদের আবেদনপত্র সহজে সংগ্রহ ও তা জমা দিতে পুরো
প্রক্রিয়াটি সহজে সম্পন্ন করা যায়। শারীরিক প্রতিবন্ধীরা খুব সহজেই ঘরে
বসে বিভিন্ন রকম প্রশাসনিক সুযোগ-সুবিধা ও সরকারি সেবা গ্রহণ করতে পারে।
১০.
জনগণের অংশগ্রহণঃ সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে যে, জনগণ আগ্রহ সহকারে
ই-গভর্নেন্সের সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করছে। ক্রমবর্ধমানহারে জনগণ অনলাইনে
রাজনৈতিক বিষয়ে আলোচনায় অংশগ্রহণ করছে। এমনকি তরুণ প্রজন্মের যে অংশটি
রাজনৈতিক বিষয়ে এতদিন উদাসীন ছিল তারাও ই-গভর্নেন্সের ব্যাপারে আগ্রহী
হয়ে উঠছে। আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রের ৯০% প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ অপরাধীদের
শনাক্তকরণে ইন্টারনেটের ব্যবহারকে স্বাগত জানিয়েছে।
১১. অবাধ ও সার্বজনীন তথ্য প্রবাহঃ ই-গভর্নেন্স ব্যবস্থায় ধনী-গরিব,
ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণি নির্বিশেষে সবার জন্য সরকারি তথ্য প্রাপ্তির সুযোগ
উন্মুক্ত থাকে। কোনো তথ্য কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা শ্রেণি-পেশার মানুষের
জন্য সংরক্ষিত থাকে না। এরূপ অবাধ ও সর্বজনীন তথ্য প্রবাহ মানুষে মানুষে
প্রকৃত সাম্য প্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করে।
১২. সময় বাঁচায়ঃ
ই-গভর্নেন্স ব্যবস্থা বিকশিত হবার পূর্বে হাতে-কলমে বা ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে
সংবাদ প্রেরণ, কাগজপত্র বা ফাইল সংরক্ষণ থেকে শুরু করে সব ধরনের সরকারি
কাজ করা হতো। এতে প্রচুর সময় ব্যয় হতো। ই- গভর্নেন্স ব্যবস্থা সময়
বাঁচিয়েছে এবং দ্রুত কাজ সম্পন্ন করতে সাহায্য করেছে।
১৩.
সরকারের জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠাঃ ই-গভর্নেন্স এর অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো
স্বচ্ছতা। সরকারের সব কার্যক্রম বা সকল পদক্ষেপ জনগণ জানতে ও বুঝতে পারে।
এরূপ স্বচ্ছতাই জবাবদিহিতার পরিবেশ তৈরি করে।
১৪. দুর্নীতি
প্রতিরোধে সহায়কঃ ই-গভর্নেন্সে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা আছে বলেই দুর্নীতি
স্বভাবতই কমে যায়। সরকার কী করছে, কীভাবে করছে, আর্থিক লেনদেন কীভাবে
হচ্ছে- জনগণ সহজেই জানতে পারে বলে দুর্নীতি প্রতিরোধে ই- গভর্নেন্স প্রশংসা
অর্জন করেছে।
১৫, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা হ্রাসঃ ই-গভর্নেন্স
আমলাতান্ত্রিক জটিলতার দুর্ভোগের বা হয়রানির হাত থেকে জনগণকে রেহাই দেয়।
কেননা এর ফলে সরকারি অফিসে গিয়ে তথ্যের জন্য দিনের পর দিন ঘুরতে হয় না বা
ঘুষ দিতে হয় না। ঘরে বসেই জনগণ এগুলো জানতে পারে।
উপসংহারঃ উপরের আলোচনার সূত্র ধরে বলা যায় যে, ই-গভর্নেন্স' একটি নতুন ধারণা। 'ই-গভর্নেন্স' বলতে তথ্যপ্রযুক্তি, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি এবং ইন্টারনেট ও কম্পিউটারভিত্তিক যোগাযোগ। এটি হলো শাসনের এমন এক পদ্ধতি যেখানে সরকারি সেবা ও তথ্যসমূহ জনগণ সহজে ঘরে বসেই পেতে পারে। ই-গভর্নেন্স-এর মাধ্যমে সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয় এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার সুযোগ ত্বরান্বিত হয়। ই-গভর্নেন্স-এর চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো শাসনব্যবস্থাকে সহজ ও উন্নত করা।
ই-গভর্নেন্স-এর পরিচয়, উদ্দেশ্য, বৈশিষ্ট্য, সুবিধা, কার্যক্রম আলোচনা
মোঃ হেলাল উদ্দিন
No comments:
Post a Comment