Wednesday, October 21, 2020

বাংলাদেশ ও মুসলিম বিশ্ব -- মোঃ হেলাল উদ্দিন


বাংলাদেশ ও মুসলিম বিশ্বের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর, ঐতিহ্যবাহী এবং কৌশলগত। বাংলাদেশের সংবিধানের ২৫ নং অনুচ্ছেদে মুসলিম দেশগুলোর সাথে ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

নিচে এই সম্পর্কের বিভিন্ন দিক আলোচনা করা হলো:


১. ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও স্বীকৃতি

১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর শুরুতে অনেক মুসলিম দেশ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে দ্বিধাবোধ করেছিল। তবে ১৯৭৪ সালে লাহোরে অনুষ্ঠিত ওআইসি (OIC) সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অংশগ্রহণের মাধ্যমে এই সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করে। এরপর থেকে বাংলাদেশ মুসলিম বিশ্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

২. ওআইসি-তে বাংলাদেশের ভূমিকা

বাংলাদেশ ওআইসির (Organisation of Islamic Cooperation) একটি অত্যন্ত সক্রিয় এবং প্রভাবশালী সদস্য।

  • শান্তি রক্ষা: মুসলিম দেশগুলোর মধ্যকার বিভিন্ন দ্বন্দ্ব নিরসনে বাংলাদেশ সব সময় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছে।

  • ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি (IUT): ওআইসির একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গসংস্থান আইইউটি (IUT) বাংলাদেশে অবস্থিত, যা মুসলিম বিশ্বের কারিগরি শিক্ষায় বড় অবদান রাখছে।

৩. অর্থনৈতিক ও শ্রম বাজার সম্পর্ক

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে মুসলিম বিশ্বের বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের অবদান অপরিসীম।

  • রেমিট্যান্স: সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত ও ওমান—এই দেশগুলো বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার প্রধান উৎস। লাখ লাখ বাংলাদেশি শ্রমিক এসব দেশে কর্মরত।

  • জ্বালানি নিরাপত্তা: তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের জন্য বাংলাদেশ মূলত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর ওপর নির্ভরশীল।

৪. রোহিঙ্গা সংকট ও মুসলিম বিশ্ব

মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়ার পর থেকে বাংলাদেশ মুসলিম বিশ্বের অভূতপূর্ব সমর্থন পেয়েছে। বিশেষ করে তুরস্ক, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং সৌদি আরব মানবিক সহায়তা ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কূটনৈতিক সমর্থন দিয়ে আসছে। গাম্বিয়া ওআইসির পক্ষ থেকে আইসিজে-তে (ICJ) মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মামলা লড়ছে।

৫. ফিলিস্তিন ইস্যু ও নীতিগত অবস্থান

ফিলিস্তিন প্রশ্নে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত দৃঢ় ও আপসহীন। বাংলাদেশ শুরু থেকেই ফিলিস্তিনের স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়ে আসছে এবং ইসরায়েলকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। এটি মুসলিম বিশ্বের সাথে বাংলাদেশের আদর্শিক ঐক্যের একটি বড় উদাহরণ।

৬. প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা

বাংলাদেশ ও মুসলিম বিশ্বের মধ্যে বিশেষ করে সৌদি আরবের সাথে গভীর প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বিদ্যমান। বাংলাদেশ নিয়মিতভাবে 'ইসলামিক মিলিটারি কাউন্টার টেরোরিজম কোয়ালিশন'-এ অংশগ্রহণ করে এবং পবিত্র মক্কা ও মদিনার নিরাপত্তা রক্ষায় দৃঢ় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।


সম্পর্কের প্রধান চ্যালেঞ্জসমূহ

  • শ্রমিক স্বার্থ রক্ষা: মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বাংলাদেশি শ্রমিকদের আইনি সুরক্ষা ও বেতন বৈষম্য দূর করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

  • ভূ-রাজনীতি: ইরান-সৌদি আরব বা মধ্যপ্রাচ্যের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে ভারসাম্য বজায় রাখা বাংলাদেশের কূটনীতির জন্য একটি পরীক্ষা।

  • বাণিজ্যিক ভারসাম্য: মুসলিম দেশগুলোর সাথে বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে বড় ধরনের ব্যবধান (Trade Deficit) বিদ্যমান।

উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশ ও মুসলিম বিশ্বের সম্পর্ক কেবল ধর্মীয় আবেগ নয়, বরং এটি অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থের ওপর ভিত্তি করে টিকে আছে। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ নিজেকে একটি মডারেট মুসলিম দেশ হিসেবে উপস্থাপন করে আরব ও অ-আরব মুসলিম দেশগুলোর সাথে সেতু বন্ধন হিসেবে কাজ করছে।



(মোঃ হেলাল উদ্দিন, ৩৩ তম বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা)


No comments:

Post a Comment