Monday, December 15, 2025

জেরিমি বেন্থামের উপযোগবাদ

উপযোগবাদ (Utilitarianism) হল নৈতিক দর্শনের একটি মতবাদ, যা সর্বোচ্চ সুখ বা উপযোগ বৃদ্ধি এবং দুঃখ বা কষ্ট হ্রাসকে নৈতিক কাজের মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করে। এই মতবাদটি সাধারণত জেরেমি বেনথাম (Jeremy Bentham) এবং জন স্টুয়ার্ট মিল (John Stuart Mill)-এর কাজের মাধ্যমে পরিচিতি পায়। এর মূল নীতি হল: “সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষের জন্য সর্বোচ্চ সুখ অর্জন।”
উপযোগবাদের মূল বৈশিষ্ট্য-
1. সুখ ও দুঃখের পরিমাপ:
উপযোগবাদ অনুযায়ী, মানুষের কর্মের নৈতিকতা নির্ধারণ করা হয় সেই কর্ম কতটা সুখ বাড়ায় বা দুঃখ কমায় তার উপর ভিত্তি করে।
2. সর্বজনীনতাবাদ:
এটি ব্যক্তিগত নয় বরং সামগ্রিক মানব কল্যাণকে প্রাধান্য দেয়। একক ব্যক্তি নয়, বরং একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীর উপকারিতা বিবেচনা করা হয়।
3. ফলাফল-ভিত্তিক নীতি:
উপযোগবাদে কাজের নৈতিকতা বা অনৈতিকতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে কাজের উদ্দেশ্য নয় বরং তার ফলাফলকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
4. অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে প্রয়োগ:
নীতিটি নৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ছাড়াও অর্থনীতি, রাজনীতি, ও সামাজিক সংস্কারের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়।
উপযোগবাদের দুই প্রধান রূপ-
1. সিদ্ধান্তগত উপযোগবাদ (Act Utilitarianism):
এখানে প্রতিটি পৃথক কাজের উপযোগ বিবেচনা করা হয়। একটি কাজ যদি বর্তমান পরিস্থিতিতে সর্বোচ্চ সুখ বাড়ায় তবে সেটি নৈতিক বলে বিবেচিত হবে।
2. নিয়মগত উপযোগবাদ (Rule Utilitarianism):
এখানে একটি নিয়ম বা নীতির সামগ্রিক উপযোগ বিবেচনা করা হয়। যদি একটি নিয়ম অনুসরণ করলে দীর্ঘমেয়াদে সর্বোচ্চ সুখ অর্জিত হয়, তবে সেই নিয়মকে মেনে চলা নৈতিক বলে ধরা হয়।
উপযোগবাদের সমালোচনা:
1. নৈতিক সিদ্ধান্তের জটিলতা:
অনেক ক্ষেত্রে সুখ বা দুঃখের মাপ নির্ধারণ করা কঠিন, যা নৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়াকে জটিল করে তোলে।
2. স্বল্পমেয়াদী বনাম দীর্ঘমেয়াদী উপকার:
কিছু সিদ্ধান্ত স্বল্পমেয়াদে সুখ বাড়াতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হতে পারে।
3. স্বার্থপরতার ঝুঁকি:
ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থরক্ষার জন্য এটি কখনো কখনো ব্যবহার করা হতে পারে।
4. সংখ্যালঘুর অধিকার:
সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষের সুখ নিশ্চিত করতে গিয়ে সংখ্যালঘুর অধিকার বা স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

Friday, October 3, 2025

জন অস্টিনের সার্বভৌমত্ব তত্ত্ব -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

জন অস্টিনকে (১৯২১–১৯৯৯) বলা হয় একত্ববাদী সার্বভৌমত্বের জনক। তাঁর সার্বভৌমত্ব তত্ত্ব রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। তিনি তার “Legal Positivism” দর্শনের ভিত্তিতে তিনি সার্বভৌমত্বকে ব্যাখ্যা করেছেন। অস্টিনের মতে, সার্বভৌমত্ব হলো রাষ্ট্রের সেই সর্বোচ্চ ক্ষমতা যা আইন প্রণয়ন এবং তার কার্যকরতা নিশ্চিত করে। সার্বভৌমত্বের ধারণা রাষ্ট্রের স্বাধীনতা এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রতীক। এটি এমন এক ক্ষমতা যা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় না। 

অস্টিনের তত্ত্বে, সার্বভৌমত্ব কেবলমাত্র একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা  নির্দিষ্ট সংস্থা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। আর এই সার্বভৌম কর্তৃপক্ষের আদেশই আইন হিসেবে বিবেচিত হয়। তার মতে, সার্বভৌমত্ব নিরঙ্কুশ এবং অভ্রান্ত।

 

অস্টিনের সার্বভৌমত্ব তত্ত্বের বৈশিষ্ট্য

১।  আইনের উৎস: অস্টিনের মতে, সার্বভৌম হলো সেই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান, যার আদেশ অনুসারে আইন তৈরি হয়। এই আইন মেনে চলতে জনগণ বাধ্য থাকে। সার্বভৌমত্বের আদেশই আইন হিসেবে গণ্য হয়।

২।  সর্বোচ্চ ক্ষমতা: সার্বভৌম ক্ষমতা হল নিরঙ্কুশ এবং সর্বোচ্চ ক্ষমতা। এটি অন্য কোনো কর্তৃপক্ষ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নয়। 

৩। নির্ধারিত গোষ্ঠী: অস্টিনের মতে, সার্বভৌমত্ব একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা জনগোষ্ঠীর উপর প্রয়োগ করা হয়। এই গোষ্ঠী হলো সেই জনগণ যারা সার্বভৌমের আদেশ মেনে চলে এবং এর নির্দেশ মানতে বাধ্য থাকে। 

৪। আদেশ ও বাধ্যবাধকতা: আইন হলো সার্বভৌম কর্তৃক প্রদত্ত আদেশ, যা মেনে চলতে জনগণ বাধ্য। এই আদেশ অমান্য করলে শাস্তির বিধান প্রয়োগ করা হয়। 

৫। আদেশের অভ্যাস: অস্টিনের মতে, জনগণ সার্বভৌমের আদেশ মেনে চলার অভ্যাস গড়ে তোলে। এটি একটি রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে।

৬। প্রতিসম আদেশের অভাব: সার্বভৌম নিজে তার আদেশ মেনে চলতে বাধ্য নয় এবং তার আদেশের উপর অন্য কোনো আদেশ চাপানো যায় না।

৭। অবিচ্ছিন্ন ক্ষমতা: অস্টিনের মতে, সার্বভৌমত্বের ক্ষমতা অবিচ্ছিন্ন। এটি অন্য কোনো শক্তির দ্বারা লঘু করা যায় না। সার্বভৌমত্বের এই বৈশিষ্ট্য রাষ্ট্রের শাসন ও আইন কার্যকর রাখতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

৮। নিরঙ্কুশতা: সার্বভৌমত্বের ক্ষমতা সম্পূর্ণ নিরঙ্কুশ এবং এর আদেশের উপর কোনো প্রকার সীমাবদ্ধতা বা বাধা আরোপ করা যায় না।

৯। বাধ্যবাধকতা নিশ্চিতকরণ: অস্টিনের তত্ত্বে জনগণ সার্বভৌমের আদেশ অনুযায়ী কাজ করতে বাধ্য এবং এর ব্যতিক্রম হলে শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে।

১০। সার্বভৌমের প্রতি আনুগত্য: সার্বভৌম কর্তৃপক্ষের প্রতি জনগণের আনুগত্য বাধ্যতামূলক। এই আনুগত্য রাষ্ট্রের শাসন ব্যবস্থা স্থিতিশীল রাখতে সহায়ক।

১১। আইন ও নৈতিকতার পৃথকীকরণ: অস্টিনের মতে, আইন এবং নৈতিকতা পৃথক। আইন সার্বভৌম কর্তৃক প্রদত্ত আদেশ, নৈতিকতার সাথে এর কোনো সংযোগ নেই।

১২। ক্ষমতার কেন্দ্রিকতা: সার্বভৌম ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত এবং এটি বিভিন্ন স্তরের মধ্যে বিভাজিত নয়। এটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতা হিসেবে কাজ করে।

১৩। সার্বভৌমত্বের চিরন্তনতা: অস্টিনের মতে, সার্বভৌমত্ব চিরন্তন এবং এটি রাষ্ট্রের অস্তিত্বের সাথে যুক্ত। এটি সময়ের সাথে পরিবর্তিত হয় না।


সমালোচনা:

অস্টিনের সার্বভৌমত্ব তত্ত্ব রাষ্ট্রবিজ্ঞান এবং আইনের ক্ষেত্রে প্রভাবশালী হলেও এটি বিভিন্ন ত্রুটি ও সীমাবদ্ধতার জন্য সমালোচিত হয়েছে। নিম্নে এর কতিপয় সমালোচনাগুলো  উল্লেখ করা হলো:

১। বাস্তবতার সাথে অসামঞ্জস্য: আধুনিক রাষ্ট্রের বাস্তবতায় ক্ষমতা এককেন্দ্রিক নয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক শক্তি একত্রে কাজ করে। অস্টিনের একক সার্বভৌম শক্তির ধারণা এই বহুমাত্রিক বাস্তবতার সাথে খাপ খায় না।

২। গণতন্ত্র বিরোধী: সার্বভৌমত্বের ধারণা কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার উপর নির্ভর করে, যা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এটি ব্যক্তি স্বাধীনতা এবং জনগণের অংশগ্রহণের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

৩। আইনের বৈধতার উপেক্ষা: অস্টিন জনগণের সম্মতি ও নৈতিক মানদণ্ডকে গুরুত্ব দেননি। তিনি আইনকে কেবল সার্বভৌমের আদেশ হিসেবে দেখেছেন, যা অনেক ক্ষেত্রেই জনস্বার্থের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।

৪। প্লুরালিস্টিক সমালোচনা: বহুত্ববাদী দর্শনের প্রবক্তারা মনে করেন আধুনিক সমাজে ক্ষমতা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিভাজিত। পরিবার, ধর্মীয় গোষ্ঠী, এবং পেশাজীবী সংগঠনের মতো প্রতিষ্ঠান আইন প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অস্টিনের তত্ত্ব এই বহুত্ববাদী বাস্তবতাকে উপেক্ষা করেছে।

৫। স্বৈরতান্ত্রিক ঝুঁকি: একক সার্বভৌম ক্ষমতার ধারণা স্বেচ্ছাচারিতার পথ তৈরি করতে পারে। এটি স্বৈরতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করে যেটি ব্যক্তি অধিকারের জন্য হুমকিস্বরূপ।

৬। আন্তর্জাতিক সীমাবদ্ধতা: আধুনিক রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব আন্তর্জাতিক আইন, জাতিসংঘ, এবং বহির্বিশ্বের চাপ দ্বারা প্রভাবিত হয়। অস্টিনের তত্ত্ব এই বাস্তবতাকে বিবেচনায় আনেনি।

৭। অপর্যাপ্ত মাপকাঠি: অস্টিনের তত্ত্বে সার্বভৌমত্ব এবং জনগণের আনুগত্যের মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণের জন্য কোনো নির্দিষ্ট মানদণ্ড নেই। এতে আইন এবং ক্ষমতার সীমানা অস্পষ্ট রয়ে যায়।

৮। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ: আধুনিক রাষ্ট্রে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিচার বিভাগ, আইনসভা, এবং নির্বাহী বিভাগ সমন্বিতভাবে কাজ করে। অস্টিনের তত্ত্বে এই বিকেন্দ্রীকরণের কোনো বিবেচনা নেই।

৯। নৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট উপেক্ষা: অস্টিন আইনের নৈতিক এবং সামাজিক প্রেক্ষাপটকে বিবেচনা করেননি। তার মতে, আইন কেবল সার্বভৌমের আদেশ, যা প্রায়ই সামাজিক এবং নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির বিপরীতে যেতে পারে।

১০। সার্বভৌমত্বের সীমাবদ্ধতা: আধুনিক রাষ্ট্রে সার্বভৌমত্ব সম্পূর্ণ সীমাহীন নয়। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, বৈশ্বিক চুক্তি, এবং অর্থনৈতিক চাপ রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতাকে প্রভাবিত করে।

এছাড়াও অস্টিন ব্যক্তি এবং রাষ্ট্রের সম্পর্কের জটিলতাকে সঠিকভাবে অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছেন । তাঁর তত্ত্ব প্রাচীন রাষ্ট্র কাঠামোর জন্য প্রাসঙ্গিক হলেও আধুনিক রাষ্ট্রে এটি বাস্তবায়ন করা কঠিন। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং বৈশ্বিক সংস্থার প্রভাবের কারণে তার তত্ত্ব কার্যকর নয়।


পরিশেষে বলা যায়, অস্টিনের সার্বভৌমত্ব তত্ত্ব একটি নিরঙ্কুশ এবং শক্তিশালী ধারণা হিসেবে রাষ্ট্রের আইন ও শাসন ব্যবস্থার কাঠামো নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যদিও আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রভাব রয়েছে, তবুও অস্টিনের তত্ত্ব রাষ্ট্রবিজ্ঞানের মৌলিক ধারণাগুলোর মধ্যে অন্যতম। অস্টিনের তত্ত্ব রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও আইনের ক্ষেত্রে এক অসাধারণ অবদান হিসেবে বিবেচিত হয়। 

Wednesday, July 9, 2025

বাংলাদেশ উন্নত, অনুন্নত না উন্নয়নশীল দেশ ?

বাংলাদেশ একটি উন্নত, অনুন্নত না উন্নয়নশীল দেশ তা র কাঠামোগত বৈশিষ্ট্যগুলোর প্রেক্ষিতে বিচার করা প্রয়োজন। তাই নিয়ে র প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ আলোচনা করা হলো।

১। কৃষিখাতের প্রাধান্যঃ বাংলাদেশ কৃষি নির্ভর দেশ। বাংলাদেশের মোট শ্রম শক্তির প্রায় ৪৭.৫% কৃষি শ্রমিক । ২০১২-১৩ অর্থবছরের জিডিপি'তে কৃষিখাতের অবদান ছিল ১৬.৭৮ শতাংশ, ২০১৩- ১৪ অর্থবছরে এ খাতের অবদান দাড়িয়েছে ১৬.৩৩ শতাংশ। সুতরাং কৃষির উপর অত্যাধিক নির্ভরশীল ।

২। অনুন্নত কৃষি ব্যবস্থাঃ বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ হওয়া সত্ত্বেও কৃষকদের নিরক্ষরতা, প্রাচীন পদ্ধতিতে চাষাবাদ, কৃষি উপকরণের অভাব প্রভৃতি কারণে কৃষিখাতে প্রবৃদ্ধির হার খুব কম । 

৩। অনুন্নত শিল্পঃ মূলধনের অপর্যাপ্ততা, দক্ষ উদ্যোক্তা ও দক্ষ শ্রমিকের অভাব ইত্যাদি কারণেবাংলাদেশের শিল্পখাত খুবই অনুন্নত ফলে জাতীয় আয়ে শিল্প খাতের অবদান খুবই কম। তবে ধীর গতিতে এ অবদান বাড়ছে । 

৪। অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবকাঠামোঃ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবকাঠামো তেমন উন্নত নয় । অনুন্নত পরিবহণ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা, অপর্যাপ্ত জ্বালানী ও বিদ্যুৎ শক্তি, শিক্ষার হার নিম্ন, স্বাস্থ্য সুবিধা অপ্রতুল, এ সমস্ত কারণেঅর্থনৈতিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। যেমন- স্বাধীনতা উত্তরকালে যেখানে মাত্র ৪ হাজার কিলোমিটার সড়ক নেটওয়ার্ক ছিল সেখানে ফেব্রুয়ারি ২০১২ পর্যন্ত সওজ অধিদপ্তরের ব্যবস্থাপনায় ২১,২৭২ কিলোমিটার সড়ক নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। ২০১০-১১ অর্থবছরে মোট ৩১,৩৫৫ মিলিয়ন কিলোওয়াট আওয়ার নীট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে যা বিগত অর্থবছরের তুলনায় ৭.২১% বেশি ।

৫। কারিগরি জ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবঃ কারিগরি জ্ঞান ও প্রযুক্তির দিক থেকে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে রয়েছে যা উৎপাদন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে একটি বিরাট প্রতিবন্ধক ।

৬। স্বল্প মাথাপিছু আয় ও নিম্ন জীবনযাত্রার মানঃ বাংলাদেশের একটি গুরুতপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে মাথাপিছু আয় কম এবং জীবনযাত্রার মান নিম্ন। উন্নত দেশের তুলনায় তা খুবই কম। তবে মাথাপিছু আয় ধীর গতিতে হলেও ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। সেই সাথে জীবনযাত্রার মানও উন্নত হচ্ছে। 

৭। মূলধনের স্বল্পতাঃ বাংলাদেশের জনগণের মাথাপিছু আয় কম বলে সঞ্চয় ক্ষমতা কম । ফলে মূলধন গঠনের হারও বেশ কম। তবে তা ধীরে ধীরে বাড়ছে। তালিকায় বিভিন্ন বছরে দেশের GDP এর মধ্যে সঞ্চয়ের অনুপাত দেখানো হলো ।

৮। শিক্ষার হার কমঃ বাংলাদেশে শিক্ষার হার অত্যন্ত কম। এখনও দেশে অনেক লোক অশিক্ষিত, অজ্ঞ ও নিরক্ষর রয়েছে। ২০০২ সালের হিসাব অনুযায়ী বয়স্ক শিক্ষার হার (১৫+) হলো শতকরা ৬২.৬৬ ভাগ মাত্র । উন্নত দেশে এ হার প্রায় ১০০ শত ভাগ ।

৯। দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধিঃ বাংলাদেশের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এ দেশে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার অব্যাহত চাপ বিদ্যমান। ২০০৫ সালে মোট জনসংখ্যা ছিল ১৩.৭০ কোটি যা ২০১১-১২ (সাময়িক প্রাক্কলন) এ হয় ১৫.১৬ কোটি। ২০০১১ সালের হিসাব অনুযায়ী এ দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১.৩৪% এবং জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রতি বর্গ কিলোমিটারে ৯৬৪ জন ।

১০। বৈদেশিক সাহায্যের উপর নির্ভরশীলতাঃ বাংলাদেশের উন্নয়নমূলক কার্যাবলী মূলত বৈদেশিক সাহায্যের উপর নির্ভরশীল। উন্নয়ন বাজেটের ৫০% বৈদেশিক সাহায্য নির্ভর। তবে বর্তমানে এ নির্ভরশীলতা হ্রাস পাচ্ছে ।

১১। খাদ্য সমস্যাঃ বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ হওয়া সত্ত্বেও কৃষি ব্যবস্থার অনুন্নতি এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে এদেশে প্রতি বছর খাদ্য ঘাটতি দেখা দেয়। ফলে বিদেশ থেকে প্রতি বছর খাদ্য আমদানি করতে হয় । তবে খাদ্য শস্য উৎপাদন ব্যবস্থায় বিগত কয়েক বছর ধরে একটি ঊর্ধ্বমুখী ধারা অব্যাহত রয়েছে । নিমের তালিকায় বিভিন্ন বৎসরের খাদ্যশস্য উৎপাদন ও আমদানির পরিমাণ দেখানো হলো ।  

১২। বেকার সমস্যাঃ বাংলাদেশে বেকার সমস্যা অত্যন্ত প্রকট । এদেশে মোট শ্রমশক্তির ৩০% বেকার এবং ২৫% প্রচ্ছন্ন বেকার। সরকারি হিসাব অনুযায়ী শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ১ কোটির উর্ধ্বে ।

১৩। মুদ্রাস্ফীতিঃ বাংলাদেশে বর্তমানে মুদ্রাস্ফীতি একটি বড় সমস্যা। বিশ্বব্যাপী জ্বালানী তেলের মূল্য বৃদ্ধি, খাদ্যশস্যের উৎপাদন হ্রাস, বিশ্বব্যাপী রাজনৈতিক অস্থিরতা ও মন্দা ইত্যাদি কারণে বাংলাদেশেও বর্তমানে মূল্যস্তর বাড়ছে এবং মুদ্রাস্ফীতি একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশে বর্তমানে মুদ্রাস্ফীতির হার ১০- ১১% ।

১৪। প্রতিকূল বৈদেশিক বাণিজ্যঃ এ দেশে কাঁচামাল রপ্তানী, শিল্পজাত পণ্য আমদানি, উদ্যোক্তার অভাব, নিম্নমানের পণ্য উৎপাদন, আমদানি বিকল্প শিল্প গড়ে না উঠা প্রভৃতি কারণে বাণিজ্য ঘাটতি লেগেই রয়েছে ।

উপরের আলোচনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, কে কোনভাবেই উন্নত অর্থনীতি বলা যায় না। অপরদিকে অনুন্নত দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোর প্রায় সব বৈশিষ্ট্যই বিদ্যমান। এজন্য সাধারণভাবে বাংলাদেশকে অনুন্নত দেশ বলে মনে হয়। তবে অনুন্নত দেশ এবং উন্নয়নশীল দেশের প্রধান পার্থক্য “অর্থনৈতিক স্থবিরতা” তা বাংলাদেশে অবর্তমান। বরং উন্নয়নশীল দেশের প্রধান লক্ষন অর্থনৈতিক ও সামাজিক গতিশীলতা বাংলাদেশে লক্ষ্যণীয়। এ গতিশীলতা সৃষ্টির প্রধান কারণ হচ্ছে বিভিন্ন উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহন ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হারের বৃদ্ধি। যেমন ১ম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৪% যা পঞ্চম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫.২১%। ফলে এ দেশে একটি উন্নয়নের ধাপ সৃষ্টি হয়েছে। মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পেয়ে ৫৮০ ডলারে উন্নীত হয়েছে। দারিদ্র সীমার নিচে বসবাসকারী জনসংখ্যার পরিমাণ হ্রাস পেয়ে বর্তমানে ৪.২১% এ নেমে এসেছে। বয়স্ক শিক্ষার হার ৫০% থেকে বেড়ে ৬৮% এ উন্নীত হয়েছে। কৃষিখাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। মোট জিডিপিতে শিল্পসহ অন্যান্য অ-কৃষিখাতের অবদানও বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থাৎ এক কথায় বলা যায় দেশের অর্থনীতিতে কাঠামোগত পরিবর্তন এসেছে এবং অর্থনৈতিতে গতিশীলতা সৃষ্টি হয়েছে। সুতরাং বাংলাদেশকে নিঃসন্দেহে একটি উন্নয়নশীল দেশ বলাই যুক্তি সংগত।